বাংলাদেশে প্রায় অর্ধশত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অস্তিত্ব দেখা যায়। এদের মধ্যে মধুপুর বনাঞ্চলের গারোরা অন্যতম। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী এদের সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। গারোরা মান্দি নামেও পরিচিত। মান্দি অর্থ পাহাড়ি। এরা মূলত মোঙ্গলীয় জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্গত। আদিনিবাস ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো পাহাড়ে। সম্ভবত সুলতানি আমলে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে গারোদের একটি ক্ষুদ্র অংশ ব্রহ্মপুত্র নদ পার হয়ে বাংলাদেশের মধুপুর বনাঞ্চলে প্রবেশ করেন। পরে এখানেই তারা স্থায়ী হন। গারোদের ভাষার নাম আচিক। তবে লেখ্য রূপ নেই। মধুপুর বনাঞ্চলের গারোদের ৯৮ ভাগই খ্রিষ্টান। এরা আচার-আচরণ ও চলনবলনে সহজ সরল। ঐতিহ্যগতভাবে কলহবিবাদকে পাশ কাটিয়ে চলেন। মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীরা সম্পত্তির মালিক। অরণ্যানি সংস্কৃতির আবহে বেড়ে ওঠা গারো সমাজে ব্যতিক্রমধর্মী দু’-এক জন সাহসী নারীর সন্ধান পাওয়া যায়, যারা সব প্রতিকূলতা ঠেলে এগিয়ে গেছেন সামনের দিকে। এদেরই এক জন প্রতিভা সাংমা। চিরকুমারী পাহাড়ি কন্যা। নিজ সম্প্রদায়ের অবহেলিত মানুষের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও চাওয়া-পাওয়া বিসর্জন দিয়েছেন। এই নারীকে ঘিরেই আমাদের আজকের কথকতা।
লালমাটির পাহাড়ি টিলা, নিচুু বাইদ আর সারি সারি কাঁঠাল ও আনারসবাগান নিয়ে গড়া ইদিলপুর গ্রাম। এটি টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার আউসনারা ইউনিয়নের গারো অধ্যুষিত জনপদ। ইদিলপুর বাজারে নেমে লাল মাটির রাস্তা ধরে একটু এগোলেই গারোপাড়া। খ্রিষ্টান চার্চ, খ্রিষ্ট অরফানেজ পল্লী এবং স্কুল পাড়ি দিলেই হাতের ডানের কাঁচা সড়ক মিশেছে গাছগাছালিতে ছাওয়া এক নির্জন বাড়িতে। মাটির দেওয়ালে ছনে ছাওয়া দুটি ঘর। পরিচ্ছন্ন বাড়ির সামনে পেছনে পাঁচ-ছয়টি লিচুগাছ। উত্তর ও পূর্বাংশ জুড়ে আনারসবাগান ও বাঁশঝাড়। ফল ও ফুলে সাজানো বাড়ির চকচকে আঙিনা দেখলেই দুদণ্ড বসতে ইচ্ছে করে। এ বাড়ির যিনি কর্ত্রী তার নাম প্রতিভা সাংমা। বয়স ৮৮ বছর। পাড়ার লোকজন ডাকে দিদি বলে।
প্রতিভা সাংমার জন্ম ১৯৩২ সালের ডিসেম্বরে। বাবা মৃত সনাতন মৃ। মা মৃত বঙ্গবালা চাম্বুগং। চার ভাইবোনের মধ্যে প্রতিভা তৃতীয়। কৈশোরস্মৃতি হাতড়ে গিয়ে তিনি জানান, ‘ঘন গজারি বন ছিল গ্রাম জুড়ে। তাতে থাকত চিতা বাঘ, বন্যশূকর, বন্যমহিষ, ময়ূর, বনমুরগি, বানর-হনুমানসহ নানা প্রজাতির পশুপাখি। সন্ধ্যা হলেই বাঘের গর্জনে পাহাড়ি টিলা কেঁপে উঠত। ভয়ে কেউ বাইরে যেত না। মা বঙ্গবালা ছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয় পেরোনো নারী, আদি সংস্কৃতির একনিষ্ঠ সমঝদার। তখন এলাকায় এমনকি মধুপুর উপজেলা সদরেও কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। মা জঙ্গল ঘেরা গ্রামের আর দশটি মেয়ের মতো তাকে অশিক্ষিত রাখতে চাননি। অনটন সত্ত্বেও পড়াশোনার জন্য তাকে ময়মনসিংহ শহরের বিদ্যাময়ী গার্লস হাইস্কুলে ভর্তি করে দেন। টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার ইদিলপুর গ্রাম থেকে ময়মনসিংহ জেলা শহরের দূরত্ব ৫০ কিলোমিটার। মহিষের গাড়িতে ও হেঁটে মধুপুর জঙ্গল পাড়ি দিয়ে মায়ের সঙ্গে ময়মনসিংহ শহরে যেতে হতো। মধুপুর থেকে রসুলপুর পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার ছিল গভীর জঙ্গলে আবৃত। বাঘের ভয়ে এ পথ পাড়ি জমাতে গা ছমছম করত। ১৯৩৮ সালে তাকে বিদ্যাময়ী স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করানো হয়। শিশু হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করতেন। ১৯৪৯ সালে প্রতিভা এ স্কুল থেকেই ম্যাট্রিকুলেশন করেন। আনন্দমোহন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট শেষ করেন তিনি। উচ্চশিক্ষা গ্রহণের ইচ্ছা থাকলেও আত্মীয়স্বজনের অনুরোধে ১৯৫২ সালে ময়মনসিংহ শহরের হলিফ্যামিলি হাইস্কুলে শিক্ষিকা হিসাবে যোগ দেন। ময়মনসিংহে লেখাপড়ার সময় ছুটিতে বাড়ি এসে গারো সম্প্রদায়ের অশিক্ষা ও বঞ্চনা দেখে তিনি কষ্ট পান। তখন থেকেই অবচেতন মনে শিক্ষকতা করার আগ্রহ জন্মে। এ সময়ে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার সেন্টমেরি মিশনারি হাইস্কুলে শিক্ষকতা করার ডাক পড়ে। নিজ সম্প্রদায়ের শিক্ষার দুরবস্থার কথা চিন্তা করে ১৯৭০ সালে তিনি হালুয়াঘাটের সেন্টমেরি মিশনারি হাইস্কুলের চাকরি ছেড়ে নিজ গ্রামে চলে আসেন। ভুটিয়া প্রাইমারি স্কুলে তিনি নামমাত্র বেতনে শিক্ষকতা শুরু করেন। এছাড়াও আশপাশের দুটি মিশন স্কুলে অতিথি শিক্ষক হিসাবে বিনা বেতনে ক্লাস নিতেন। গারোদের মধ্যে তাঁর শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন পরবর্তীকালে সফল হয়। মধুপুর বনাঞ্চলে শতাধিক মিশনারি প্রাইমারি ও তিনটি উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে এখন শত শত গারো শিশু পড়ালেখা করে। একাত্তরে তিনি পাকিস্তানি হানাদারদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মিশনে মুক্তিযোদ্ধাদের গোপনে চিকিত্সা দিতেন। ১৯৭২ সালে মধুপুর গার্লস হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা হলে তিনি সেখানে যোগ দেন। গারো সমাজে নারীরা সম্পত্তির মালিক হলেও শিক্ষা ছাড়া যে নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়, সেটি তিনি জীবনের বাধাবিপত্তি ও সংগ্রাম থেকে বুঝতে পেরেছিলেন। সেই শিক্ষার মশাল হাতে এখনো তিনি পরোক্ষভাবে গারোদের ভেতর থেকে দূর করে চলেছেন অশিক্ষার অন্ধকার।
n লেখক : কলেজ শিক্ষক ও সংবাদকর্মী
