খোলা আকাশের নিচে ‘এক কদম’

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০২০, ২০:১৯

কর্মব্যস্ত দিনের শেষে ত্যক্ত-বিরক্ত মন কিছুতেই যেতে চাইছিল না, বাতাসের ধুলো খেয়ে, রাস্তার জ্যাম ঠেলে কাওরান বাজারের মতো নগরীর ব্যস্ততম অংশে। অন্যদিকে, প্রদর্শনীর নামের প্রতি আকৃষ্ট মন ঘরে ফিরতেও সায় দিচ্ছিল না। এ জি টাওয়ার আমার কাছে অচেনা কংক্রিটের কাঠামো মাত্র। চারুকলার এক সিনিয়র বোনের সহযোগিতায় পৌঁছে গেলাম ৬ জানুয়ারি সন্ধ্যা ছয়টা নাগাদ। বাইরে থেকে এ জি টাওয়ারটা দেখে ভাবছিলাম, এই কমার্শিয়াল বিল্ডিংয়ে কোনো গ্যালারি আছে বলেও তো জানি না। নিচে ওয়াচম্যানকে জিজ্ঞাসা করতেই জানাল, ছাদে চলছে প্রদর্শনী। চটজলদি মনে পড়ল, ফেসবুকের ইভেন্টের পোস্টারটা আমার পড়াই হয়নি। লিফটে উঠে, কিছুদূর সিঁড়ি বেয়ে আবার ছাদে পৌঁছালাম। দেখলাম, মাত্র কিছুক্ষণ আগের ফেলে আসা আমার চিরচেনা ঢাকা শহরটা ঠিক আমার চোখের সামনে, এই ছাদটাকে ঘিরেই। প্লাটফর্ম আয়োজিত রাজধানীর এ জি  টাওয়ারের ছাদে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ‘এক কদম’ শিরোনামে গত পাঁচ জানুয়ারি উদ্বোধন হওয়া প্রদর্শনীসংক্রান্ত আলোচনা-সমালোচনা বিষয়ক কোনো লেখনী লেখার প্রয়োজন বোধ করছি না। যা বোধ করছি, তা হলো, প্রদর্শনীর গতানুগতিক ধারা ভেঙে ফেলা এ উদ্যোগের বিষয়ে মুগ্ধতা আর আমার বিশেষ অনুভূতির প্রকাশ।

কথায় আছে, গপ্পবাজ বাঙালি নাকি কেবল আড্ডা দিতে দিতে গুলে কাজ খেয়ে ফেলেন। প্রদর্শনী দেখতে গিয়ে উদ্যোক্তা এবং শিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে যা বুঝলাম, নিছকই একটি আড্ডার মধ্য দিয়ে এ প্রদর্শনীর সম্পূর্ণ পরিকল্পনা করা হয়, যার সফল বাস্তবায়ন ছাদটাকে ঘিরে চোখের সামনে স্পষ্টভাবে ধরা দিয়েছিল। ধুলোমাখা, হাজারো শব্দ, চিত্কারের আড়ালে ঢেকে যাওয়া ব্যস্ততার শহরটায় বসে শিশিরে ভেজা মাঠ, ফুল, পাখি, লতাপাতা নিয়ে খুব একটা ভাববার সময় মেলার কথা না। এখানে রয়েছে লাখো মানুষ, আর সেই লাখো মানুষের কোটি কোটি স্বপ্ন। রয়েছে স্বপ্নের নানা গল্প। কোনোটা স্বপ্পপূরণের, আবার কোনোটা স্বপ্পভঙ্গের। রয়েছে তারুণ্যের হতাশা, একাকীত্ব আবার পাশাপাশি, প্রবল উচ্ছ্বাস, আশা- আকাঙ্ক্ষা। একটা উদ্যোগ তখনই সার্থক হয়, যখন উদ্যোগের উদ্দেশ্য এবং তার সুস্পষ্ট চিত্র মানুষের চোখে জোরালোভাবে ধরা দেয়। প্রদর্শনীর স্থান হিসেবে ছাদকে নির্বাচন করা, শুধুমাত্র প্রদর্শনীর বিষয়টি মাথায় রেখে জায়গাটি ব্যবস্থাপনা এবং অভ্যন্তরীণ নকশা করা, পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিকভাবে চলমান চিত্র আর সংগীতায়োজন করা—সবকিছুই যেন চিরচেনা আমার নগরীকে উপস্থাপন করে যাচ্ছিল বেশ সরল ভঙ্গিমায়।

অবশ্য, প্রদর্শনীর কিউরেটর হাসিব জুবেরী শিহান প্রদর্শনীটিকে প্রদর্শনী বলতে নারাজ—‘যেহেতু আমাদের ভাবনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমরা একসাথে একটি যাত্রার মধ্য দিয়ে গিয়েছি, কর্মশালা করেছি, প্রত্যেক শিল্পীর কাজকে খুব কাছ থেকে দেখেছি, প্রদর্শিত প্রত্যেকটা শিল্পকর্ম তৈরির প্রক্রিয়া দেখার মধ্য দিয়ে গিয়েছি, তাই আমার কাছে এ এক যাত্রা। আর আমাদের অর্জিত অভিজ্ঞতাটি মানুষের সাথে ভাগ করে নিতেই এ অনুষ্ঠান।’ ছাদকে প্রাধান্য দেওয়ার ব্যাপারে তিনি আরো বলেন :‘হাজারো উঁচু ভবনে ছেয়ে যাওয়া শহরটাতে ভবনের ছাদ আমাদের আয়োজনের সাথে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বলেই মনে করেছি, যেখানে লোকে এসে একাত্ম আর নিরুদ্বেগ হয়ে আয়োজন উপভোগ করবেন।’

শুরুতেই চোখে পড়ে ‘রহস্য নগরীর চাবি’ শিরোনামে শিল্পী রাকিব আনোয়ারের একটি বিশালাকৃতির অঙ্কনচিত্র। আকৃতি এবং চিত্রকর্মটি স্থাপনের জায়গা বিবেচনা করলে, পুরো প্রদর্শনীতে এই বিশেষ শিল্পকর্মটি দৃষ্টি আকর্ষণ করছিল সকলের। শহরের গোলযোগ, অস্থিরতা, হতাশা, অস্তিত্ব সংকটের গোটা চিত্রটা যেন খুব স্পষ্টভাবে চোখে ধরা দিয়ে গেল। ছবির পেছনে উঁকি দেওয়া হলুদ রং আর অগোছালো শব্দের অভিধানটা যে শহরের মানুষ, মানুষের তৈরি করা অস্থির পরিবেশ আর তাদের মস্তিষ্কের অস্থিতিশীল ধাঁধার গল্প বলতে চাচ্ছে, বুঝতে বেগ পেতে হয়নি। এখানে স্থপতি, বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য ব্যান্ডদল ‘শিরোনামহীন’খ্যাত তানজীর তুহিনের নকশার সঙ্গে শিল্পকর্মগুলো আনুপাতিকভাবে সাজানো হয়েছে, বলে মনে হলো। শিল্পকর্মটির কিউরোটোরিয়াল ব্যাবস্থাপনাকে খুব গুছানো আর সাবলীল মনে হয়েছে। শিল্পী রাকিব আনোয়ারের বাকি তিনটি চিত্রকর্মে আবার শহরের শব্দময়তার বিপরীতে অবস্থানরত এক অদ্ভুত শিথিলতার প্রকাশ পরিলক্ষিত হয়—আয়েশি ভঙ্গিতে বসে থাকা, খুব গতানুগতিক শহুরে পোশাকধারী নাগরিক, শহরের যে কোনো প্রান্তে বসে যে অবসর কাটাতে পারেন, তারও সহজ উপস্থাপন লক্ষ করা যায়।

তাছাড়া, এ আয়োজনে, শহরের নানা ভারসাম্যহীনতার মাঝে টিকে থাকার গল্প মূর্ত হয়ে ধরা দিয়েছে ভাস্কর আনিসুজ্জামান ফারুকীর ব্রোঞ্জের ভাস্কর্যগুলোতে। ছাদটিতে ভাস্কর্যগুলো প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে কিউরেটরের কাজ অনেকখানি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। ভাস্কর্যগুলো স্থাপনের ক্ষেত্রে তিনি পিলার আর দেয়ালকে মাথায় রাখেন। ম্যাটেরিয়ালের ক্ষেত্রে শহরের সহজপ্রাপ্যতার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে। ব্রোঞ্জের পাত, এবং তাতে উত্কীর্ণ ড্রইং, তার সঙ্গে ঊর্ধ্বমুখী সুরু সমাপ্তি টানা হয় মসৃণ কাস্টিং করে। দেখে মনে হচ্ছিল, এ যেন ভাস্কর্য শিল্পীর শিল্পপ্রকাশের এক বিশেষায়িত রূপ।

নিজের শেকড় ফেলে, স্বপ্ন নিয়ে আসা ঢাকামুখী মানুষ স্বপ্নপূরণের তাগিদে নিজের অস্তিত্ব ভুলে থাকতে পারে। কোলাহলে একাকী মানুষ আসলে কতটা এ শহরটার? বা, শহরটা কতটা তাদের নিজেদের? —এ প্রশ্নগুলো স্পষ্টভাবে ধরা দেয় শিল্পী আজিজি ফাওমি খানের চিত্রকর্মে। উত্তরবিহীন প্রশ্নের জালে আকটে পড়ে থাকা তার চিত্রকর্মে—শহরের মানুষের টিকে থাকার লড়াই দেখানো হয়েছে তাঁর বিশেষ অঙ্কন ধরন, পোর্ট্রেটের মাধ্যমে। তিনি বলেন, ‘শহরের প্রগতির গল্পগুলো এক-একটা বিশাল ফাঁদ কি না, তা হয়তো মানুষ নিজেও জানে না।’ তার ‘ইম্প্রেশন’ সিরিজের কাজে অঙ্কিত মুখমণ্ডলের ওপর তিনি কোথাও ঈশপের চরিত্র আর শহরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা রিকশা পেইন্টিংয়ের মোটিফ তুলে এনেছেন। ‘দিনশেষে একা মানুষগুলো প্রকৃত অর্থেই মনুষ্যসঙ্গ লাভ করছেন কি না, তা মানবমনের এক বিশাল সংকট।’ —বললেন শিল্পী আজিজি ফাওমি খান। আর তা-ই ফুটে উঠেছে তার ‘এম্পটি চেয়ার’ শিরোনামের কাজগুলোতে ।

বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী তানভীর আলম সজীবের তৈরি করা আবহসংগীত পুরো পরিবেশটাতে একধরনের প্রাণের সঞ্চার ঘটিয়ে চলে। আবার, বড়ো স্ক্রিনে শিল্পী তমার তৈরি করা একটি চলমান চিত্রও দেখানো হয়। তবে একাধারে এতগুলো শিল্পমাধ্যম একটি প্রদর্শনীতে দেখানোকে আমার কাছে কিঞ্চিত্ বিভ্রান্তিকর মনে হলেও পরে ভেবে দেখলাম—আমার শহরটাই তো এমন, বিভ্রান্তিকর। প্রদর্শনী বা আয়োজন যা-ই বলি না কেন, এর সফলতার জায়গা এখানেই যে তারা শহরকে ঠিক যেভাবে দেখাতে চেয়েছেন, দেখাতে পেরেছেন বলে আমার মনে হয়েছে। আবার ছাদের অভ্যন্তরীণ নকশার ক্ষেত্রে স্থপতি তুহিন বলেন—‘শহরের কর্মব্যস্ত মানুষ সাধারণত রাতেই আসবেন এই প্রদর্শনী দেখতে, তাই রাতকে ভেবেই নকশার কাজটি সম্পন্ন করা হয়।’

লক্ষ করলাম প্রতিটা চিত্রকর্মের পাশে কাজ আর শিল্পীর শিল্পনির্মাণের ভাবনার বর্ণনা রয়েছে, যা আমার কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। কারণ, শিল্পী রেখার মাধ্যমে যা বলতে চাচ্ছেন, তা দর্শকের কাছে লিখে প্রকাশ করলে দর্শকের মস্তিষ্ক কিছুটা হলেও অলস হয়ে যাবার ভয় থেকে যায়। অর্থাত্ দর্শক ভাববার প্রয়োজন না-ও বোধ করতে পারেন।

গত পাঁচ জানুয়ারি, ২০২০ থেকে ষোল জানুয়ারি ২০২০ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এ প্রদর্শনী দেখতে এসে দর্শক যে নিজের মৌলিক উপলব্ধির জায়গা থেকে ঢাকাকে ভিন্নরূপে উপভোগ করার সুযোগ পেয়েছেন, তা বলাই বাহুল্য। ছাদটাতে প্রবেশ করেই যেমন আমার মনে হয়েছিল, মোহাম্মদপুর থেকে কাওরান বাজারে যাওয়ার পথটাতে ফেলে আসা শহরটাকে যেন আমি সেখানে দেখতে পাচ্ছিলাম, তেমনি ফেরার সময় গাড়ির হর্ন, রাস্তা পারাপারের জটিলতা আর রাতে বাড়ি ফেরার উদ্বিগ্নতার মধ্যে দাঁড়িয়ে নিজেকে কিছুক্ষণ আগের ফেলে আসা ছাদের পরিবেশ থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন ভাবতে পারছিলাম না। আসলে শিল্পী এবং উদ্যোগক্তারা এই আবহটাই তৈরি করতে চেয়েছিলেন।