কেমন হওয়া উচিত ভোটাধিকার প্রয়োগের মানদণ্ড?

আপডেট : ২২ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১:৪৮

ড. মো. নাছিম আখতার

‘দ্রষ্টা’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ যিনি দেখেন অথবা গভীর অন্তর্দৃষ্টি বা সত্যদৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তি। স্বপ্নদ্রষ্টা হলেন সেই ব্যক্তি যিনি স্বপ্ন দেখেন। অন্যকে স্বপ্ন দেখাতে হলে আগে নিজে স্বপ্ন দেখতে হয়, হতে হয় সত্ ও দক্ষ। সফল রাজনীতিবিদ হলেন স্বপ্নদ্রষ্টা এবং ইতিবাচক স্বপ্নের দিশারি। তাদের দেখা স্বপ্নের বাস্তবায়নই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে সফল গন্তব্যের দিকে। তাই ভোট দেওয়ার পূর্বে অবশ্যই স্বপ্নদ্রষ্টার সততা, সক্ষমতা ও দূরদর্শী ভাবনা বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় আনতে হবে। 

আজ আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক। এদেশের মাটিতে আমাদের যে নিঃশঙ্ক পদচারণা, তার রূপকার হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ব্রিটিশ শাসন অবসানের পরও বাঙালির জীবনে শোষণ-নিপীড়ন থেমে থাকেনি, বরং তা বেড়ে যায়। তারই ধারাবাহিকতায় নিজের মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার আদায়ের সোচ্চার আন্দোলনে জীবন দিতে হয় এদেশের তরুণ ছাত্রসমাজকে। ভোটে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সত্ত্বেও এদেশের মানুষ পায়নি দেশ পরিচালনার অধিকার, পরিবর্তে পেয়েছে অবর্ণনীয় নিপীড়ন ও নির্যাতন।

অধিকারবঞ্চিত এই জনগোষ্ঠীকে একত্রিত করার প্রত্যয়ে সর্বদা সোচ্চার ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেই তিনি ক্ষান্ত হননি, তার দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞাই স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে। তিনি সবসময়ই এই দেশের মানুষের মুক্তি ও সমৃদ্ধির স্বপ্ন দেখেছেন। এ স্বপ্ন বাস্তবায়নে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়ে ১২ বছরের অধিককাল তিনি কারাবন্দি থেকেছেন। কিন্তু এই দেশের মানুষকে মুক্ত করার সংকল্প থেকে কখনো বিচ্যুত হননি। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট দেশকে অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করতে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র এই কিংবদন্তি নেতাকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে। এরপর নানা উত্থান-পতন, চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে সেনাশাসন, স্বৈরশাসন অতিক্রম করে আমরা গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছি।

গত ১০ বছর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার দেশ শাসন করছে। এ সময়ে যে দেশে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আজকে বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল বাংলাদেশ। আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির রেকর্ড ৭.৮৬ শতাংশ হয়েছে। মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ১৭৫১ মার্কিন ডলার। দারিদ্র্যের হার কমে ২১.৮ ভাগ হয়েছে। দেশে বেকার যুব সমাজের জন্য ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের মতো মেগাপ্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। গত ১০ বছরে আমাদের যে অর্থনৈতিক অগ্রগতি হয়েছে তা এদেশের ইতিহাসে তার তুলনা বিরল। দেশ এগিয়ে চলেছে। পিতার অসম্পূর্ণ কাজকে সমাপ্ত করতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তারও স্বপ্ন ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মুক্ত বাংলাদেশ।

সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্য ফখরুল ইসলাম ‘পিপলস অ্যান্ড পলিটিক্স’ নামে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার গবেষণা রিপোর্ট তুলে ধরে বলেছেন, “রিপোর্টে সত্ সরকারপ্রধান হিসেবে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বের মধ্যে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছেন, আর কর্মঠ সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী চতুর্থ স্থান অর্জন করেছেন।” এ ব্যাপারে তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেছিলেন, “অনুভূতির কথা আগেও বলেছি এখনো বলব—কী পেলাম, কী পেলাম না সেই হিসাব মেলাতে আমি আসিনি। কে আমাকে স্বীকৃতি দিল সে হিসাব আমার নেই। আমার একটাই হিসাব এই বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে কতটুকু কাজ করতে পারলাম, সেটাই আমার কাছে বড়।” এমন দায়বদ্ধ, দূরদর্শী ও পরিশ্রমী রাজনৈতিক দর্শনের ব্যক্তি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকলে নিঃসন্দেহে দেশের উন্নয়ন সাধিত হবে।

আজ ডিজিটাল বাংলাদেশ কার্যক্রমও দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে। সরকার আইসিটি শিল্পের বিকাশে হাইটেক ও সফটওয়্যার পার্ক এবং বিজনেস ইনকিউবেশন সেন্টার গড়ে তুলছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্য হলো, ২০২১ সালের মধ্যে আইসিটি রপ্তানি ৫ বিলিয়ন ডলার ও আইটি পেশাজীবীর সংখ্যা ২০ লাখে উন্নীত করা এবং জিডিপিতে আইসিটি খাতের অবদান ৫ শতাংশ নিশ্চিত করা। এসব কার্যক্রমের সুফল হিসেবে সফটওয়্যার রপ্তানিতে এবছর আমাদের আয় প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।

রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় ১৯৬১ সালে। জমি অধিগ্রহণ করা হয় ১৯৬২-১৯৬৮ সাল পর্যন্ত। ১৯৬৯-১৯৭০ সালে ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের এ প্রকল্প তত্কালীন পাকিস্তান সরকার বাতিল করে দেয়। ১৯৭২-১৯৭৫ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের একটি পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ পুনরায় গ্রহণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর অনেকগুলো বছর পেরিয়েছে। কোনো সরকারই পারমাণবিক বিদ্যুত্ প্রকল্পের জন্যে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেনি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী পারমাণবিক বিদ্যুত্ প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করেছেন। ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের লক্ষ্যে এই প্রকল্প রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতায় দু্রতগতিতে এগিয়ে চলেছে।

বিশ্বব্যাংকের ষড়যন্ত্রমূলক অভিযোগের প্রেক্ষিতে পদ্মা সেতু তৈরির প্রকল্প বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এমতাবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের সাহায্য ছাড়াই জনগণকে পদ্মাসেতু বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখালেন। শুরুতে অনেকের কাছে বিষয়টি অবাস্তব মনে হলেও পদ্মা সেতুর অনেকাংশই আজকে দৃশ্যমান। এমন দূরদর্শী স্বপ্নদ্রষ্টা ও স্বপ্ন দিশারির হাতে দেশ থাকবে সুরক্ষিত ও নিরাপদ।

মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী যখন দিশেহারা, তখন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা রোহিঙ্গাদের জন্যে বাংলাদেশের সীমান্ত উন্মুক্ত করে দেন। তার একটি ভাষণে রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে তিনি বলেন, “আমরা খেলে রোহিঙ্গারাও খাবে, প্রয়োজনে তাদের সঙ্গে খাবার ভাগ করে খাব আমরা।” রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় ২০১৭ সালে যুক্তরাজ্যের টেলিভিশন ‘চ্যানেল ফোর’ তাকে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ আখ্যা দেয়, দুবাইভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘খালিজ টাইমস’ তাকে ‘স্টার অব দি ইস্ট’ বিশেষণে ভূষিত করে। মানবতার প্রতি এমন উদারতা ও মমতা জনগণের হূদয় স্পর্শ করবে বলে আমার বিশ্বাস।

বাংলাদেশ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। এদেশের ভালোমন্দের সঙ্গে মিশে আছে আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যত্ প্রজন্মের আশা আকাঙ্ক্ষা ও উন্নয়ন। তাই স্বপ্নদ্রষ্টার সততা, সক্ষমতা ও দূরদর্শিতা বিবেচনায় ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখতে সকলের ঐকান্তিক চেষ্টা একান্তভাবে কাম্য।

n লেখক :অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর