সইত্যপ্রবাহ

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৯:৫১

/ রাফিদুল রাফি

 

পৌষ মাসের তীব্র শীত চলছে তখন। একটা তুমুল শৈত্যপ্রবাহ সবেমাত্র শেষ হয়েছে। ভয়ানক ঠান্ডা আর ঘন কুয়াশায় জবুথবু পুরো দেশ। এমতাবস্থায় দেশের বেশিরভাগ উষ্ণতাপ্রিয় লোকেরাই প্রতিদিন গোসল করেন না। কেউ কেউ একদিন অন্তর অন্তর, কেউ কেউ দুদিন পরপর এবং এমন অনেকেই হয়তো আছেন, যারা সপ্তাহখানিক তো বটেই, তারও ঢের বেশি দিন পর গোসল করেন। তবে সবার সব রেকর্ড হয়তো ভেঙে দিয়েছেন সাজেদ সাহেব। তিনি অগ্রহায়ণ মাসের মাঝামাঝি থেকেই গোসল করা বাদ দিয়েছেন। আজ অবধিও গোসলের ধারেকাছেও যাচ্ছেন না। টয়লেটের ছোট-বড়ো কাজগুলোও তিনি টিস্যু দিয়ে সারছেন ইদানীং। পানিও পান করছেন যতটা কম পারা যায়, ঠিক ততটা।

কোনো রকমে স্যুটকোট গায়ে দিয়ে জড়সড় হয়ে একরকম কাঁপতে কাঁপতে প্রতিদিন সকালে অফিস করতে যান তিনি। বাসা থেকে বের হওয়ার আগে স্যুটে একরকম পারফিউম, কোটে একরকম, মোজায় আরেক রকম লাগিয়ে তারপর ফ্লাস্ক থেকে কাঁপা কাঁপা হাতে অতি অল্প পরিমাণ গরম পানি নিয়ে মাথার চুলে লাগান। ব্যস্ অফিসে যেয়ে নিজের মাথার অল্প ভেজা চুল দেখিয়ে গর্বের সঙ্গে পাশের ডেস্কের সদ্য জয়েন করা জুনিয়র অফিসার ছেলেটাকে ডেকে বলেন, ‘বুঝলে রবিন, রোজ রোজ ঠান্ডা পানিতে গোসল করলে শরীর-মন দুটোই ফুরফুরে থাকে। তোমাদের তো এই শীতে জলাতঙ্ক হয়েছে। আই মিন টু সে, পানির প্রতি বিরাট ভয়। ঠান্ডা পানি দূরে থাক, গরম পানি দিয়েই তো গোসল করো না। তা ভাই তুমি গোসল-টোসল করো তো রোজ? হাঃ হাঃ হাঃ! আমাকে দেখে ইনস্পিরেশন নাও!’

শুধু রবিনই নয়, অফিসের আরো বহু সিনিয়র-জুনিয়র এমনকি বসকেও রোজ রোজ গোসলের মিথ্যা গল্প বানিয়ে শোনান তিনি। সবাই অবাক হন। লোকটা বলে কী! এই শীতে গরম পানি ছুঁলেও তো সারা গা কেঁপে ওঠে, উনি ঠান্ডা পানি দিয়ে কীভাবে! অফিসের বস ঠিক করে ফেললেন সাজেদ সাহেবকে তার এই ডেইলি গোসলের অসীম সাহসিকতার জন্য এবারের সাপ্তাহিক মিটিংয়ে একটা সাহসিকতা সনদ দেবেন।

সেদিন সাজেদ সাহেব অফিস শেষ করে একদম সোজা বাসায় ঢুকে গেলেন। তিনি একা মানুষ। বয়সটা চল্লিশ ছুঁই-ছুঁই করলেও আজ নাগাদ বিয়েটা পর্যন্ত করেননি। বাসায় একাই থাকেন। আজ ঘরে ফিরেই তিনি গরম পানি করে সেটায় একটা গামছা ভিজিয়ে নিয়ে নিজের শরীরটা আলতো করে মুছলেন। মনে মনে হিসেব করলেন, গোসল করেন না আজ ২৮ দিন হলো।

তিনি তাড়াতাড়ি ভারী কয়েকটা পোশাক গায়ে জড়িয়ে নিলেন। তারপর কাঁপতে কাঁপতে ঢুকে গেলেন কম্বলের নিচে। সন্ধ্যা করে ঘুমিয়েছিলেন। ইচ্ছে ছিল একদম পরদিন সকালে ওঠার। কিন্তু মাঝরাতে হঠাত্ তার ঘুম ভাঙল। তিনি খেয়াল করলেন, তার সারা শরীর ঘেমেনেয়ে একাকার। দ্রুত গা থেকে ভারী কাপড়চোপড় ছাড়িয়ে ফেললেন। তারপর ঘরের সিলিং ফ্যানের সুইচটা অন করে দিলেন। ঘাম শুকাতে শুরু করেছে। কিন্তু আচমকাই তীব্র গা চুলকানো শুরু হয়েছে তার। তিনি দু হাতের দশ আঙুল দিয়ে তার সারা শরীর চুলকাতে লাগলেন। কাজ হচ্ছে না। তার নখের আঁচড়ে শরীরের কয়েক জায়গার চামড়া ছিলে গেল। তিনি প্রাণপণে এবার মাথায়ও চুলকাতে লাগলেন। না চুলকানি কমছে না। সারারাত এভাবে চুলকালেন। সকাল হওয়ার একটু আগে তার চুলকানি থামল। সারা শরীরে খামচির দাগ, গালে-মুখে ক্ষত। গায়ের ক্ষত তো দেখা যাবে না, তবে এই ক্ষতমুখ নিয়ে অফিসে যাওয়া যাবে না। অফিসে যাওয়ার আগে ভালো করে মুখে একটা ভারী মেকআপ করে নিতে হবে। ব্যস্, বাসার কাছের একটা জেন্টস পার্লারে যেয়ে মেকআপ করে চললেন অফিসে।

পরদিনও একইভাবে অফিস করলেন। আর চুলকানি নেই। যতই চুলকানি হোক, তিনি গোসল করবেন না। মুখ ও শরীরের ক্ষতগুলোও সেরে যাচ্ছে দ্রুতই। বেশ কয়েকদিন গেল এভাবে। আর একবারও চুলকানি হলো না।

অফিসের বস সাজেদ সাহেবকে একদিন ডেকে বললেন, ‘কাল আপনাকে আপনার অসীম সাহসিকতার জন্য সনদ দেওয়া হবে। স্পিচ রেডি করে আনবেন কিন্তু।’

সেদিন অফিস থেকে ফিরেই সাজেদ সাহেব স্পিচ রেডি করলেন। সারারাত চাপা উত্তজনায় তার ঘুম হলো না। মিথ্যামিথ্যি করে, কারচুপি করে হলেও তো তিনি একটা সনদ পাচ্ছেন। বস তার ওপর বেজায় খুশি। এবার তার প্রমোশন আর আটকায় কে!

পরদিন বাসে করে অফিসে আসার সময় তিনি পত্রিকায় পড়লেন আজ থেকে আরো একটা শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়েছে। সামনের কয়েকদিন সারাদেশেই তীব্র শীত থাকবে। সাজেদ সাহেব অফিসে পৌঁছালেন। যথারীতি তার বস মিটিং ডাকলেন। মিটিংয়ের এক পর্যায়ে সাজেদ সাহেবের হাতে ‘সাহসিকতা সনদ’ তুলে দিলেন তার বস। এবার তার স্পিচ দেওয়ার পালা।

সাজেদ সাহেব মাইক্রোফোনটা হাতে নিলেন। স্পিচ শুরুও করলেন। কিন্তু হঠাত্ তার ঐ রাতের মতো করে তীব্র চুলকানি শুরু হয়েছে। তিনি গা চুলকাতে চুলকাতে একেবারে পাগল হয়ে যাচ্ছেন যেন। বসসহ অফিসের সবাই তার এমন পাগলের মতো গা চুলকানো দেখে রীতিমতো অবাক। মুখে প্রবলভাবে চুলকানোর ফলে মেকআপ সরে গিয়ে তার মুখের কয়েকটা ক্ষত স্পষ্ট হয়ে পড়ল।

সাজেদ সাহেব চুলকাচ্ছেন দু হাতে। মাইক্রোফোনটা তিনি ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছেন। এবার চিত্কার করে করে তিনি বলছেন, ‘গোসল করি না আজ এক মাস চার দিন, না না এক মাস পাঁচ দিন। চুলকানি হোক, দেখি কত হতে পারে। গোসল আমি করব না। গরম না পড়া পর্যন্ত করব না। তাতে কার কী? চুলকানি থামে না কেন? বস্, চুলকে দেন একটু, প্লিজ বস্। এই রবিন, চুলকে দাও বলছি।’

শৈত্যপ্রবাহ সারাদেশে তখন একটা চলমান ছিল, তবে সাজেদ সাহেবের মুখে আচমকাই তীব্র এক ‘সইত্যপ্রবাহ’ শুরু হয়ে যায়। যার কারণে তিনি একের পর এক পটর পটর করে সব সত্য বলে দেন।

ঐ দিনের পর আরেকটা মিটিং ডেকে সাজেদ সাহেবকে অফিসের সবচেয়ে কুড়ে ব্যক্তির ‘ভীরুতা সনদ’ তুলে দেন তার বস। পুরো অফিস এখন তাকে ‘কুড়ে সাহেব’ বলেই   ডাকে!   g

সানকিপাড়া, ময়মনসিংহ