দ্বিজাতিতত্ত্ব-উদ্ভবের কার্যকারণ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০২০, ২০:১৬

দ্বিজাতিতত্ত্বের মতো একটি অপতত্ত্ব-সম্ভূত ‘পাকিস্তান’ নামক একটি অপরাষ্ট্রের অধিবাসী হয়ে আমাদের প্রায় সিকি শতাব্দী কাটাতে হয়েছে, এবং প্রভূত প্রাণ ও মান বিসর্জন দিয়ে সেই অপরাষ্ট্রটির হাত থেকে আমাদের মুক্তি পেতে হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে :একটি অপতত্ত্ব হয়েও দ্বিজাতিতত্ত্ব কী করে এমন শক্তিমন্ত হয়ে উঠলো, এবং একটি অপরাষ্ট্রের জন্ম ঘটাতে পারলো?

প্রশ্নটির উত্তর রাজনীতিকদের বিভিন্ন গোষ্ঠী—মুসলিম লীগ, কংগ্রেস, কমিউনিস্ট বিভিন্ন ভাবে দিয়েছে। এদের একের ভাবনা অন্যের সঙ্গে মূলতই সাংঘর্ষিক।

সন্দেহ নেই :মুসলিম লীগ নামক রাজনৈতিক সংগঠনটিই দ্বিজাতিতত্ত্বের মতো অপতত্ত্বটির প্রবক্তা। ব্রিটিশ-শাসনাধীন অখণ্ড ভারতবর্ষে হিন্দু আর মুসলমান ছিল দুটো স্বতন্ত্র জাতি, এবং স্বতন্ত্র জাতিরূপেই মুসলমানেরা একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের দাবিদার, সেই স্বতন্ত্র রাষ্ট্রটিরই বাস্তব রূপ ‘পাকিস্তান’—এমনটিই মুসলিম লীগের বক্তব্য। কংগ্রেসীদের মতে এই বক্তব্য সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। তাদের বিবেচনায় :শাসক ব্রিটিশরাই নিজেদের স্বার্থে এই ভ্রান্ত মতবাদের জন্ম দিয়ে হিন্দুদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের লাগিয়ে দিয়েছে,—ব্রিটিশদের ভেদনীতিই দ্বিজাতিতত্ত্বের মতো অপতত্ত্বের ভ্রূণটিকে লালন করেছে। অন্যদিকে কমিউনিস্ট তথা বামপন্থীরা এই অপতত্ত্বের মূল রূপে নির্দিষ্ট করেছে অর্থনৈতিক কারণকে।

এদের সকলের ভাবনাতেই খণ্ড খণ্ড সত্যের প্রকাশ ঘটেছে, কোনো খণ্ডই পুরোপুরি খণ্ডনীয় নয়। আবার সমস্ত খণ্ডগুলিকে সম্মিলিত করে যে একটি পুরো অখণ্ড সত্যের প্রাপ্তি ঘটবে—তেমনটিও নয়। তাহলে?

এর উত্তর কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠী কিংবা সমাজ চিন্তকদের, কেউ দিতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। আমি তো মনে করি এই উত্তর খোঁজার জন্য শরণ নিতে হবে কবি-সার্বভৌম রবীন্দ্রনাথের।

না। রবীন্দ্রনাথ তাঁর লেখার কোথাও ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন কিনা—আমার জানা নেই। সম্ভবত করেননি। তবু আমার মনে হয় :দ্বিজাতিতত্ত্বের উদ্ভবের পেছনকার কার্যকারণ সর্ম্পকটি রবীন্দ্রনাথের চৈতন্যেই যথাযথ ছায়াপাত করেছিল।

ব্রিটিশরাই হিন্দুদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের লাগিয়ে দিয়ে মহা অন্যায় করেছে, হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে প্রকৃত প্রস্তাবে কোনো বিভেদ বা বিরোধ ছিল না—তখনকার কংগ্রেসীদের এই ভাবনায় রবীন্দ্রনাথের সায় ছিল না। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনে তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯০৬ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলিম লীগ। এর পরের বছরই—১৯০৭ সালে—‘প্রবাসী’ পত্রিকায় ‘ব্যাধি ও প্রতিকার’ শীর্ষক যে-প্রবন্ধটি রবীন্দ্রনাথ প্রকাশ করেন, সেটি পড়ে স্পষ্টই বোঝা যায় :সেই সময়েই এই ক্রান্তদর্শী কবি এদেশে হিন্দু-মুসলমান সমস্যার আসল রূপটি যেন দিব্যদৃষ্টিতে দেখে ফেলেছিলেন। প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় সেই ‘ব্যাধি ও প্রতিকার’ প্রবন্ধটি থেকে কিছুটা দীর্ঘ উদ্ধৃতি এখানে পেশ করছি—

“আজ আমরা সকলেই এই কথা বলিয়া আক্ষেপ করিতেছি যে, ইংরেজ মুসলমানদিগকে গোপনে হিন্দুর বিরুদ্ধে উত্তেজিত করিয়া দিতেছে। কথাটা যদি সত্যই হয় তবে ইংরেজের বিরুদ্ধে রাগ করিব কেন। দেশের মধ্যে যতগুলি সুযোগ আছে ইংরেজ তাহা নিজের দিকে টানিবে না, ইংরেজকে আমরা এতবড় নির্বোধ বলিয়া নিশ্চিত হইয়া থাকিব এমন কী কারণ ঘটিয়াছে।

মুসলমানকে যে হিন্দুর বিরুদ্ধে লাগানো যাইতে পারে সেই তথ্যটাই ভাবিয়া দেখিবার বিষয়, কে লাগাইল সেটা গুরুতর বিষয় নয়। শনি তো ছিদ্র না পাইলে প্রবেশ করিতে পারে না; অতএব শনির চেয়ে ছিদ্র সম্বন্ধেই সাবধান হইতে হইবে। আমাদের মধ্যে যেখানে পাপ আছে শত্রু সেখানে জোর করিবেই—আজ না করে তো কাল করিবে, এক শত্রু যদি না করে তো অন্য শত্রু করিবে — অতএব শত্রুকে দোষ না দিয়া পাপকেই ধিক্কার দিতে হইবে।

হিন্দু-মুসলমানের সম্বন্ধ লইয়া আমাদের দেশে একটা পাপ আছে; এ পাপ অনেক দিন হইতে চলিয়া আসিতেছে। ইহার যা ফল তাহা ভোগ না করিয়া আমাদের কোনো মতেই নিষ্কৃতি নাই। ...

... আর মিথ্যা কথা বলিবার প্রয়াজন নাই। এবার আমাদিগকে স্বীকার করিতেই হইবে হিন্দু-মুসলমানের মাঝখানে একটা বিরোধ আছে। আমরা যে কেবল স্বতন্ত্র তাহা নয়। আমরা বিরুদ্ধ।

আমরা বহুশত বত্সর পাশে পাশে থাকিয়া এক খেতের ফল, এক নদীর জল, এক সূর্যের আলোক ভোগ করিয়া আসিয়াছি; আমরা একভাষায় কথা কই, আমরা একই সুখ দুঃখে মানুষ; তবু প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রতিবেশীর যে সম্বন্ধ মনুষ্যোচিত, যাহা ধর্মবিহিত, তাহা আমাদের মধ্যে হয় নাই। আমাদের মধ্যে সুদীর্ঘকাল ধরিয়া এমন একটি পাপ আমরা পোষণ করিয়াছি যে, একত্রে মিলিয়াও আমরা বিচ্ছেদকে ঠেকাইতে পারি নাই। এ পাপকে ঈশ্বর কোনোমতেই ক্ষমা করিতে পারেন না।”

মুসলিম সম্প্রদায়ের একটা অংশ কট্টর হওয়ার অনেক আগেই, ১৯১৪ সালে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে ধরা পড়েছিল,—

“হিন্দু মুসলমানের পার্থক্যকে আমাদের সমাজে আমরা এতই কুশ্রীভাবে বেআব্রু করিয়া রাখিয়াছি যে, কিছুকাল পূর্বে স্বদেশী অভিযানের দিনে একজন হিন্দু স্বদেশী প্রচারক এক গ্লাস জল খাইবেন বলিয়া তাঁহার মুসলমান সহযোগীকে দাওয়া হইতে নামিয়া যাইতে বলিতে কিছুমাত্র সংকোচ বোধ করেন নাই। কাজের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার বশে মানুষ মানুষকে ঠেলিয়া রাখে, অপমানও করে— তাহাতে বিশেষ ক্ষতি হয় না।... আমরা বিদ্যালয়ে ও আপিসে প্রতিযোগিতার ভিড়ে মুসলমানকে জোরের সঙ্গে ঠেলা দিয়াছি, সেটা সম্পূর্ণ প্রীতিকর নহে তাহা মানি তবু সেখানকার ঠেলাঠেলিটা গায়ে লাগিতে পারে, হূদয়ে লাগে না। কিন্তু সমাজের অপমানটা লাগে না, হূদয়ে লাগে। কারণ, সমাজের উদ্দেশ্যই এই যে, পরস্পরের পার্থক্যের ওপর সুশোভন সামঞ্জস্যের আস্তরণ বিছাইয়া দেওয়া।”

‘জমিদার’ রবীন্দ্রনাথের কাছারিতে মুসলমান প্রজার প্রতি যে অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হতো, ‘কবি’ রবীন্দ্রনাথের কাছে তা অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। এরকম একটি ঘটনার বিন্দুতে তিনি দেশের সাম্প্রদায়িক সমস্যার সিন্ধু দর্শন করতে পেরেছিলেন। তাই, একাধিক লেখায় অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে সেই ঘটনাটির কথা তিনি উল্লেখ করেছেন। মুসলিম লীগের পাকিস্তান প্রস্তাব উত্থাপনের এক যুগ আগেই তিনি লিখেছিলেন,—

“আমি যখন আমার জমিদারী সেরেস্তায় প্রবেশ করলেম তখন একদিন দেখি, আমার নায়েব তার বৈঠকখানার এক জায়গায় জাজিম খানিকটা তুলে রেখে দিয়েছেন। যখন জিজ্ঞেস করলেম এ কেন, তখন জবাব পেলেম— যে সব সম্মানী মুসলমান প্রজা বৈঠকখানায় প্রবেশের অধিকার পায় তাদের জন্য এই ব্যবস্থা। এক তক্তপোশে বসাতেও হবে অথচ বুঝিয়ে দিতে হবে আমরা পৃথক। এ প্রথা তো অনেকদিন ধরে চলে এসেছে; অনেকদিন মুসলমান মেনে এসেছে, হিন্দুও মেনে এসেছে। জাজিম তোলা আসনে মুসলমান বসেছে, জাজিম পাতা আসনে অন্যে বসেছে। তারপর ওদের একদিন ডেকে বলেছি, আমরা ভাই, তোমাকে আমার সঙ্গে ক্ষতি স্বীকার করতে হবে, কারাবাস ও মৃত্যুর পথে চলতে হবে। তখন হঠাত্ দেখি অপরপক্ষ লাল টকটকে নতুন ফেজ মাথায় দিয়ে বলে, ‘আমরা পৃথক’। আমরা বিস্মিত হয়ে বলি, রাষ্ট্র ব্যাপারে পরস্পর পাশে এসে দাঁড়াবার বাধাটা কোথায়? বাধা ঐ জাজিম তোলা আসনে বহুদিনের মস্ত ফাঁকটার মধ্যে। ওটা ছোট নয়। ওখানে অকুল অতল কালাপানি। বক্তৃতামঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে ডাক দিলেই পার হওয়া যায় না।”

রবীন্দ্রনাথ-কথিত এই ‘অকুল অতুল কালাপানি’র ব্যবধান-যে কেবল মুসলিম লীগের তথা মুসলমানদেরই সৃষ্টি—এমন কথা বললে খুবই ভুল করা হবে। আমরা দেখলাম :রবীন্দ্রনাথের চিত্তে কখনো এমন ভুলের সঞ্চার ঘটেনি। এই ব্যবধান-সৃষ্টির কাজে হিন্দুদের ভূমিকাই-যে ছিল প্রধান,—কবি গুরুর বিভিন্ন লেখায় তারই স্পষ্ট প্রকাশ ঘটেছে। উপমহাদেশের ইতিহাসে তার কথার সত্যতাই বিধৃত হয়ে আছে। সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্ররূপে পাকিস্তান সৃষ্টির বিষয়টি সেই সত্যেরই সাক্ষ্য দেয়।

মুসলিম লীগের মতোই হিন্দুমহাসভাও ছিল একটি সাম্প্রদায়িক সংগঠন। ইতিহাসে দেখি—মুসলিম লীগের আগেই হিন্দুমহাসভা দ্বিজাতিতত্ত্বের ধারণার প্রবক্তা হয়ে উঠেছে।

তত্কালীন হিন্দুমহাসভার নেতা বিনায়ক দামোদর সাভারকর ১৯৩৮-এর ডিসেম্বরে মহাসভার নাগপুর অধিবেশনে প্রকাশ্যেই ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, ‘উই দি হিন্দুজ আর অ্যা নেশন বাই আওয়ারসেলভ্স’। এর দু’বছর পর ১৯৪০ সনে লাহোরে মুসলিম লীগের সভায় লীগ নেতা জিন্নাহ সাহেব যেন সাভারকরের কথা লুফে বলেছিলেন,—“ভারতীয় মুসলমানরা শুধু একটি সম্প্রদায় মাত্র নয়, তারাও একটি জাতি (নেশন) এবং ব্রিটিশ ভারতবর্ষে হিন্দু ও মুসলমান এই দুই জাতির বাস।”

সাম্প্রদায়িক হিন্দুরা এভাবে মুসলমানকে কেবল একটা ‘নেশন’-ই বানালো না, মুসলমানদের হাতে ‘পাকিস্তান’-ও তুলে দিলো। ১৯৪০ সনের তেইশ মার্চ মুসলিম লীগের ‘লাহোর প্রস্তাবে’ পাকিস্তানের নামগন্ধও ছিল না।

অথচ এ-প্রস্তাবটিই কী করে ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ নামে দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়ে যায় তার বর্ণনা দিয়ে মুসলিম লীগ নেতা খালিকুজ্জামান জানিয়েছেন যে,

“পরের দিন (অর্থাত্ চব্বিশে মার্চ) সকালে হিন্দু সংবাদপত্রসমূহে বড়ো বড়ো অক্ষরে প্রকাশিত হলো ‘পাকিস্তান প্রস্তাব গৃহীত’, যদিও ওই নাম দুটি বক্তৃতার কোনোটিতেই উচ্চারিত হয়নি বা প্রস্তাবেও উল্লিখিত হয়নি। জাতীয়তাবাদী সংবাদপত্রসমূহ মুসলিম জনসাধারণের সামনে এক সুসংবদ্ধ ধুয়ো উপস্থিত করলো এবং অবিলম্বে তা তাদের সামনে একটি রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি খাড়া করলো। লাহোর প্রস্তাব মুসলমানদের কাছে পৌঁছে দিতে এবং তার যথার্থ অর্থ ও তাত্পর্য তাদের কাছে ব্যাখ্যা করতে মুসলমান নেতাদের অনেক সময় লাগতো। হিন্দু সংবাদপত্রসমূহ লাহোর প্রস্তাবের নাম ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ দিয়ে মুসলিম জনসাধারণের কাছে এর তাত্পর্য বোঝানোর জন্যে নেতাদের যে বহু বছরের পরিশ্রমের প্রয়োজন পড়তো তার হাত থেকে তাদের রেহাই দিলো।”

জিন্নাহ্র এককালের একান্ত সচিব পীরজাদা জানিয়েছেন যে,

“স্বয়ং জিন্নাহ্ সাহেব হিন্দুদের ধন্যবাদ দিয়ে বলেছিলেন, পাকিস্তান শব্দ আমরা চালু করিনি, হিন্দুরাই এই শব্দটি আমাদের উপহার দিয়েছেন। লাহোর প্রস্তাবের তীব্রভাবে সমালোচনা করতে গিয়ে হিন্দুরা পাকিস্তান প্রস্তাব রূপে এর উল্লেখ করেন। তার ফলেই এই শব্দের প্রচলন হয়।”

এই সূত্রেই রবীন্দ্রনাথের বক্তব্যসমূহ আবার স্মরণ করতে হয়। তাঁর অসাধারণ দূরদর্শিতায় একান্ত বিস্ময়াভিভূত না-হয়ে পারা যায় না।