অদম্য ইচ্ছাশক্তির কারণে তাদের কাউকে দমাতে পারেনি নিজের লক্ষ্য থেকে। তারা দীর্ঘ লড়াই ও সংগ্রাম করে টিকে থেকেছেন সমাজে। নিজেদের প্রচেষ্টায় তারা আজ প্রতিষ্ঠিত। তাদেরকে এ অবস্থায় আসতে স্বীকার করতে হয়েছে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা। সমাজের নানা কুসংস্কার ও বাধা অতিক্রম করে তারা প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে জানিয়ে দিয়েছেন তাদের অস্তিত্বের কথা। কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলায় আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ ও বেগম রোকেয়া দিবস-২০১৯ উদ্যাপন উপলক্ষ্যে উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ের উদ্যোগে ‘জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ’ কর্মসূচির আওতায় পাঁচটি ক্যাটাগরিতে পাঁচ জন সফল নারী নির্বাচিত হয়েছেন। তারা হলেন—অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জনকারী নারী মোরশেদা আক্তার, শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী দীপালি রানি দাস, সফল জননী নারী দীপালি রানি পাল, নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করা নারী মোসা. জাহানারা বেগম ও সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখা নারী
মরিয়ম আক্তার। জানাচ্ছেন—
মো. মিজানুর রহমান মিজান
মোরশেদা আক্তার
মোরশেদা আক্তার একজন সংগ্রামী নারী। সাত ভাইবোন বেষ্টিত দরিদ্র কৃষক পরিবারে বারপাড়া ইউনিয়নের মঙ্গলমূড়া গ্রামে জন্ম তার। দারিদ্র্যের কষাঘাতে তিনি বেশি পড়াশোনাও করতে পারেননি। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে ২০০৮ সালে তিনি সেলাই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে প্রশিক্ষণ-পরবর্তী সময়ে কিস্তিতে সেলাই মেশিন ক্রয় করে জীবিকা নির্বাহ করা শুরু করেন। এরই মাঝে পরিবারের সম্মতিতে ২০১১ সালে একজন বাকপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বর্তমানে তিনি দুই কন্যাসন্তানের জননী যার মধ্যে একজন আবার বাবার মতোই বাকপ্রতিবন্ধী। সংসারের এহেন পরিস্থিতি মোকাবিলা করে সকল প্রতিবন্ধকতাকে দূর করে তিনি এখন শুধু নিজেই স্বাবলম্বী নন, পাশাপাশি তার মতো অসহায় অন্য নারীদেরও তিনি প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। সেলাই কার্যক্রমের পাশাপাশি তিনি গবাদিপশুও লালন-পালন করেন। নারী নির্যাতন ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করেন তিনি।
দীপালি রানি দাস
বিজয়পুর ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর গ্রামের দীপালি রানি দাস ছোটোবেলা থেকেই শিক্ষক হবার স্বপ্ন দেখলেও পারিবারিক সিদ্ধান্তের কারণে এইচএসসিতে পড়া অবস্থায় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য হন। শ্বশুরবাড়িতে পরিবারের সদস্যসংখ্যা বেশি থাকার কারণে দিনেরবেলা সাংসারিক কাজের জন্য লেখাপড়া করার সুযোগ না পেলেও স্বামীর উত্সাহ ও সহযোগিতায় রাতেরবেলা লেখাপড়ার কাজটি চালিয়ে যান। পারিবারিক সকল বাধা অতিক্রম করে ১৯৮৬ সালে এইচএসসি পাস করার পর আবারও লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। তারপর ১৯৮৮ সালে বাতাবাড়ীয়া বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। দুই ছেলে ও চাকরি নিয়ে অনেক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে ২০০৫ সালে বিএ পাশ করার পরই হঠাত্ করে তার স্বামী মারা যান। সেই শোককে শক্তিতে পরিণত করে তিনি দুই ছেলেকে যেমন শিক্ষিত করেছেন তেমনি পাশাপাশি তার মতো অন্যান্য নারীকেও স্বাবলম্বী হতে সহযোগিতা করেছেন। নারী নির্যাতন প্রতিরোধ করে একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।
দীপালি রানি পাল
নিজের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বিজয়পুর ইউনিয়নের উত্তর বিজয়পুর গ্রামের দীপালি রানি পাল দরিদ্রতা ও বাল্যবিবাহের কারণে খুব বেশি লেখাপড়া করার সুযোগ পাননি। নিজের ইচ্ছা পূরণ করতে না পারলেও তার সন্তানদের লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করেছেন। গ্রামের মেয়েদের স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য বাল্যবিয়ে না করা এবং লেখাপড়া করার কথা বলছেন। স্বামীর অসচ্ছল পরিবারে মাটির হাঁড়ি-পাতিল তৈরি এবং গবাদিপশু লালন-পালন করে সন্তানদের সুশিক্ষিত করার জন্য সংগ্রাম করেছেন। তার বড়ো ছেলে বিএ পাশ করে বর্তমানে একটি বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত রয়েছেন। দ্বিতীয় ছেলে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে এমএ পাশ করে ঢাকায় একটি প্রাইভেট ফার্মে কর্মরত রয়েছেন এবং তৃতীয় ছেলে দশম শ্রেণিতে পড়ছে। দুই মেয়ের মধ্যে বড়ো মেয়ে এসএসসি এবং ছোটো মেয়ে কুমিল্লা মহিলা কলেজ থেকে অনার্স পাশ করেছেন। বাল্যবিবাহ না করে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য তিনি তার আশেপাশের নারীদের পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
মোসা. জাহানারা বেগম
জোড়কানন পশ্চিম ইউনিয়নের কালিকাপুর গ্রামে জন্ম নেয়া মোসা. জাহানারা বেগম একজন সংগ্রামী নারী। সমাজের কিছু কুচক্রী লোক তার বাবার জমিজমা দখল করে নেয়। চাচার সংসারে থেকে চাচাতো ভাইবোনদের পড়িয়ে লেখাপড়া চালাতে থাকেন। চাচার ভাইবোনদের ভালো রেজাল্ট দেখে এলাকার অন্য শিশুদের অভিভাবকরাও তার কাছে পড়াতে আগ্রহী হন। নিজের লেখাপড়ার খরচের সঙ্গে সঙ্গে মাকেও সংসারের খরচ নির্বাহে সহযোগিতা করতে থাকেন। ২০০২ সালে এসএসসি পাশ করে আনসার একাডেমি থেকে সেলাই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণের ষষ্ঠ স্থান অধিকার করে পুরস্কার হিসেবে একটি সেলাই মেশিন পান। বাড়িতে এসে সেলাই করার পাশাপাশি কাপড় বিক্রি এবং বিভিন্ন দোকানে তৈরি পোশাক সরবরাহ করতে শুরু করেন। এইচএসসি পাশ করে বিয়ে হয় তার। বর্তমানে এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। তিনি মেয়েদের প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে বর্তমানে বিনামূল্য মেয়েদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ব্যাপারে পরামর্শ এবং সহযোগিতা করে থাকেন।
মরিয়ম আক্তার
মরিয়ম আক্তার জোড়কানন পশ্চিম ইউনিয়নের ধনপুর গ্রামে একটি সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। অসচ্ছল পরিবারে কষ্ট করে পড়াশোনা করছিলেন তিনি কিন্তু অষ্টম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় মা মারা যান এবং এরপরই বাবাও প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে বিছানায় শায়িত হন। অভাব মোচনের জন্য কোচিং সেন্টারের মাধ্যমে টিউশনি শুরু করেন। ছোটো ভাইবোনদের লেখাপড়া করানোর পাশাপাশি নিজে এইচএসসি পাশ করেন। বিয়ের পর স্বামীর অনুমতিক্রমে এলাকার অন্যান্য অসচ্ছল নারীদের সংগঠিত করে মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন নিয়ে ‘সবুজ বাংলা মহিলা উন্নয়ন সংস্থা’র কার্যক্রম আরম্ভ করেন। এই সমিতির মাধ্যমে একটি মুদি দোকান এবং একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুল স্থাপন করেন। এই স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষিকার সংখ্যা আট জন এবং ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ১৮০ জন। পাশাপাশি হস্ত ও কুটির শিল্প প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অসহায় দরিদ্র নারীদের স্বাবলম্বী করতে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তিনি। নারী নির্যাতন এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করার জন্য সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। সংস্থার সদস্যদের নিয়ে বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রমও চালু করেছেন তিনি।
