প্রশ্ন উঠতে পারে আমাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষী হওয়া নিয়ে। আপনি যখন উচ্চাকাঙ্ক্ষী হন, তখন আপনি কিছু পদক্ষেপ নেন যার মাশুল দিতে হয় অন্যদের। সদগুরুজি এর উত্তরে বলেছেন, আপনি বলছেন, ‘অন্য কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।’ সবকিছুই হয় অন্য কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আপনি যে বাড়িতে বাস করেন সেটা হয়তো আপনার কাছে খুবই আরামের জায়গা; কিন্তু ঐরকম একটা বাড়ি তৈরি করতে, আমার জানা নেই কত কীটপতঙ্গ এবং অন্যান্য জীব কী চরম যন্ত্রণা ভোগ করেছে। আমরা রীতিমতো হত্যালীলা চালিয়েছি। আমরা যদি এ ব্যাপারে সচেতন থাকি, তাহলে আমরা শুধু ততটাই করব যতটা করা আবশ্যক—তার থেকে বেশিও নয়, কমও নয়। প্রশ্ন হলো, কে স্থির করবে যে কতটা প্রয়োজনীয়? এটা আপনিই স্থির করুন; কিন্তু সেটা স্থির করুন আপনার মনুষ্যত্ববোধ থেকে, আপনার অহংকার থেকে নয়। আপনি যদি মনুষ্যত্ববোধ থেকে স্থির করেন, তাহলে আপনি একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন। সেটা কি সঠিক নির্বাচন? পিঁপড়ে, মৌমাছি এবং পাখি—এই গ্রহের বেশির ভাগ জীবই আমাদের সঙ্গে একমত হবে না; কিন্তু যেমন তাদের বাঁচতে হবে, তেমনি আমাদেরও তো বাঁচতে হবে।
কিন্তু আমাদের বুঝতেই হবে, যে, আমাদের যেমন বাঁচতে হবে, তেমনি তাদেরকেও তো বাঁচতে হবে। আমরা যদি এটা ভুলে যাই, তখনই আমরা এমন সব কাজ করি যা শেষ পর্যন্ত আমাদেরকেই ধ্বংস করে দেয়, তাদেরকে নয়। বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলে, যদি পৃথিবীর সমস্ত কীটপতঙ্গ আজ উধাও হয়ে যায়, তাহলে কয়েক বছরের মধ্যেই, পৃথিবীর বুকে সমস্ত জীবন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
আপনি যদি এটা বুঝে থাকেন, তাহলে আপনি জানেন যে-জীবাণু, কীটপতঙ্গ, জীবজন্তু, বৃক্ষ এবং উদ্ভিদসমূহেরও সুস্থ থাকা দরকার। অন্যথায় আমাদেরও অস্তিত্ব থাকবে না। এটা করুন হয় আপনার মনুষ্যত্বের খাতিরে নয়তো আপনার বুদ্ধি প্রয়োগ করে; কিন্তু আপনার যদি একটা উপচেপড়া মনুষ্যত্ববোধ অথবা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বুদ্ধি না থাকে তাহলে আপনি নিজেই একটা বিপর্যয়ে পরিণত হবেন।
আপনি কী করে এমন কিছু নিয়ে বাঁচবেন, যার জন্য সর্বদাই অন্য কাউকে মূল্য দিতে হয়? কোনো একসময় যদি যেতে যেতে আমরা পরস্পরের পথ অতিক্রম করি, আর তার মূল্য দিতে হয় অন্য কাউকে—ঠিক আছে, আমাদের সেটা নিয়ে বাঁচতে হবে। কিন্তু আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে, আমরা যা-ই করি না কেন, সেটার মূল্য যদি অন্য কাউকে দিতে হয়, তাহলে তখন কিন্তু আমাদের ক্রিয়াকলাপ বদলাতে হবে।
উচ্চাকাঙ্ক্ষা মূলত একটা লক্ষ্য; কিন্তু সেটা শুধুই নিজের জন্য। একটা লক্ষ্য থাকা ভালো; কিন্তু সেটা আপনার ব্যাপারে হতে দেবেন না। যদি আপনার জীবনের উদ্দেশ্য আপনার চারপাশের সবকিছুর জন্য হয়, দেখবেন, যা-ই হোক না কেন, আপনি এক অপ্রত্যাশিত লাভ পাবেন। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই।
পৃথিবীতে এমন কেউ নেই, যিনি সম্পূর্ণ মনুষ্যত্বহীন। কোনো এক ব্যক্তির কাছে মনুষ্যত্ব মানে সে নিজেই। অন্য এক ব্যক্তির কাছে মনুষ্যত্বের ধারণাটি হলো সে নিজে এবং তার পরিবার। অন্য আর এক ব্যক্তির মনুষ্যত্বের ধারণা হলো সে নিজে এবং তার সমাজ। অন্য আরেক ব্যক্তির মনুষ্যত্ব সে নিজে এবং তার দেশ। আরেকজন ব্যক্তির মনুষ্যত্বের ধারণা হলো সমগ্র মানবজাতি। সুতরাং প্রশ্নটা হলো শুধু পরিমাপের।
এই কারণেই আমি আপনাদের বলছি, আসুন আমরা কাজ করি সম্ভাব্য সর্বোচ্চ পরিমাপে। আপনার ভাবনা, আপনার আবেগ, আপনার মনুষ্যত্ব—সবকিছু সর্বোচ্চ পর্যায়ে হতে হবে, কারণ শুধু তখনই, আপনার কার্যসিদ্ধির জন্য অন্য কাউকে মূল্য দিতে হবে না। আপনি যদি উচ্চাকাঙ্ক্ষীই হন, তাহলে আপনি এটা খুব বড়োমাপে করছেন না কেন? এর জন্য কোনো মূল্য হয় না, আর এর মূল্যও অন্য কাউকে দিতে হয় না। সেই সবকিছু যেগুলোর মূল্য অন্য কাউকে দিতে হয় না, সেগুলো অবশ্যই যত বড়ো মাত্রায় করা সম্ভব করতে হবে। পার্থিব বস্তুসমূহের মূল্য সব সময় কাউকে হোক দিতেই হয়। সেসব কতটা প্রয়োজনীয়, আপনার ওপরই ছেড়ে দেব। শুধু এইটুকু চেতনায় থাকুন যাতে সেই সিদ্ধান্তগুলো শৌখিন অহংকার বোধ থেকে নয়, মনুষ্যত্ববোধ থেকে নেওয়া হচ্ছে।
n সৌজন্যে : ঈশা ফাউন্ডেশন
