বাবান ও একটি চড়ুইছানা

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০২০, ২০:৪২

বুলেট গিয়েছিল বাগানের দিকে। সেখান থেকে একছুটে বারান্দায় এল। ডগ হাউসের সামনে  চুপচাপ বসে আছে বন্দুক। মেঝেতে শুয়ে ঘুমাচ্ছে কিটি। ছুটে আসার ফলে হাঁপাচ্ছে বুলেট।

বন্দুক ঘেউ করে বলল, হাঁপাচ্ছ কেন?

বুলেট ঘেউ ঘেউ করে বলল, একটা চড়ুইছানা বাসা থেকে পড়ে গেছে।

সর্বনাশ! ব্যথা পায়নি?

ঘাসের ওপর পড়েছে। বেশি ব্যথা পায়নি। মা চড়ুই খুব কাঁদছে।

বুলেট বন্দুকের কথা শুনে ঘুম ভেঙেছে কিটির। চড়ুইছানার কথা শুনে সেও চিন্তিত। কী করা যায় এখন?

কাকুয়া ছিল তার দলের নয়টা কাক বন্ধুর সঙ্গে। পাশের বাড়ির আমগাছে বসে গল্প করছিল। তখনই উড়ে এল। বারান্দার কাছে এসে নামল। চড়ুইছানার ঘটনা শুনল। শুনে কিটিকে বলল, এখনই বাবানকে জানাও। বাবান নিশ্চয় কোনো ব্যবস্থা করবে। আমি গিয়ে ছানাটাকে পাহারা দিই।

বুলেট বলল, পাহারা দিতে হবে কেন?

কোনো কোনো পাজি কাক চড়ুইছানা ধরে নিয়ে যায়। আর সেই দাঁড়কাকটাকেও আজ সকালে একবার দেখেছি। ওটা যদি জানতে পারে, তাহলে ছোঁ মেরে ছানাটাকে নিয়ে যাবে।

বন্দুক বলল, তাহলে তুমি তাড়াতাড়ি যাও। ছানাটিকে পাহারা দাও।

কিটি বলল, আমি যাচ্ছি বাবানকে খবর দিতে।

বাবান ছিল মা-বাবার রুমে। মা-বাবা গল্প করছেন আর চা খাচ্ছেন। বাবানের হাতে রিমোট। রিমোট টিপে সে একটা হলুদ রংয়ের খেলনা গাড়ি চালাচ্ছে।

কিটি এসে মিউ মিউ করে ডাকল। বাবান, বাবান।

বাবান বলল, কী হয়েছে?

বাসা থেকে চড়ুইছানা পড়ে গেছে।

কী? চড়ুইছানা পড়ে গেছে? আহা, নিশ্চয় খুব ব্যথা পেয়েছে।

তুমি তাড়াতাড়ি চল।

বাবান রিমোট রেখে ছুটে বেরুল।

মা চায়ে চুমুক দিয়ে বাবাকে বললেন, আমাদের ছেলেটা খুবই অন্যরকম হয়েছে।

তা-ই তো দেখছি। পশু-পাখির ভাষা বোঝে। তাদের জন্য অনেক মায়া। আমার মনে হয় একসময় সে গাছপালার ভাষাও বুঝবে। আকাশের ভাষা বুঝবে। নদী-সমুদ্রের ভাষা বুঝবে। পাহাড়ের ভাষা বুঝবে। ফুলের ভাষা, হাওয়ার ভাষা বুঝবে। সে একেবারেই অন্যরকম শিশু।

পোকা-মাকড়ের ভাষা বুঝবে না?

তা-ও বুঝবে।

চল তো দেখি চড়ুইছানার জন্য কী করছে সে?

চল।

মা-বাবা বারান্দার রেলিংয়ে এসে দাঁড়ালেন।

বাগানে তখন বাবানের পাশে বুলেট, বন্দুক আর কিটি। কাঠগোলাপের ডালে বসে আছে টুনু আর টুনি। কদমডালে কাকুয়া। মা চড়ুইয়ের সঙ্গে বাবা চড়ুইও আছে। দুজনেই তারা ছটফট করে কাঁদছে।

বাবানদের বাড়িটা একটু পুরনো ধরনের। দোতলার রেলিংয়ের নিচের দিকে মনের মতো জায়গা পেয়ে বাসা বেঁধেছিল চড়ুইপাখি। দুটো ছানা হয়েছে। বাবানের সঙ্গে চড়ুইপাখি আর ছানা দুটোর ভাব হয়নি। সে ব্যস্ত ছিল বুলেট বন্দুককে নিয়ে। আজ একটা চড়ুইছানা বাসা থেকে পড়ে গেছে দেখে তার খুব মন খারাপ।

বাগানের ঘাসে চুপচাপ বসে আছে চড়ুইছানা। বাবান জিজ্ঞেস করল, কী করে পড়লে?

চড়ুইছানা চিঁ চিঁ করে বলল, খিদে পেয়েছিল। মা-বাবা খাবার নিয়ে ফিরছে না। ভিতর থেকে বাইরের দিকে ঠোঁট বাড়িয়েছিলাম। দেখতে চাইছিলাম মা-বাবা ফিরলেন কি না। আমার বোন ছিল পিছনে। কেমন কেমন করে যেন পড়ে গেলাম।

ব্যথা পেয়েছ?

না। একটুও ব্যথা পাইনি। নরম ঘাসের ওপর পড়েছি।

ছানাটা তারপর কাঁদতে লাগল। বাবান, ওই দেখ আমার মা-বাবা কাঁদছেন। বাসার ভিতর কাঁদছে আমার বোন। আমাকে তুমি বাসায় তুলে দাও।

চড়ুইছানার কান্না দেখে বাবানের চোখেও পানি এসেছে। বুলেট বন্দুকের কাঁদো কাঁদো মুখ। কিটিরও একই অবস্থা। টুনু আর টুনি চোখ মুচছে। কাকুয়া মাথা নিচু করে আছে। তারও কান্না পাচ্ছে।

বাবান বলল, তুমি চিন্তা কোরো না। আমি তোমাকে বাসায় তোলার ব্যবস্থা করছি।

বাবান বিজুকে ডাকল। বিজু, তাড়াতাড়ি এসো।

বিজু ছুটে এল।

মই নিয়ে এসো।

বিজু ছুটে গিয়ে স্টিলের বড়ো মইটা নিয়ে এল। এই মই দিয়ে সে বাড়ির ফ্যানগুলো মোছে। খুবই চটপটে ছেলে। বাবানদের বাড়িতে ছোটবেলা থেকে আছে। বাড়ির কাজের ফাঁকে ফাঁকে স্কুলে পড়ে। এবার ক্লাস এইটে উঠেছে।

বাবান বলল, চড়ুইছানা বাসায় তুলে দাও।

এক্ষুনি দিচ্ছি।

এক হাতের তালুতে হালকা করে চড়ুইছানাটা তুলল বিজু। তারপর সাবধানে মই বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল। বাগানে দাঁড়িয়ে বাবান তাকিয়ে আছে ওপরের দিকে। বুলেট, বন্দুক, কিটি তাকিয়ে আছে। কদমডালে বসে কাকুয়া তাকিয়ে আছে। কাঠগোলাপের ডালে বসে টুনু আর টুনি তাকিয়ে আছে। রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে মা-বাবা দেখছেন এই দৃশ্য।

মা চড়ুই বাবা চড়ুই এখন আর কাঁদছে না। এদিক ওদিক ওড়াউড়ি করছে। কিচির মিচির করে কথা বলছে। বাবান তাদের কথা বুঝতে পারছে।

মা চড়ুই বলছে, বাবান বড়ো ভালো ছেলে। আমার ছানাটাকে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করল।

বাবা চড়ুই বলল, ঠিক বলেছ। এমন ছেলে আর দেখিনি। পশুপাখির জন্য কত মায়া। কুকুর, বিড়াল, কাক, টুনটুনি কত বন্ধু বাবানের। ওরা সবাই খুব ভালো। বুলেট গিয়ে খবর না দিলে বন্দুক আর কিটি জানতে পারত না আমাদের ছানাটার কথা। কিটি গিয়ে বাবানকে খবরও দিত না। কী হতো তাহলে ছানাটার?

ঠিকই বলেছ।

বিজু ততক্ষণে চড়ুইপাখির বাসার কাছে চলে এসেছে। আস্তে করে চড়ুইছানাটাকে বাসার মুখে নামিয়ে দিল। ছানা সঙ্গে সঙ্গে ভিতরে চলে গেল। কারণ তার বোন কাঁদছিল। বোনকে সান্ত্বনা দিল সে। আর কাঁদিস না বোন। এই তো আমি এসে গেছি। বোন কান্না থামাল। ভাইয়ের গা ঘেঁষে বসে হাসতে লাগল।

বিজু নেমে আসার পর মা চড়ুই বাবা চড়ুই বাসায় এল। ছানাদের আদর করল। পেট পুরে খাওয়াল। বাগানে দলবল নিয়ে তখনো দাঁড়িয়ে আছে বাবান।

ছানাদের খাওয়ানো শেষ করে মা চড়ুই বলল, আমাদের একটা ভুল হয়ে গেছে।

বাবা চড়ুই বলল, কী ভুল?

বাবান আমাদের ছানা ফিরিয়ে দিল আর তাকে আমরা একটা ধন্যবাদও দিলাম না?

ঠিক বলেছ। চল, ধন্যবাদ দিয়ে আসি।

সঙ্গে সঙ্গে ছানা দুটো বলল, আগে আমরা ধন্যবাদ দিই।

বাসা থেকে মুখ বাড়িয়ে ছেলে ছানা বলল, বাবান, তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। তুমি আমাকে মা-বাবা আর বোনের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছ।

বাবান খুব খুশি হলো।

এবার মা চড়ুই বাবা চড়ুইও ধন্যবাদ দিল। শুধু বাবানকে নয়, বিজুকেও ধন্যবাদ দিল, বুলেট, বন্দুক, কিটি, কাকুয়া, টুনু আর টুনি সবাইকে ধন্যবাদ দিল।

মা চড়ুই বলল, টুনু টুনি তোমার যেমন বন্ধু হয়েছে, আমার ছেলেমেয়েও তোমার তেমন বন্ধু হবে। ওদের নাম রেখে দাও, বাবান।

বাবান সঙ্গে সঙ্গে চড়ুইপাখির দুই ছানার নাম রাখল হাসি খুশি।

দেখতে দেখতে বড়ো হলো হাসি খুশি। টুনু আর টুনির মতো তারাও হয়ে গেল বাবানের বন্ধু।