ক্ষণিকা গণিকা নগ্নিকা

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০২০, ২০:২১

ক্ষণিকা

সবই ঠিক করা থাকে, আজকেও ছিল যখন আমি হোটেলে পৌঁছালাম। দারোয়ান ভাই সালাম দিল, হোটেলের লোকটা এসে আমার সাথে লিফটে উঠল, আমার ছোট্ট সুটকেসটা হাতে নিয়ে। আমরা ওপরে চলে গেলাম। সবই ঠিকঠাক, সবই নিরাপদ। দরজাটা খুলে এরই মধ্যে ঠাণ্ডা করে রাখা ঘরটিতে গিয়ে বসলাম। আট তলা থেকে ঢাকার ট্র্যাফিক জ্যাম অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়... এই জ্যাম এই ঘর থেকে অনেকবার দেখেছি... তবুও বারান্দায় গেলাম... তবুও দাঁড়িয়ে দেখলাম ঢাকার দিকে তাকিয়ে... কিছুই বোঝা যায় না সন্ধ্যায় ঝিকমিকি আলো ছাড়া... তবুও জানি না কেন দাঁড়িয়ে থাকলাম অনেকক্ষণ...

 

 

গণিকা

যা হয় বিছানায়, তার অনেক নাম আছে তবে আমার মনে পড়ে না। পর্দা টানা থাকলেও বাইরের আলোর ছায়া পড়ে বিছানায়। যার সাথে শুয়ে আছি, সে এখন কিছুটা ঘুম ঘুম চোখে টিভির রিমোটটা নিয়ে টিপাটিপি করছে, সে আমাকে চেয়ে নিয়েছে... টাকা বেশি দেবে অথবা আমার উপরি কামাই। এটা তো আমার প্রতি তার আগ্রহ, তাই তার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা। সে কে তাকে আমি ওপর থেকে জানি। কেন আমাকে চাই সেটা জানি না। দরকার নেই, তবুও জানতে ইচ্ছা করে। আমার সাথে যেতে পয়সা লাগে, তাও লোকটা আসে, যদিও চাইলেই এই শহরের বিনা ভাড়ায় মেয়ে পাওয়া যায়।

একটা ভালোলাগা তো আছেই... মানে ইগো আরকি... তার স্ত্রী আছে, গার্লফ্রেন্ড আছে, আনন্দসঙ্গী আছে, তবুও সে আমাকে চায়, দুই-এক রাতের জন্য...। লোকটা ঘুমিয়ে পড়ে আমাকে জড়িয়ে ধরেই। যেভাবে বাচ্চারা মায়েদেরকে জড়িয়ে ধরে ঘুমায়। আমি শুয়ে থাকি, ঘরের মধ্যে এলকোহল আর সিগারেটের গন্ধ শুঁকি।

পাশের ঘরে দুইজনের ঝগড়াঝাটি চলছে... বোঝা গেল দুইজনই বিবাহিত অন্য কারো সাথে। বাচ্চাকাচ্চা আছে, একে অন্যকে চায়, সংসার চায়, সমাজ চায়, বাচ্চাদের চায় আবার এটাও চায়। এত আওয়াজ, তবুও আমার ঘুম পায়। পাশে শুয়ে থাকা লোকটার হাত সরিয়ে পাশ ফিরে শুই।

নগ্নিকা

যখন সকালে ঘুম ভাঙে, তখন আমি একা। কেনারাম চলে গেছে দাম দিয়ে। তাই আমি গোসল সারি, নাশতা খাই, বাইরের রোদের দিকে তাকাই। আমার পেশাটা কিছুটা অলস মানুষের জন্য বোধহয়। মাসে কয়েকদিন রাত কাটালেই চলে যায় গোটা মাস। বয়স থাকলে এই পেশায় আয় আছে। বয়স চলে গেলে ভুগতে হয়। তখন কম পয়সায় বাঁধা থাকতে হয়। কেউ কেউ বাচ্চা নেয়, কেউ ধর্মকর্ম করে, কেউ অন্য মেয়েলোকদের কমিশন খায়।

...কোনো দরকার ছিল না, তবু আমি একটু সাজগোজ করি। দরকার নেই তবুও ভেজা চুলগুলো ছেড়ে রাখি, সালোয়ার কামিজ পরি। কোনোও দরকার নেই তবুও... একটু লিপস্টিক লাগাই... কোনো দরকার নেই তবুও, আয়নায় দেখি নিজেকে... কোনো দরকার নেই তবুও... সুটকেসটা টেনে দরজা দিয়ে বের হয়ে যাই। বাইরে রোদ নেই, তবুও সানগ্লাসটা পরি। গতরাতে যা কামাই করেছি, আর এক সপ্তাহ কোথাও যেতে হবে না। ছুটি কাটাচ্ছি...

হোটেলটা ডানে রেখে আগায় রাস্তার মোড়ে, যেখানে চানাচুরওয়ালাটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একমনে পেঁয়াজ-মরিচ কাটে... আমি সামনে গিয়ে দাঁড়াই, সেজেগুজে ভদ্রলোকের তরুণী গৃহিণী অথবা ভার্সিটিতে পড়া কন্যার মতো... বুড়ো লোকটা মাথা উঠিয়ে দেখে, হাসে... তারপর জিজ্ঞাসা না করে আমার জন্য ঝালমুড়ি বানায়... লোকটা আমার দিকে তাকায় না, যেন সে আমাকে পুরোটা দেখলে আমি লজ্জা পাব তাই। হয়তো ওই বৃদ্ধ চোখে তার সামনে নগ্ন হয়ে দাঁড়াই... জানি সে জানে না, আমি কী করি। কারণ আমিও জানি না। কিন্তু তবু যাই নগ্ন হই... তার লজ্জাটা নিজের ভেতরে ধারণ করি। সে কে, আর আমি কে দুজনাই জানি।

রাতে আমি টাকা নিয়ে কাপড় খুলি, উলঙ্গ হই, নগ্ন হই না। লোকটার সামনে অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকি, আর মানুষের সামনে কাপড় খুলতে কোনো দ্বিধা হয় না। প্রতিবারের মতো ঝালমুড়ির জন্য ৫০০ টাকা দিই লোকটাকে। সবগুলো নোট সে উঠিয়ে রাখে একটা টিনে, কোনো সময় খরচ করে না। কেন একটু বর্ণচোরা হয়ে আমি আসি তার কাছে... কেন নগ্নিকা হতে চাই তার সামনে জানি না। কেন তার সামনে নগ্নিকার কোনো লজ্জা হয় না।