হালকা-পাতলা গড়নের মেয়েটি গুরুদাসপুর সরকারি কলেজে পড়ে। সেকেন্ড ইয়ারে পড়লেও তার কোনো ঘনিষ্ঠ বয়ফ্রেন্ড নেই। থাকবেই বা কী করে! অনঙ্গ ভৌমিকের একমাত্র মেয়ে আলো ভৌমিক। রোজ রং-বেরঙের কামিজ-ফ্রক সজ্জায় কলেজে যায়। চুলে রিবন টুইস্ট কিংবা পাঞ্চক্লিপ। পায়ে পার্পেল কালারের দামি কেড্স কিংবা পাঞ্জাবি কম্বো। মফস্বলের দশ চোখ তার মসৃণ ও ঝকঝকে ত্বকের ঝলক দেখলেও কারো কোনোকিছু বলার সাহস হয় না। আর্থিক সঙ্গতিপন্ন এবং উদার অনঙ্গ ভৌমিকের একটা শক্ত রাজনৈতিক পরিচয় আছে। আর আছে আলোর চাইতে ডাগর এবং ঝলকানো দুই ছেলে।
কিন্তু কী থেকে কী হয়ে যায়, কেউ বুঝতে পারে না। শুধু একদিন জানা যায়—আলো ভৌমিক শৈবাল মন্ডলের সঙ্গে পালিয়ে গেছে। এলাকার মানুষ বিষয়টি জেনে যারপরনাই বিস্মিত, হতবাক এবং কিছুটা স্তব্ধ হয়ে যায়। বড়োলোকের মেয়ে কোথাকার কোন ফকিরের ছেলের সঙ্গে উধাও। এই নিয়ে জনসমাজে কানাঘুষা—মানুষ তো শৈবাল সম্পর্কে জানে। সে একটা সঙ্গতিহীন এবং অসচ্ছল পরিবারের ছেলে। অন্তিক উপজেলা চাটমোহর থেকে এসে এ অঞ্চলে বাস করে। মাঝে মাঝে কুন্ডুদের চালের গুদামের হিসাব-নিকাশ করে দেয় এবং ঐ বাড়ির প্রাইমারির দুটো ছাত্র পড়ায়। এজন্য তার থাকার জন্য গুদামের পাশে ছোট একটি রুম দিয়েছে। সরকারি কলেজে ডিগ্রিতে পড়াশোনার বাইরে সে বাসায় বাসায় টিউশনি করে বেড়ায়।
ধর্ম অভিন্ন হলেও অনঙ্গবাবু জাত-পাত-বর্ণ এবং অর্থনৈতিক অসঙ্গতি বিবেচনায় মেয়ের এ পদক্ষেপকে মেনে নিতে পারেন না। চাল-চুলোহীন ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে! তাই তিনি কোর্টে গিয়ে কেস করেন, অবিলম্বে উদ্যোগ গ্রহণের জন্য থানায় তত্পরতা চালান। পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকে। তিনদিনের ভেতর চাটমোহর এলাকা থেকে ভালোবাসায় ভরপুর যুগলকে গ্রেফতার করা হয়। ইতিমধ্যে মায়ায় মরিয়া মিথুন পাবনা গিয়ে কোর্ট ম্যারেজ সেরে ফেলেছে।
আটক দম্পতিকে থানার কাস্টডিতে রেখে কনের অভিভাবককে জানানো হয়। আলোর বাবা-মা ও বলিষ্ঠ দুই ভাই এসে বোঝালেও আলো অবিচলিত এবং নিরাতঙ্ক থাকে। বলে, ‘যা করেছি, জেনেশুনেই করেছি আর ফেরার ইচ্ছে নেই। তোমরা আমাকে মেরে ফেললেও আমি শৈবালকে ছাড়বো না।’
বোনের অনুরক্তি ও আসক্তি দেখে দুই ভাই শৈবালকে ভীতিপ্রদর্শন করে। আলোর উদ্দেশে শৈবালকে শিখিয়ে দেয় এবং বলার জন্যে প্ররোচিত করে, ‘আমি তোমাকে পছন্দ করি না। আমি ভুল করেছি, তুমি বাবা-মা’র কাছে ফিরে যাও।’ তাদের শাসানো বুলি শুনে সে আতঙ্কে নিবৃত্ত, প্রতিরুদ্ধ এবং নিশ্চুপ থাকে।
ুশৈবালের এলাকার ইউপি চেয়ারম্যান নিজেকে সমদর্শী বিবেচনায় তার পক্ষাবলম্বন করে। একজন নিরীহ ও শান্ত ছেলের প্রতি বলপ্রয়োগে তার আপত্তি। তার মতে আদালতই এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিতে পারে। যথারীতি বিচারালয়ে গিয়েও আলো শৈবালের প্রতি অনড় ও একনিষ্ঠ থাকে। ফলে আদালতের নিষ্পত্তি অনুযায়ী আলো শৈবালের স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। নতুন দম্পতি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে।
নুন আনতে যার পান্তা ফুরায়, তার ঘাড়ের ওপর যদি বউ থাকে, তার লেখাপড়া হয় কীভাবে! ছাত্রাবস্থায় টিউশনির টাকা যাকে সংসারে দিতে হয়েছে, তার আবার বউ! উপার্জন ছাড়াই ওয়াইফ। বাড়ির দাগের ৪০ শতক জমিই যার বাবার একমাত্র সম্বল। সংসার সামলানোর চেষ্টায় বয়সী বাবা-মা অনেক কষ্ট করে অখণ্ড ভূমিতে নানারকম শস্যাবাদ করে। এছাড়া তার একটি সু্কলগোয়িং বোনও রয়েছে। অগ্রজ হিসেবে আগামীতে পরিবারের দায়িত্ব তারই কাঁধে নেওয়ার কথা। অথচ সে-ই এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন কাজ করে বসেছে।
সংসারের অনটন দূর করতে শৈবালের লেখাপড়া শিকেয় ওঠে। রোজগার করার জন্য অবিরাম প্রচেষ্টা এবং সেই চেয়ারম্যানের সহযোগিতায় উপজেলা সমাজকল্যাণ প্রজেক্টে একটা অস্থায়ী চাকরি মিলে যায়। ভিন্ন এবং দীর্ণ পরিবেশে এসে আলোর মুখ খুব একটা কালো না হলেও অভাবে হাসি-আনন্দ একেবারে উবে যায়। অপ্রার্থিত এবং অনভিপ্রেত জামাই বাড়িতে তার মা দু-একবার গেলেও সচ্ছল বাবা-দাদারা কখনো আলোর খবর নেয়নি। সময় কোনোমতে কাটতে থাকে, আর এই সুযোগে সংসারে নবজাতক সন্তান এসে ভর করে। তিন বছর পর প্রজেক্টের মেয়াদও শেষ হয়ে যায়। তখন শৈবাল কর্মহীন ও বেকার হয়ে পড়ে। গার্মেন্টস জব সহজলভ্য বলে পরিত্রাণের পথ হিসেবে প্রতিবেশীগণ পরামর্শ দেয়।
সংসারের চাকা সচল রাখতে সে ঢাকায় পাড়ি দেয়। গার্মেন্টসে একটা চাকরি জোগাড় করে নেয়। দায়িত্ববান পরিপালকের ন্যায় মাসে মাসে টাকা পাঠায়। কিন্তু একসময় আচানক অনির্ধারিতভাবে টাকা পাঠানোয় ভাটা পড়ে। বাড়ি আসা কমিয়ে দেয়। সবার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্যে ইতিপূর্বে অন্তত মাসে একবার ঘরমুখো হলেও এখন তিনমাসেও তার টিকি মেলে না। অশান্তিতে ভুগে তার মা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ে। পূর্ব থেকেই তার বাবার উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি ছিল, একদিন অপ্রত্যাশিতভাবে হার্ট অ্যাটাক করে হঠাত্ মারা যায়। বাড়িতে এসে বাবার শেষকৃত্য সম্পন্ন করে শৈবাল দ্রত ঢাকায় ফেরে।
ঢাকায় গিয়ে শৈবাল আর কারো সঙ্গে তেমন যোগাযোগ রাখে না। সেলফোনে কোনো সাড়া মেলে না। একদিন হঠাত্ তার মোবাইল ফোন রিসিভ হয়। কিন্তু অপরপ্রান্তে নারীকণ্ঠের নিনাদ। আলো জানতে চায়, ‘কে তুমি এতরাতে শৈবালের মোবাইল ফোনে?’
‘আমি তার রান্নার কাজের বুয়া। আজ একটু দেরি হয়ে গেছে।’
‘তাই বলে এত রাতে! ঠিক আছে শৈবালকে ফোন দাও।’
‘মশার কয়েল কিনতে সে একটু বাইরে গেছে। ফিরে এলে জানাবো।’
আলোর কেমন যেন সন্দেহ হয়। আশঙ্কা আর অনাস্থায় অন্তঃকরণ কেঁপে ওঠে। নিজের কাছে সবকিছু ওলটপালট, ঘোলাটে এবং অন্ধকার মনে হয়। অনিয়মিত টাকা প্রেরণ এবং সংযোগহীনতায় পূর্ব থেকেই মনের ভেতর ক্ষোভ ও অসেন্তাষ দানা বেধে উঠেছিল। বিষয়টি সুনিশ্চিত ও স্বচ্ছ হবার জন্যে কিছুক্ষণ পর আবার সে শৈবালকে কল দেয় এবং বারংবার রিং দিয়েও মোবাইল ফোন জবাবহীন পাওয়া যায়। বাধ্য হয়ে সে একটি মেসেজ পাঠায়, ‘তুমি এই বার্তা পাবার পর যদি না আসো, তাহলে আমি তোমাকে খুঁজতে কর্মস্থলে যাবো।’
বার্তার সংবাদ জরুরি প্রান্তসীমা হিসেবে কাজ করে। সপ্তাহখানেকের ভেতর সে বাড়ি আসে। সবার জন্যেই কিছু না কিছু কেনাকাটা করে নিয়ে আসে এবং সঙ্গে বাচ্চার খেলনা ও খাবার। মা-বোন, স্ত্রী-কন্যা সবাই কৈফিয়ত তলব করে। সে যুক্তিহীন নিরর্থক অজুহাত খাড়া করে, ‘অল্প বেতনের চাকরি, এজন্যে ঠিকমতো টাকা পাঠানো সম্ভব হয় না। ঘন ঘন মোবাইলে কথা বলতেও তো টাকা লাগে।’
শুনে স্ত্রী ফুঁসে ওঠে, ‘তুমি তো মোবাইল ফোন রিসিভই করো না। আসলে তোমার দায়িত্ববোধ নেই। ঢাকায় গিয়ে আমাদের কথা একদম ভুলে গেছ। তোমার ভেতর থেকে মনুষ্যত্ব মুছে গেছে। কোনো মানুষ এই রকম কাজ করতে পারে না। তোমার আর চাকরির দরকার নেই। প্রয়োজন হলে আমরা না খেয়ে থাকবো।’
‘আমাকে নিয়ে চিন্তা কোরো না, আর কাজ না করলে সংসার চলবে কী করে!’
‘আমার সাফ কথা, তোমার ঢাকায় যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।’
খোঁড়া ছুঁতোয় তবু সে ঢাকা চলে যায়। যাবার মাসখানেক পরই শোনা যায়, শৈবাল ঢাকায় কোনো এক গার্মেন্টস কর্মীকে বিয়ে করেছে। জানাজানি হবার পর সে আর বাড়িমুখো হয় না। স্ত্রী তো দূরের কথা, মা-বোনের কোনো খবর নেয় না। সন্তানকেও দেখতে আসে না। নতুন গার্মেন্টস স্ত্রীকে পেয়ে শৈবাল বর্বর, বুনো, নিষ্ঠুর এবং পিশাচ হয়ে ওঠে। ফুটফুটে শিশুকন্যা ‘সেবা’র কথাও তার মনে পড়ে না। মানুষ কীভাবে এত উদাসীন ও নির্মম হয়!
পিতৃগৃহ ছাড়া মেয়েদের জীবন সংগ্রামময়। প্রিয়জন পর হয়ে যাওয়ার পর অসহায়ত্ব ও হতাশায় চরম উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে আলো। সে ভাবে, এ অবস্থায় পিতৃগৃহ সহজেই সাহায্যের জন্যে এগিয়ে আসে। কিন্তু আমার তো সে পথও বন্ধ। আনুকূল্য চাইতেও এখন আত্মজ্ঞানে বাধে। আবার অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজঅর্ডার বা চরম হতাশায় ভেঙে পড়লে সবকিছু শেষ হয়ে যাবে। পজিটিভ চিন্তা করতে হবে। সন্তানকে বাঁচাতে হবে, সংসারের সবাইকে সহায়তা করতে হবে। স্থানীয় চেয়ারম্যানও একদিন বাড়ি এসে জানিয়ে গেছে, ‘মা, তুমি চাকরি-বাকরি বা অন্য যে-কোনোকিছু করার চিন্তা করতে পারো, যে-কোনো অসুবিধায় আমি তোমার পাশে আছি।’
অনঙ্গ ভৌমিকের আদরিণী আহ্লাদী মেয়ে তার অতীতের সবকথা বেমালুম ভুলে যায়। সবকিছু ভুলে পরিবর্তনের কথা চিন্তা করে। বুঝতে পারে, অপভ্রষ্ট শৈবাল আর সহজে ফিরে আসবে না। কোনো মোহিনীর মায়াজালে সে আটকে পড়েছে। আমার কথা নাইবা বললাম, তার নিজের সন্তান তো রয়েছে। রয়েছে মা-বোন। স্বামী বিশ্বাসঘাতকতা ও বেইমানি করলেও তার মনুষ্যত্ববোধ তাকে জাগিয়ে তোলে। সে নিজের জন্য, সন্তানের জন্য, রোগাক্রান্ত শাশুড়ি এবং ননদের জন্য একেবারে ঘুরে দাঁড়ায়। সকলের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়।
অনাগত আগামীর কথা ভেবে আলো শৈবালের অস্থায়ী চাকরিকালে একটা এনজিওর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে অংশগ্রহণ করেছিল। সেখানে সে সেলাইয়ের কাজের ওপর প্রত্যয় ও আস্থা অর্জন করে। সেটাকে পুঁজি করেই অগ্রসর হবার কথা চিন্তা করে। স্বল্প পরিসরে সেলাই ও সূচিকর্মের কাজ আরম্ভ করে। বোধ, বুদ্ধি এবং ব্যগ্রতা থাকায় কারিগরি নৈপুণ্য প্রদর্শনে সিদ্ধিলাভ করে।
বাজারের চাইতে অপেক্ষাকৃত কম মজুরি আর সেলাইয়ের গুণগত ও সজ্জামান ভালো থাকায় এলাকার মেয়েরা দলে দলে তার কাছে আসতে থাকে। ইন্টারনেটে ইউটিউব দেখে নতুন নতুন ডিজাইন শিখে কারিগরি দক্ষতা বাড়াতে থাকে। এতে তার কাজের পসারও বাড়তে থাকে। সুনামের সঙ্গে আলোর বিচ্ছুরণ ঘটতে থাকে। কর্মভারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আলো ভৌমিক অতিরিক্ত সেলাই মেশিনসহ কর্মীসংখ্যা বাড়াতে থাকে। বিভিন্ন বয়সের নয় জন নারী তাকে এ কাজে সহায়তা করে। সহযোগিতায় নিযুক্ত নারীদের ন্যূনতম উপার্জনের পথ করে দিতে পেরে তার নিজের কাছেও এখন পরিতৃপ্তি লাগে।
আলোর সংসারের চাকা সচ্ছলতায় ঝলমল করে ওঠে। তার তরুণ বয়সের মতো ননদ সুরমাও নিত্যনতুন পোশাক পরে কলেজে যায়। পূর্বস্মৃতি মনের কোণে উঁকি দিলেও বর্তমান অবস্থাতেই প্রতিবিধান খুঁজে পায়। সে অনুধাবন করে, তারই উদ্যোগ ও আগ্রহের কারণে তার সঙ্গে আরো কয়েকজন নারী স্বাবলম্বী হবার চেষ্টা করছে। এমনকি তার পীড়িত শাশুড়ি পর্যন্ত চিকিত্সার ফলে একটু সুস্থ হয়ে উঠেছে।
শৈবালের ডাইনি স্ত্রীর সম্মোহনী ক্ষমতা বোধহয় ফিকে হয়ে গেছে। হয়তোবা ভাতারখাকির ভানুমতীর খেল এইবার শেষ হয়েছে। এখন আর তাকে ইন্দ্রজালে আটকে রাখতে পারছে না। ফলে শৈবাল আবার আলোর দিকে ফিরে আসতে চাইছে।
