হিম শীতের কুয়াশা ছিন্ন করে তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে মুখরিত এখন আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রারম্ভে এ নবীন শিক্ষার্থীদের নিকট এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম র্যাগিংপ্রথা। বিশ্ববিদ্যালয়ে অসুস্থ বিনোদনগুলোর অন্যতম একটি হচ্ছে র্যাগিং সিস্টেম। যদিও র্যাগিং শব্দের প্রচলিত অর্থ পরিচয় পর্ব। আবার অনেকে একে ঐতিহ্য বা সংস্কৃতি নানা বিশেষণে বিশেষায়িত করে থাকেন। তবে বিষয়টি এরূপ বিশেষণের মধ্যে কখনোই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিস্তর আলোচনা করলে দেখা যাবে, দক্ষিণ এশিয়ার কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই র্যাগিং সমস্যা রীতিমতো অপসংস্কৃতির রূপ পরিগ্রহ করছে। সম্প্রতি দিল্লির ইউনিভার্সিটি গ্রান্ট কমিশন (ইউজিসি) কার্বিং দ্য মেনাস অব র্যাগিং ইন হায়ার এডুকেশন ইনস্টিটিউশন রেগুলেশন নামক একটা অ্যান্টি র্যাগিং আইন পাস করতে বাধ্য হয়েছে। যেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে—ধর্ম, বর্ণ বা জাত নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য, কারো পোশাক নিয়ে কটূক্তি, কোনো ব্যক্তির যৌন পছন্দ নিয়ে ব্যঙ্গ, রূপান্তরকামীদের উদ্দেশে ব্যঙ্গাক মন্তব্য, কারো জন্মস্থান, বাসস্থান বা নাগরিকত্ব নিয়ে কটূক্তি, আর্থিক অচলাবস্থা নিয়ে কটূক্তিসহ কোনো অংশগ্রহণকারীর সম্মতির সঙ্গে বা বিনা অনুমতিতে তার ওপর কোনো কর্ম বা পরিস্থিতি তৈরি করা যা ঐ শিক্ষার্থীর মানসিক, শারীরিক বা একাডেমিক স্বাস্থ্য বা সুরক্ষাকে অনিচ্ছাকৃতভাবে বা অচেনাভাবে বিপন্ন করে—এগুলোর সবই র্যাগিংয়ের আওতাভুক্ত হবে। তবে আমাদের দেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে র্যাগিংবিরোধী নানা কার্যক্রম থাকলেও কেন্দ্রীয়ভাবে এখনো কোনো আইন পাস হয়নি।
সাধারণত আচার-ব্যবহার শেখানোর অন্তরালে নানা অস্বাভাবিক বা অসংগতিপূর্ণ কার্যকলাপ করানো অথবা অশ্লীল শব্দবাক্য ব্যবহার প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এ র্যাগিংপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে থাকে। দেখা যায়, ভর্তির পরপরই ক্লাস করতে এসে জুনিয়র শিক্ষার্থীরা সিনিয়রদের হাতে দফায় দফায় র্যাগিংয়ের শিকার হতে থাকে। একটা সময় ছিল যখন র্যাগিং হতো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই বা হলগুলোতে। কিন্তু বর্তমান সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কড়া নজরদারি ও আইনের যথাযথ প্রয়োগের ফলে এখন ক্যাম্পাস সীমানায় র্যাগিংয়ের প্রকোপ কমে গেলেও, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাহিরে মেস বা পথে প্রান্তরে লোকচক্ষুর আড়ালে টিকে আছে এই ঘৃণিত অপসংস্কৃতি। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাজীবন শেষ করে সব শিক্ষার্থীই স্বপ্ন দেখে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের। কিন্তু সে ভাগ্য অর্জন করেও যদি তাকে র্যাগিং নামক একটি শব্দের ভয়াবহতায় সে স্বপ্নের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিত্যাগে বাধ্য হতে হয়, এর চেয়ে দুঃখের বা লজ্জার আর কিছু হতে পারে না!
স্বপ্নচারী নবীনেরা তাদের স্বপ্নের ক্যাম্পাসে ভর্তি হয়ে স্বপ্নের ডালি সাজাচ্ছে, যেখানে তারা তাদের ভয়কে করবে জয়। কিন্তু এ নবীন শিক্ষার্থী স্বপ্নসিঁড়িতে পা রাখতেই র্যাগিংয়ের শিকার হয়ে যদি হোঁচট খায়, তবে এ দায়ভার কার? র্যাগিংকে কেন্দ্র করে অনেক নাটক, শর্ট ফিল্ম নির্মিত হয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে র্যাগিং নিয়ে অসাধারণ একটি সিনেমা নির্মিত হয়েছে— টেবিল নং ২১। র্যাগিং যদি মারাত্মক অবস্থায় চলে যায় তবে তা যেকোনো শিক্ষার্থীর মনোজগত্ ও জীবনের ওপর কতটা প্রভাব ফেলে তার একটি করুণ দৃশ্য দেখানো হয়েছে এই হিন্দি মুভিটির শেষ ভাগে। তবে এগুলোতে আদৌ কি কোনো সমাধান আছে? যদি না আমরা পরিবর্তন হই, যদি না আমাদের চেতনার বিকাশ ঘটে! শুধুমাত্র তরুণ প্রজন্মের বোধোদয় হলেই এই র্যাগিং নামক বিষবাষ্প অপসারিত হওয়া সম্ভব বলে বোধ করি, কারণ এর শিকড় গ্রথিত উচ্চশিক্ষিত প্রজন্মের চিন্তা জগতে। র্যাগিং একটি অপরাধ, বিকৃত মানসিক রোগও বটে। কারণ অন্যকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পাওয়া এক ধরনের অসুস্থতার পরিচয় বটে। তাই এই র্যাগিং নামক ভাইরাস প্রতিহত করতে প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জেগে ওঠা অতীব জরুরি।
n লেখক :শিক্ষার্থী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ
