একাদশ জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের ২৫ নেতার প্রার্থিতা থাকবে কিনা, সে বিষয়ে আজ রবিবার সিদ্ধান্ত দেবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বিকাল সাড়ে ৩টায় আগারগাঁও নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কমিশন সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এদিকে, নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর কোনো প্রার্থী নেই বলে নির্বাচন কমিশনকে লিখিতভাবে জানিয়েছে বিএনপি। দলটির দাবি, উচ্চ আদালত যেসব প্রার্থীদের বিষয়ে কমিশনের সিদ্ধান্ত জানতে চেয়েছে তারা শুধু ধানের শীষের প্রতীকের নন, তারা বিএনপির মনোনীত প্রার্থী। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ জামায়াত প্রার্থীদের প্রার্থিতা বাতিলের দাবি জানিয়েছে। একইসঙ্গে নির্বাচনে আদালতের রায়ে বিএনপির প্রার্থীশূন্য আসনে পুনঃতফসিলের দাবির বিরোধিতা করেছে দলটি। এছাড়াও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর ২৫ নেতার প্রার্থিতা বাতিল চেয়েছে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সন্তানদের সংগঠন প্রজন্ম ’৭১।
নিবন্ধন বাতিল হওয়া জামায়াতে ইসলামীর ২৫ নেতার নির্বাচনে অংশগ্রহণের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে চার ব্যক্তির করা একটি রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি মোহাম্মদ আলীর হাই কোর্ট বেঞ্চ গত মঙ্গলবার রুলসহ আদেশ দেয়। জামায়াত নেতাদের প্রার্থিতা বাতিলের পদক্ষেপ নিতে ওই চার রিটকারী নির্বাচন কমিশনে যে আবেদন করেছিলেন, তা তিন দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে বলা হয় ওই আদেশে।
২০০৮ সালের ১ আগস্ট তরিকত ফেডারেশনের দায়ের করা এক রিট মামলার রায়ে হাইকোর্ট রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করে। নিবন্ধন বাতিল হলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী এ দলের নেতারা এবার তাদের জোটসঙ্গী বিএনপির মনোনয়নে ধানের শীষ প্রতীকে প্রার্থী হয়েছেন। স্বতন্ত্র হিসেবেও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন কয়েকজন। রিটকারীরা বলছেন, জামায়াতের নিবন্ধন নেই, তাই ওই দলের কোনো নেতা নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচন করতে পারছেন না। যেহেতু নিজস্ব প্রতীকে পারছেন না, সেহেতু অন্য কোনো দলের প্রতীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণেরও সুযোগ নেই। তাদের সেই সুযোগ দিয়ে নির্বাচন কমিশন হাইকোর্টের রায় ও গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের বিভিন্ন বিধির সঙ্গে ‘প্রতারণা, প্রবঞ্চনা’ করেছে।
নির্বাচনে জামায়াতের কোনো প্রার্থী নেই :বিএনপি
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর কোনো প্রার্থী নেই বলে নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছে বিএনপি। গতকাল শনিবার বিকালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বরাবর দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাক্ষরিত প্রার্থিতা সংশ্লিষ্ট একটি চিঠি পৌঁছে দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। উচ্চ আদালদের আদেশে সাময়িক স্থগিত হওয়া বিএনপির প্রার্থীদের আসনে নির্বাচন স্থগিত রাখা কিংবা প্রার্থিতা পরিবর্তনের সুযোগ দিতে চিঠিতে দাবি জানায় বিএনপি। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, উচ্চ আদালত যেসব প্রার্থীদের বিষয়ে কমিশনের সিদ্ধান্ত জানতে চেয়েছে তারা শুধু ধানের শীষের প্রতীকের নন, তারা বিএনপির মনোনীত প্রার্থী। বিএনপির দলীয় প্রতীক ধানের শীষে নির্বাচন করছেন এসব প্রার্থীরা। দল হিসেবে বিএনপি তাদের মনোনয়ন দিয়েছে।
বিএনপি থেকে মনোনয়ন পাওয়া জামায়াতের নেতাদের পদবী তাদের দলীয় ওয়েবসাইটে উল্লেখ থাকলে প্রার্থিতায় কোনো অসুবিধা আছে কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে নজরুল ইসলাম খান বলেন, কোন ওয়েবসাইটে কার নাম কীভাবে আছে সেটা বিষয় নয়। বিএনপি আইনের মাধ্যমে এসব ব্যক্তিদের প্রার্থিতা দিতে পারে কিনা সেটা হলো বিষয়। জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় আমরা যাদের মনোনয়ন দিয়েছি, তারা আমাদের দলের প্রতীক ধানের শীষ পেয়েছে। এটা যদি অবৈধ হয় তাহলে নির্বাচন কমিশন আমাদের আগ থেকেই অবহিত করতে পারতো। ধানের শীষ প্রতীক পাওয়া এসব প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দের সময় নির্বাচন কমিশন কেন বাধা দিলো না, এমন প্রশ্নও তোলেন নজরুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সব সময় বলে নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত আমরা মেনে নিবো, বাধা সৃষ্টি করব না। তবে এখন কেন আওয়ামী লীগ ইসির কাজে পদে পদে বাধা সৃষ্টি করছে।
বিএনপির পুনঃতফসিলের দাবির বিরোধিতা আওয়ামী লীগের
নির্বাচনে আদালতের রায়ে বিএনপির প্রার্থীশূন্য আসনে পুনঃতফসিলের দাবির বিরোধিতা করেছে আওয়ামী লীগ। নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আবেদন দিয়ে এ দাবি করে ক্ষমতাসীন দলটি। এ ছাড়া হিন্দুদের ওপর হামলা ছাড়াও দেশের কয়েকটি জেলায় তাদের প্রার্থীদের ওপর হামলার তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে দলটি। আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে শনিবার আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধি দল প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদা বরাবর এ সংক্রান্ত লিখিত আবেদন জমা দেয়।
আওয়ামী লীগের জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সমন্বয়কারী ড. সেলিম মাহমুদ স্বাক্ষরিত আবেদনে বলা হয়, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে কোনো কোনো আসনে বিএনপি প্রার্থীদের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। আমরা জানতে পেরেছি, বিএনপি ওই সব আসনে পুনঃতফসিলের আবেদন করেছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কিত মূল আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) বিধানের আওতায় ওই সব আসনে পুনঃতফসিলের কোনো সুযোগ নেই। সুপ্রিম কোর্টের আদেশেও ওই সব আসনে পুনঃতফসিলের কোনো নির্দেশনা নেই। নির্বাচন কমিশনের কাছে এ ধরনের পুনঃতফসিলের জন্য বিএনপির আবেদনের জোরালভাবে বিরোধিতা করেছি।
আবেদন জমা দেওয়ার পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মো. আক্তারুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা আমাদের আশ্বস্ত করেছে, পুনঃতফসিলের কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে আইন কানুন খতিয়ে দেখবে। তিনি আরও বলেন, আমরা আজকে যে কারণে নির্বাচন কমিশনে এসেছি হঠাত্ করে লক্ষ্য করলাম, ওবায়দুল কাদেরের প্রচারণায় হামলা, প্রতিমন্ত্রী আফসারুল ইসলামের চট্টগ্রাম মিছিলে হামলা, শুক্রবার রাতে মুক্তাগাছায় পুলিশের ওপর ককটেল নিক্ষেপ করা হয়। দুঃখজনক ঘটনা হলেও ঠাকুরগাঁওয়ের জগন্নাথপুরে হিন্দুদের ওপর হামলা করা হয়েছে। এ ছাড়াও ওখানে গান পাউডার ব্যবহারের তথ্যও আমরা পেয়েছি।
জামায়াত নেতাদের প্রার্থিতা বাতিল চায় প্রজন্ম’৭১
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর ২৫ নেতার প্রার্থিতা বাতিল চেয়েছে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সন্তানদের সংগঠন প্রজন্ম ’৭১। গতকাল শনিবার বিকেলে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদার কাছে এ সংক্রান্ত একটি স্মারকলিপি জমা দেন সংগঠনটির নেতারা। এর আগে সকালে গৌরব ‘৭১ নামের একটি সংগঠন জামায়াত নেতাদের প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে সিইসির কাছে স্মারকলিপি দেয়। সংগঠনটির সভাপতি শাহীন রেজা নূর ও সহ-সভাপতি আসিফ মুনীর স্বাক্ষরিত স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে-সংবিধানের সঙ্গে গঠনতন্ত্র সাংঘর্ষিক হওয়ায় জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। এ ছাড়া ১৯৭১ সালে দেশবিরোধী ভূমিকার জন্য জামায়াতে ইসলামীকে অপরাধী দল আখ্যায়িত করে দেশের কোনো শীর্ষপদে স্বাধীনতা বিরোধীদের থাকা উচিত নয় বলে মত জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। অথচ একটি রাজনৈতিক জোটের অংশ হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর ২৫ নেতাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ বিষয়ে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে আহ্বান জানিয়েছি।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্মারকলিপি পাঠকারী শহীদ পরিবারের সন্তান তৌহিদ রেজা নূর বলেন, আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। আমাদের দাবি জানিয়ে গেলাম। পরবর্তীতে আমরা কী পদক্ষেপ নেব তা পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
