রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়—জনগণের ইচ্ছা অনুযায়ী পরিচালিত শাসনব্যবস্থাকে গণতন্ত্র বলে। আমরা সাধারণরা বুঝি ৪৯-৫১ হলো গণতন্ত্র। যারা ৫১-এ থাকবেন তারাই রাষ্ট্রের জন্য সরকার, সমিতির জন্য কমিটি গঠন করবেন। তবে মাইনরিটির সম্মতিসাপেক্ষে মেজরিটি দেশ পরিচালনা করবেন। এ উন্নত মানসিকতা না থাকলে গণতন্ত্র ব্যর্থ হয়। গণতন্ত্রের আরেক বৈশিষ্ট্য হলো— পরমতসহিষ্ণুতা প্রদর্শন। মুক্তচিন্তা, মতামত প্রকাশকে কোনো ক্রমেই দমন করা ঠিক হবে না; ক্ষেত্রবিশেষে মননশীল কাজকে দিতে হয় পৃষ্ঠপোষকতা। তাছাড়া কোনো দেশের গণতন্ত্রকে, গণতন্ত্রের চূড়ান্ত মডেল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গণতন্ত্র সব সময়ই বিকাশমান পদ্ধতি। ১৯৭১ সালে গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। নানা উত্থান, বিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশ এগিয়ে যায়; কিন্তু ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যা করে সামরিক স্বৈরাচার ক্ষমতা কুক্ষিগত করে। ফলে গণতন্ত্রে সোজা পথচলা রুদ্ধ হয়ে যায়। গণতন্ত্রের শুদ্ধ অনুশীলন আমাদের রাজনীতিতে আশানুরূপ গড়ে ওঠেনি।
৯০ দশকের শুরুতে গণতন্ত্রের যে যাত্রা শুরু হয়েছে সেখানে পত্রপত্রিকার স্বাধীনতা কিছুটা থাকলেও রেডিও-টেলিভিশনে তেমনটি নেই। আমরা আশা করতে পারি—আরো যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসবে গণতন্ত্রের প্রশাসনকে। আইনের অপপ্রয়োগে কার্যকরীব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থারও উন্নতি করতে হবে। উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা গণতন্ত্র বিকাশে ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা না থাকলে কোনো তন্ত্রই এগিয়ে যেতে পারে না। ইতিমধ্যে সচ্ছলতা আনতে সরকার অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং করছে। সাম্প্রদায়িকতা গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় মস্ত বড়ো অন্তরায়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গণতন্ত্র বিনির্মাণ করতে হবে। তাতে সুফল আসবে দ্রুত। সুষ্ঠু গণতন্ত্র বিকাশ করতে হলে নিম্নস্তর থেকে ঊর্ধ্ব পর্যায়েও গণতন্ত্র চর্চা করতে হবে। ইতিমধ্যে সরকার কয়েক স্তরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করেছেন। জনগণ তার জন্য সুফলও পাচ্ছেন। আশা করা যায়, এ ব্যবস্থাপনা গণতন্ত্রের ভীতকেই মজবুত করবে। অন্যদিকে নারীর ক্ষমতার পথ সুগম হবে। তাছাড়া দুর্নীতি নির্মূল করতে হবে; না হলে গণতন্ত্র বিকশিত হবে এটা আশা করা বৃথা। সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গঠন করতে না পারলে গণতন্ত্রের বিকাশ সম্ভব হবে না।
গণতন্ত্র চাওয়া-পাওয়ার বিষয়ের চেয়ে অনুশীলনের বিষয়। অনুশীলনে গণতন্ত্র বিকশিত হয়। গণতন্ত্রে পারস্পরিক সহনশীলতা, শ্রদ্ধাবোধ, শান্তি ও সম্প্রীতির সহাবস্থান সৃষ্টি হবে। গণতান্ত্রিক সমাজ বির্নিমাণে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার চেষ্টা করতে হবে।
বড়ো বড়ো পণ্ডিতদের এবার বিকাশমান পদ্ধতি প্রয়োগের সময় এসেছে। ভোটারগণ খুব চালাক আচরণ করছে। তারা বুঝতে পারছে এবার কারা জিতবে। যদিও এই নির্বাচন ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটির। এটা জাতীয় নির্বাচন নয়। তার পরেও আন্তর্জাতিক অঙ্গন এই নির্বাচনকে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং বেশ কয়েকটি শক্তিশালী দেশ পর্যবেক্ষক পাঠাচ্ছে।
এবারের ঢাকার নির্বাচনের পর বুদ্ধিজীবীদের ভাবতে হবে এর সমাধান কোথায়। শক্তিশালী বিরোধী দল কোথায়? প্রতিবাদী কণ্ঠ না থাকলে তো গণতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়ে যেতে পারে!
n লেখক : বিশ্ব-সভ্যতা বিকাশ ইতিহাসের গবেষক
