নাজমুল হক
ডিজিটাল গুজব এক আতঙ্কের নাম যা বর্তমানে দেশের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। এটি শুধু দেশের সমস্যা নয় বরং বহির্বিশ্বেও এটি প্রকট আকার ধারণ করেছে। আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির উন্নয়নে অল্প সময়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় তথ্য আদান-প্রদানে এনে দিয়েছে সহজলভ্যতা। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। আর এ মাধ্যমগুলোর মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো ফেসবুক। অতি কম খরচে ও সহজ হওয়ায় সবারই পছন্দের শীর্ষে রয়েছে এ মাধ্যমটি। আর এ মাধ্যমটি যেমন সুযোগ- সুবিধা প্রদান করছে তেমনই একে ব্যবহার করে কিছু ব্যক্তিত্বহীন, অর্থলিপ্সু ও স্বার্থান্বেষী মহল অপপ্রচার, মিথ্যা রটনা ও বানোয়াট তথ্য অর্থাত্ গুজব ছড়াচ্ছে। এ মাধ্যমটিতে কোনো তথ্য, পোস্ট বা ভিডিও শেয়ার করলে তা মুহূর্তের মধ্যেই ভাইরাল হয়ে পড়ে। বর্তমানে দেশে ৯ কোটিরও বেশি লোক ইন্টারনেট ব্যবহার করছে তন্মধ্যে ৫ কোটিরও বেশি লোক ফেসবুক ব্যবহার করে। পূর্ব থেকে গুজবের প্রচলন থাকলেও গত কয়েক বছর ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে আঁকড়ে ধরে নানা রকম অপপ্রচার, মিথ্যা-বানোয়াট তথ্য আর গুজব ছড়ানোর মাত্রাটা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করার ফলে অপপ্রচারকারীদের দৌরাত্ম্য যেন কিছুতেই কমছে না। নৈতিকতা ও মানবিকতাহীন এসব ব্যক্তি সবসময় গুজব, ষড়যন্ত্র ও মিথ্যাকে আঁকড়ে ধরে পড়ে থাকে। রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় এমনকি পারিবারিক জীবনেও এখন এসব অপরাধই প্রকট আকার ধারণ করেছে। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করে যাচ্ছে-তাই করছে। যার প্রতিটির পেছনে থাকে সুদূরপ্রসারী কারণ। বিশেষ করে দেশের সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের ওপর রামু, নাসিরনগর ও রংপুরের মতো বড় ধরনের সহিংসতা চালানো হয়। এছাড়াও অন্যান্য স্থানে ডিজিটাল গুজব সৃষ্টি করে রাষ্ট্র ও জনজীবনে অরাজকতা সৃষ্টি করা হয়। আর প্রতিটি ক্ষেত্রেই আশ্রয় নেওয়া হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো গুজবের। গত কয়েকমাস আগে, নিরাপদ সড়কের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হলে কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের যৌক্তিক আন্দোলনকে পুঁজি করে ফেসবুকে প্রচার করা হয়েছে ডিজিটাল গুজব। সরকার আশ্বাস দিলেও কুচক্রি মহল এই নিষ্পাপ ছাত্র-ছাত্রীদের কোমল অনুভূতিকে রাষ্ট্র ও সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর জন্য বিভিন্ন ষড়যন্ত্র শুরু করে। অভিনেত্রী নওশাবা ঝিগাতলায় দুজনকে মেরে ফেলার মতো মিথ্যা-বানোয়াট কথা বলে ফেসবুকে প্রচার করে। এই আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে রাষ্ট্রীয় ও জনজীবনে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা সৃষ্টির উদ্দেশে ফেসবুকে কোনো ছবি বা ফটোশপসহ আপলোড করে গুজব ছড়ানো হয়েছে। যা ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া। এছাড়াও চাঁদে আল্লামা সাঈদী সাহেবকে দেখা গেছে, হাসপাতালে বিল দিতে না পেরে মা ও শিশুর আত্মহত্যা ইত্যাদি সবই ছিল গুজবের অন্তর্ভুক্ত। আবার সেফাতুল্লাহ নামক জনৈক ব্যক্তি তরুণ সমাজকে বিভ্রান্ত করতে অশ্লীল, নোংরা ও উসকানিমূলক কথা বলে গুজব ছড়াচ্ছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অর্থের লোভে কেউ কেউ এটাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করছে। এর ফলে প্রতিটি দলের মধ্যে দেখা দেয় শত্রুতার ভাব। কোনো কিছু না হতেই গুজব ছড়ানোর ফলে প্রতিহিংসার রাজনীতি সৃষ্টি হয়। আবার একদলের পক্ষ নিয়ে অন্য দলের বিপরীতে উসকানিমূলক কথা প্রচার করে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করাই এদের কাজ। যার ফলে দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।
দিন দিন তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার ঘটায় অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে যা পূর্বের তুলনায় ঢের বেশি। এক্ষেত্রে আইনের প্রয়োজন অনিবার্য হওয়ায় বর্তমান সরকার ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮’ জাতীয় সংসদে পাশ করে।
আগামী ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। পূর্ব অভিজ্ঞতার ফলস্বরূপ বলা যায়, প্রতিবারের ন্যায় এবারো আগামী সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ডিজিটাল প্লাটফর্মে বিতর্কিত ঘৃণাসূচক বক্তব্য প্রচার ও কদর্য ভিডিও বার্তার মাধ্যমে উসকানির ঘটনা ঘটতে পারে। আর অনেকক্ষেত্রেই এ গুজবের ফলাফল হয় ভয়ঙ্কর। ইন্টারনেটের বিপ্লবের কারণে গুজব ছড়ানোর ঝুঁকি এখন সবচেয়ে বেশি। এক্ষেত্রে সরকারকে ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ভিডিও শেয়ারিং পোর্টাল, ইউটিউব, মাইক্রো ব্লগ সাইট, টুইটারসহ বিভিন্ন ধরনের ব্লগ ও ওয়েবসাইট মনিটরিং করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ঠেকাতে ‘গুজব শনাক্তকরণ সেল’ গঠন করেছে সরকার। আর জনশৃঙ্খলার জন্য হুমকিস্বরূপ অসত্য, মিথ্যা, বানোয়াট বা অতিরঞ্জিত কোনো বিষয় বা সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি নষ্ট করে কোনো আন্দোলন বা নাশকতাকে উসকে দেয় বা রাষ্ট্রকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দেয়, এমন বিষয়গুলোকে গুজব শনাক্তকরণ সেল চিহ্নিত করবে। এতে করে কেনা হচ্ছে উন্নতমানের যন্ত্র। তাই ডিজিটাল অপরাধের কবল থেকে রাষ্ট্র ও জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা প্রদান করতে সরকারকে শক্ত হাতে প্রতিহত করতে হবে। সরকারের একার পক্ষে সব দিক সামলানো সম্ভব হয় না। এজন্য প্রয়োজন জনসচেতনতা। তাই কোনো নিউজ আসলে আমাদের তা যাচাই-বাছাই করে গ্রহণ করতে হবে। সর্বোপরি বলতে চাই, ‘আসুন, অপপ্রচার বা গুজবকে না বলি, সত্য ও সুন্দর জীবন গড়ি’।
n লেখক:শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
