উত্সব

প্রাণের মেলার আনন্দগান

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:৪৪

 

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সবাই একুশের বইমেলাকে বলে থাকেন ‘প্রাণের মেলা’। সঙ্গত এই বিশেষণ, কারণ প্রাণে প্রাণে এমন যোগ পৃথিবীর খুব কম মেলাতেই সুলভ। এই মেলা ক্রমশ নিজেকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, ব্যাপ্ত হচ্ছে প্রত্যাশার দিগন্ত অনুপাতে; পুরোটা না হলেও কিছুটা তো বটে। বইমেলা কোনো অনড় জায়গায় আটকে নেই—প্রাণের ধর্মও তো তাই; সততপ্রবাহিনী। এক সময় ভাবা যায়নি যে, বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের বাইরে মেলাটি বিস্তৃত হবে। আর আজ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিশাল প্রান্তরে গিয়েও প্রতি বছর মেলা তার পরিসর বিস্তৃত করতে চাইছে। তবে আয়তনের বিস্তৃতির চেয়ে বেশি জরুরি গুণগত ঋদ্ধি।

জন্মশতবর্ষে বঙ্গবন্ধুকে উত্সর্গ করে শুরু হলো ছত্রিশতম অমর একুশে বইমেলা। এই প্রতিপাদ্যকে ধারণ করে পুরো মেলাঙ্গনকে সাজানো হয়েছিল। গত বছর থেকেই স্বাধীনতা স্তম্ভের সঙ্গে বইমেলা-মাঠের কোনো সীমানা প্রাচীর খাড়া করা হয়নি; ফলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিদ্যমান নিসর্গ ও স্থাপত্যকাঠামোর সঙ্গে মেলায় আগত মানুষের মর্মের যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এবার উদ্যানের বিস্তৃত পরিসরে বিপুল সংখ্যক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে স্থান করে দেওয়া হয়েছে, স্থানগত আকৃতিতে এবারের মেলাকে বিশাল বললে অত্যুক্তি করা হয় না।

বইমেলার হাজার হাজার নতুন বইয়ের প্রকাশ-তত্পরতা নিশ্চয় প্রমাণ করে ‘মুদ্রিত বইয়ের ভবিষ্যত্ অন্ধকার’ এ কথাটা অন্তত বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বলা যাবে না। তবে সংখ্যাই যে সমৃদ্ধির সূচক নয়— সেটাও আমরা মানি। তাই যেনতেন প্রকারে সম্পাদনাবিহীন একটি বই প্রকাশ এবং তার মৌসুমি প্রচারে লিপ্ত হওয়াটা আশঙ্কার বিষয় বৈকি। মেলায় মানুষ যে কেবল নতুন বই-ই খোঁজে তা নয়, ধ্রুপদী জ্ঞানবিশ্বের প্রতি আগ্রহও দেখেছি অপার। নয় তো, প্রতি বছর বাংলা একাডেমির প্রতিটি বিক্রয়কেন্দ্রে পুরোনো বইয়ের সন্ধানে ক্রেতাপাঠকের সর্বোচ্চ ভিড় ও বিক্রয় লক্ষ করা যেত না। একাডেমি গল্প, কবিতা, উপন্যাস বা সায়েন্স ফিকশনের বই সেভাবে প্রকাশ করে না; গত ছয় দশকে একাডেমি প্রকাশিত গবেষণা, অনুবাদ, রচনাবলি, জীবনী ইত্যাদি বইয়ের যে সুনির্বাচিত প্রকাশনা গড়ে তুলেছে তার প্রতি বিপুল আগ্রহ পাঠকের বৈচিত্র্যপিপাসারও প্রমাণবহ।

গত বছর মেলার অন্যতম আকর্ষণবিন্দু ছিল ‘লেখক বলছি’ মঞ্চ। প্রতিদিন এই মঞ্চে পাঁচ জন করে নবীন-প্রবীণ লেখক তাদের নতুন প্রকাশিত বই নিয়ে কথা বলেছেন, আগ্রহী শ্রোতাদের জিজ্ঞাসার উত্তর দিয়েছেন—যা লেখক-পাঠক মৈত্রীবন্ধন সৃজনে হয়েছে সহায়ক। রাইটার্স মিট-এর এমন প্রস্তাব বহু আগে থেকেই করা হচ্ছিল। ২০১৯-এর একুশে মেলায় এর যে শুভসূচনা ঘটেছে তা ২০২০-এ আরো বর্ণিল হবে বলে আশা করা যায়।

বইমেলার সংবেদনশীল চরিত্রটির কথাও উল্লেখ করতে চাই আমরা। শিশু-কিশোরদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা, হুইল চেয়ার সেবার মাধ্যমে শারীরিকভাবে অসুবিধাগ্রস্ত মানুষকে অবাধে মেলায় প্রবেশ এবং  ঘোরাফেরার সুযোগ সৃষ্টির আর শিশুদের জন্য মাতৃদুগ্ধ সেবা প্রদানের বিষয়টিও বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। বইমেলাকে উপলক্ষ্য করে প্রতিবছর যে বিপুল সংখ্যক লেখক-পাঠক প্রবাস থেকে দেশে আসেন তার একটা শুমারিও হতে পারে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ছাপিয়ে বইমেলা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্ববাঙালির অন্তরের অঙ্গনে। মেলা হচ্ছে ঢাকায়। আর উত্সবের ঢাকের বাদ্যি ছড়িয়ে পড়েছে দেশের কোণায় কোণায়, বিশ্বের বাংলাভাষী প্রতিটি অঞ্চলে। এক মাসের এই বই উত্সব আমাদের জীবনকে যুক্ত করুক চিরকালীন বই-আনন্দের ভেলায়।