বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে দিন দিন পলিথিনের ব্যবহার বাড়ছে। নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও এমন কোনো দিন নেই, যেদিন আমরা পলিথিন ব্যবহার করি না। প্রতিদিনকার ছোট-বড়ো সব কেনাকাটায় পলিথিন যেন আমাদের নিত্যসঙ্গী। এর ফলে আমাদের চারপাশে জমছে পলিথিনের বর্জ্য, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। পলিথিন পচনশীল নয়, তাই মাটি হারাচ্ছে তার উর্বরতা শক্তি। এছাড়া পলিথিনে মাছ, মাংস মুড়িয়ে রাখলে কিছুক্ষণ পরে এতে রেডিয়েশন তৈরি হয়ে খাবার বিষাক্ত হয়ে ওঠে। পলিথিনকে চিকিত্সাবিজ্ঞানে চর্মরোগের অ্যাজেন্ট বলা হয়। আর এই পলিথিন নিয়ে সাড়া ফেলে দিলেন মাহবুব সুমন।
মাহাবুব সুমন পেশায় তড়িত্ প্রকৌশলী। জন্ম ও বেড়ে ওঠা নারায়ণগঞ্জে। চার ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয় মাহাবুব। পড়াশোনা করেছেন ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে। সম্প্রতি তিনি আলু থেকে দেশীয় পদ্ধতিতে আবিষড়ার করেছেন পলিথিন। যেটি পরিবেশবান্ধব। এর আগেও মাহাবুব কাগজ থেকে গাছের চারা উত্পাদন করে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন।
আলু থেকে তৈরি পচনশীল স্বচ্ছ ব্যাগের নাম পলকা। এক কথায় পলিথিনের বিকল্প। প্রতি কেজি আলু থেকে ১৫টা পলিথিনের ব্যাগ তৈরি হয়। লেবার, ইলেকট্রিসিটি সব খরচ মিলিয়ে একটি পলিথিনের মূল্য ৩ টাকা পড়ে। আবার উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করলে উত্পাদন ব্যয় অনেক কমে আসবে। এমনকি ব্যবহারের পর পলকা ফেলে দিলে ৩০-৯০ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ মাটিতে মিশে যাবে। স্ট্যান্ডার্ড সাইজের পলাক ব্যাগের ধারণ ক্ষমতা ৫ থেকে ৬ কেজি।
মাহাবুব সুমন বলেন, ‘পলিথিনের বিকল্প নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা আমার অনেক দিনের। তবে কাজ শুরু করি ২০১৮ সালে। মুন্সিগঞ্জে আলুর কোল্ড স্টোরেজে সৌর বিদ্যুতের কাজ করতে গিয়ে জানতে পারি, তারা খুবই আর্থিক ক্ষতিতে আছেন। কারণ গত কয়েক বছর ধরে দেশের উত্তরাঞ্চলে আলু চাষ বেশি হওয়ায় ঢাকাসহ আশপাশের আলু চাষি ও কোল্ড স্টোরেজ ব্যবসায়ী উভয়েই মারাত্মক আর্থিক ক্ষতিতে আছেন। তখন আমার মনে হয়েছিল, আমি যদি এই ব্যবসায়ীদের আলু থেকে কোনো সেকেন্ডারি বা টারশিয়ারি প্রোডাক্ট ডেভেলপ করে দিতে পারি, তাহলে চাষি ও ব্যবসায়ীরা বেঁচে যাবে। আর প্রযুক্তিসহ পণ্যটি যদি পরিবেশবান্ধব হয় তাহলে পরিবেশের দূষণ কমে বরং উপকার হবে। মাঝখান থেকে প্রচুর নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এভাবেই মূলত পলকার চিন্তা মাথায় আসে। আলু দিয়ে অন্য কোনো প্রোডাক্ট বানালে খাদ্য সংকট হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। কারণ আলুর বার্ষিক চাহিদার চেয়ে প্রায় ৫০ লক্ষ টন বেশি উত্পাদন হচ্ছে।’
কীভাবে পলকা বানাতে হয় জানতে চাইলে মাহাবুব বলেন, ‘পলকা তৈরির জন্য একটা পাত্রে ১০ গ্রাম স্টার্চ, ৫ মিলি ভিনেগার, ৫ মিলি গ্লিসারিন, ৬০ মিলি পানি ভালো করে মিশিয়ে গরম করতে হবে। কিছুক্ষণ গরম করলে এটি ঘন থিকথিকে হয়ে উঠবে। শুকানোর পর হাতে নিয়ে দেখবেন পলকা তৈরি হয়ে গেছে। এরপর তাকে গরম করলেই হবে যাবে পলকা। আমি চাই পলিথিনের বদলে এই পরিবেশবান্ধব পলকা সবাই ব্যবহার করবে। এতে পরিবেশ বাঁচাবে আর পরিবেশ বাঁচলে আমরা সবাই ভালো থাকব।
কাজ করতে গেলে বাধা আসবেই। আর সেই বাধাকে যে পিছনে ফেলে দিতে পারবে, সেই সাফল্যের মুখ দেখবে। আমি যখন শুরু করেছিলাম, তখন অনেকেই আমাকে বলেছে, এগুলো কোনো দিনই করতে পারবে না। আমি তাদের কথা না শুনে নিজে একাই এগিয়ে গিয়েছি। নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ করে সফল হওয়া একটা বিরাট চ্যলেঞ্জ। বর্তমানে গবেষণার অর্থের সংকট আমার জন্য সবচেয়ে বেশি বাধা হয়ে যাচ্ছে।’
তরুণ উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে মাহাবুব সুমন বলেন, ‘বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবী এক কঠিন সময় পার করছে? জলবায়ু পরিবর্তন শুধু নয়, পরিবেশে সংকটের নানা দিক মানুষসহ সকল প্রাণের অস্তিত্ব হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। এ রকম অবস্থায় পড়াশোনা শেষ করার পর গতানুগতিক চাকরির পিছনে না ছুটে পরিবেশের জন্য কিছু করলে খুবই ভালো হয়। কারণ তার মধ্য দিয়ে নতুন ব্যবসা, পরিবেশের উপকার এবং কর্মসংস্থান সবই হয়। ব্যবসায় নতুন উদ্যোগ সব সময়ই কঠিন। সুতরাং একজন নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে সৃজনশীল আইডিয়া দিয়ে যদি পৃথক কোনো সেবা বা পণ্য নিয়ে কাজ করা যায়, তাহলে সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।’
