শখের আংটি

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৯:৫৩

/ আইয়ুব আহমেদ দুলাল

ছেলেবেলায় সোনার আংটি পরার খুব শখ ছিল, কিন্তু কখনো মুখ ফুটে প্রকাশ করতে পারিনি। মা বলতেন, ‘ছেলেরা স্বর্ণ ব্যবহার করলে গুনাহ হয়।’ তবুও কেউ কেউ ব্যবহার করে, করুক। সূক্ষ্ম প্রতিবাদ করলেও কাজ হয় না। গুনাহ তো গুনাহই। তাই মনের গোপনে আফসোসটা রয়েই গেল। যখনই কারো হাতে আংটি দেখি, চোরাচোখে তাকাই। বিশেষ করে আমার বড়ো মামা, হাতের অনামিকায় নকশাখচিত গোলাকার একটা সোনার আংটি পরতেন। দেখে কী যে ভালো লাগত! মামার হাতের আঙুলগুলো খুব সুন্দর, ফর্সা ও সুগঠিত। আংটি বেশ মানাত।

যুগের হাওয়া, মাঝে যুবক ছেলেদের সোনার চেইন পরার একটা হিড়িক পড়েছিল। প্রায় প্রত্যেকের গলায় সোনার বা সোনালি রঙের চেইন দেখা যেত। বাজারেও সোনালি রঙের ওডিনারি চেইন হরদম বিক্রি হতো। আমারও শখ হয়েছিল, কিন্তু সামর্থ্য ছিল না। বাজারি চেইন কিনে পড়েছিলাম দু-একবার, কিন্তু দুদিনের বেশি স্টাইল করা যেত না, রং বিবর্ণ হয়ে ইজ্জতের ওপর আক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা হয়ে দাঁড়াত। বাবা বিদেশ থেকে এলেন, ভাবলাম কিছু তো এনেছেন। আর কারো জন্য না হোক, অন্তত মা কিংবা দুই বোনের জন্য তো সোনার চেইন নিশ্চয়ই এনেছেন, স্বল্প সময়ের জন্য হলেও স্টাইল করা যাবে। সেই ভাবনা থেকে বাবাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। বাবা একটা ধমক দিলেন, ‘ধ্যাত্, সোনার চেইন দিয়ে কী করবি?’ বাজখাই গলার ধমকে চেইন পরার শখ একদম মিটে গেল। কষ্ট পেয়ে মনে মনে বললাম, ‘এমনিই জানতে চাইলাম, বিয়া করার জন্য না।’ শুনিয়ে বলতে পারলে হয়তো স্বস্তি পেতাম। পরে দেখলাম বাবা কিছুই আনেনি।

তার কিছুদিন পর দেখলাম, মামার বাসায় ড্রেসিং টেবিলে মামার হাতের গোলাকার সেই আংটিটা রাখা আছে। মামা হয়তো গোসল শেষে পরতে ভুলে গেছেন। আমি ওটা হাতে নিয়ে বিভিন্ন আঙুলে পরার চেষ্টা করলাম। একমাত্র বৃদ্ধাঙুল ছাড়া অন্য কোনো আঙুলে ফিট হয়নি। ওভাবেই ধরে নিয়ে মামিকে দেখিয়ে বললাম, ‘মামি, মামার আংটিটা নিলাম। বন্ধুর বাসায় যাব তো, একটু পোজ মেরে আসি।’ মামি মৃদু হেসে অনুমতি দিলেন। বৃদ্ধাঙুলে আংটি কেউ পরে, ঐ বয়সে আমার জানা ছিল না, দেখিনি কখনো। তবুও সোনার আংটি বলে কথা, বৃদ্ধাঙুলই সই। চলুক, সবাই ভাববে নতুন স্টাইল। নিশ্চিন্তে আংটি গলিয়ে বের হলাম। বন্ধুর বাসা একটু দূরে, বাসে যেতে হয়। ঐ অবস্থায় বাসে উঠে আমার সে কী ভাব! সিট খালি নেই, তিন-চারজন যাত্রীর সঙ্গে আমিও দণ্ডায়মান। বৃদ্ধাঙুলটা ওপরে বিশেষ কায়দায় রেখে, যাতে দেখা যায়, রড ধরে দাঁড়িয়ে আছি। কখনো কখনো আংটিকে প্রাধান্য দিয়ে, অন্যদের দেখিয়ে গাল চুলকাই, তর্জনী দিয়ে কপাল থেকে চুল সরাই, বসা যাত্রীর সামনের সিটের ওপরের রডে হাত রাখি; আরো কত ঢং।

তার বেশ কিছুদিন পর জানতে পারলাম, হাতের কোন আঙুলে আংটি পরার কী অর্থ। এটারও যে আবার অর্থ থাকে, সেটাই তো জানতাম না। তখন দেখলাম, বৃদ্ধাঙুলে আংটি পরার অর্থ হলো, বিশাল অর্থ-প্রাচুর্য ও আভিজাত্যের প্রতীক। বাপরে, কয় কী! অথচ তখন আমাদের আভিজাত্য দূরের কথা, বাড়ি ঘরই ছিল না, থাকতাম নানার বাড়ি। তার মানে, আংটি পরে ক্ষণিকের জন্য আমি হলাম অর্থ-প্রাচুর্যের মালিক, অর্থাত্ ধনপতি। লও ঠেলা।

এই রকম একটা আংটিই একবার আমার সঙ্গে চরম বেঈমানি করেছে। প্রতিবেশী এক মেয়ের আংটি আমানত হিসেবে নিরাপদে রাখতে গিয়ে সরল মনে হাতের আঙুলে পরে মহাবিপদে পড়েছিলাম। ভাগ্যক্রমে নারীঘটিত কেলেঙ্কারির মতো জঘন্য অপবাদ থেকে রাব্বুল আলামিন রক্ষা করেছেন। সেই থেকে চিরতরে আমার আংটি পরার শখ একদম মিটে গেল।