মোস্তাফিজুর রহমান খান মারুফের গল্পটা একটু অন্যরকম। টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার মির্জাপুর সাহাপাড়ার বর্গাচাষি অলিউল্লাহ খানের বড়ো ছেলে মারুফ বেশ ভালোভাবেই এসএসসি পাশ করে। এরপর উচ্চশিক্ষা গ্রহণের প্রচণ্ড ইচ্ছা ছিল তার। মারুফের বাবা-মাও চাইতেন, ছেলে আরো লেখাপড়া করুক, আরো ‘বড় পাশ’ দিক। কিন্তু ‘সর্বগুণ বিনাশী দারিদ্র্য’ মারুফ ও তার বাবা-মায়ের ইচ্ছাপূরণে বাদ সাধে।
সংসারের অভাব-অনটন, বাবা-মায়ের কষ্ট এবং ছোটো ভাইবোনের আবদার পূরণ করতে না পারার বেদনা নিয়েই কাটছিল মারুফের দিনরাত্রি। এ সময় একদিন পত্রিকায় প্রকাশিত একটি বিজ্ঞাপন পড়ে মারুফ জানতে পারে, সরকার ‘সেইপ’ নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, যেখানে বিনা খরচে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রশিক্ষণকালীন উপবৃত্তি লাভ এবং প্রশিক্ষণ শেষে চাকরির নিশ্চয়তাও রয়েছে। উল্লেখ্য, দারিদ্র্য বিমোচন ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ ‘স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (সেইপ)’ বাস্তবায়ন করছে। ২০১৪ সালের জুলাই মাসে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মাধ্যমে ২০২০ সালের মধ্যে দেশে ৫ লাখ দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা হবে। সম্পূর্ণ সরকারি খরচে এই প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে এবং প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে ৭০ শতাংশের চাকরির সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশপাশি কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির জন্য এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হচ্ছে। দেশে-বিদেশে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাহিদার আলোকে বেসরকারি পর্যায়ে ১২টি ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন, সরকারি পর্যায়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই বিভাগ তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে টাঙ্গাইল সরকারি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারেও (টিটিসি) গ্রাফিক্স ডিজাইন কোর্সসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছিল।
মারুফ গ্রাফিক্স ডিজাইন কোর্সে ভর্তির জন্য আবেদন করার পর তাকে ভর্তি পরীক্ষায় ডাকা হয়। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর টাঙ্গাইল সরকারি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারে (টিটিসি) ছয় মাস মেয়াদি গ্রাফিকস ডিজাইন কোর্সে মারুফ ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। এ সবই ২০১৭ সালের কথা। প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার আগেই মারুফ তার পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়, ব্যবসা করবে। প্রশিক্ষণ শেষে পূর্বসিদ্ধান্ত অনুযায়ী টাঙ্গাইল কুমুদিনী কলেজের সামনে একটি দোকান ভাড়া নেয় সে। এরপর ব্যাংকের স্থানীয় একটি শাখা থেকে ১ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে শুরু হয় মারুফের পথচলা।
ব্যবসায় থেকে বর্তমানে প্রতি মাসে মারুফ আয় করছে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা; আর এই ব্যবসায়ে তার মূলধন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ লাখ টাকা। ‘সেইপ’-এর উপকারভোগী মারুফ একপর্যায়ে তার ছোটো ভাইকেও একই পথে নিয়ে এসেছে। মারুফের ছোটো ভাইও টাঙ্গাইল সরকারি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (টিটিসি) থেকে ছয় মাস মেয়াদি গ্রাফিকস ডিজাইন কোর্সে প্রশিক্ষণ সম্পন্নের পর এখন লেখাপড়ার পাশাপাশি বড়ো ভাই মারুফকে ব্যবসায়ে সাহায্য করছে।
ব্যবসায়ে সফল হওয়ার পর স্বাভাবিকভাইে মারুফের পরিবার আর্থিক অভাব-অনটন থেকে মুক্তি পেয়েছে। লেখাপড়া অব্যাহত রাখার নিশ্চয়তা মিলেছে ছোটো ভাইবোনদের। দুই ভাই মিলে একটি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলবেন—এমন পরিকল্পনার কথা জানিয়ে মারুফ বললেন, ‘প্রতি মাসে বাবা-মায়ের হাতে যখন সংসার খরচের টাকা তুলে দিই, তখন নিজেকে অনেক সৌভাগ্যবান মনে হয়। তাদের মুখে হাসি দেখে আমার খুব ভালো লাগে।’ মারুফ আরো বললেন, ‘এই যে আমার ভালো লাগা; আমার পরিবারের ভালো থাকা—এ সবই সম্ভব হয়েছে আমার প্রচেষ্টা এবং ঐ প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তায়। এজন্য আমি তাদের তথা সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। আমি বিশ্বাস করি, যেসব বেকার তরুণ-তরুণী হতাশায় ভুগছে, তাদের আলোর পথ দেখাতে পারে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান। প্রশিক্ষণ গ্রহণ করলে চাকরি কিংবা আত্মকর্মসংস্থানের পাশপাশি দক্ষ জনশক্তিরূপে দেশের উন্নয়নেও মানুষ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।’
n লেখক : উন্নয়নকর্মী
