মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্পের শান্তি প্রস্তাব

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২২:১৯

মো. রাশেদ আহমেদ

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্য ইস্যু গত শতাব্দী থেকে বিভিন্ন কারণে আলোচিত হয়ে আসছে। কারণ হিসেবে ভৌগোলিক ভূ-রাজনীতি বড়ো একটি ফ্যাক্টর। মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকা মহাদেশের প্রান্ত ঘেঁষে ১৪ দেশের অবস্থান বলেই এর গুরুত্বটা কয়েকগুণ বেশি। এসব দেশ প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এবং অর্থনীতি তেলনির্ভর। বিশ্বের মোট মজুত তেলের দুই-তৃতীয়াংশ মধ্যপ্রাচ্যে রয়েছে। মূলত মধ্যপ্রাচ্যের ক্যানসার বলে পরিচিত ইসরাইলের সঙ্গে আরব বিশ্বের দ্বন্দ্ব-সংঘাত-যুদ্ধ ও চরম উত্তেজনা বহু পুরোনো। ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর তত্কালীন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বেলফোর ঘোষণা (ফিলিস্তিন এলাকায় স্বাধীন ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা) ছিল মধ্যপ্রাচ্যের জন্য অন্ধকারময় এক কালো দিন। মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দ্বন্দ্ব শুরু হয় বেলফোর ঘোষণার মধ্য দিয়ে, যা এখন পর্যন্ত বিদ্যমান।

সর্বশেষ ২০১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী  জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা করলে ফিলিস্তিন, আরব লিগসহ গোটা বিশ্বের মুসলিমপ্রধান দেশগুলো তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে। এর কঠোর প্রতিবাদ করলে ফিলিস্তিনিদের বুকে নেমে আসে এক অমানবিক নির্যাতন। দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনিদের লালিত স্বপ্ন ছিল জেরুজালেম হবে একমাত্র তাদের রাজধানী। উল্লেখ, জেরুজালেম মুসলিম, ইহুদি ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের কাছে পবিত্র ভূমি। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা আরব-ইসরাইল দ্বন্দ্ব নিরসনে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প প্রশাসনের সময় মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পান তার জামাতা মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক উপদেষ্টা জ্যারেড কুশান। সেই সূত্র অনুপাতে, প্রায় তিন বছর কাজ করার পর অবশেষে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গত ২৮ জানুয়ারি ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর উপস্থিতিতে শান্তির প্রস্তাব পেশ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যাতে বলা হয়েছে ফিলিস্তিনিদের রাজধানী হবে পূর্ব জেরুজালেম। একই সঙ্গে  ফিলিস্তিনদের স্বীকৃতি দেবে যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিম তীরের ইহুদি বসতির ওপর সার্বভৌমত্ব স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলেছেন। এই প্রস্তাবকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট শতাব্দীর সেরা শান্তির প্রস্তাব হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং ফিলিস্তিনিদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি শান্তি পরিকল্পনায় ‘নতুন ভোর’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে উক্ত প্রস্তাবে উপস্থিত ছিল না ফিলিস্তিনের কোনো প্রতিনিধিদল। ট্রাম্পের শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে ফিলিস্তিনবাসী। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, তুরস্ক, জর্ডান, ইরাক উক্ত প্রস্তাবকে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার অন্তরায় হিসেবে বর্ণনা করেছে। যদিও ব্রিটেনসহ বেশ কয়েকটি রাষ্ট্র এই প্রস্তাবকে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য নতুন অধ্যায় বলে বর্ণনা করেছে। অপরদিকে, ফিলিস্তিনবাসী এই প্রস্তাবকে আরেক বেলফোর দুঃস্বপ্ন বলে অভিহিত করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তবে মধ্যপ্রাচ্যের বিশ্লেষকেরা ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনাকে ইসরাইলের পক্ষে রায় বলে মনে করেন। কেননা, এখানে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনসহ তাদের কোনো অধিকার সংরক্ষণ করা হয়নি। এতে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের শান্তি প্রতিষ্ঠায় আরো বেশি সংকট তৈরি করবে বলে মনে করছে এবং তাতে দীর্ঘদিনের স্বাধীন ফিলিস্তিনিদের স্বপ্ন বিবর্ণ হবে। সৃষ্টি হবে নতুন সংঘাত।

বিভিন্ন কারণে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি পরিকল্পনা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে, বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্ব রাজনীতির ময়দানে ঘরে-বাইরে উভয় জায়গায় বেশ ব্যাকফুটে রয়েছে। ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের জেনারেল সোলেইমানি হত্যাকাণ্ডের পর মধ্যপ্রাচ্যে রাজনীতি মার্কিনদের আধিপত্য বেশ নড়বড়ে। এমনকি এই ক্লান্তিকর সময়ে পাশে নেই তার মিত্ররা। অপরদিকে চলছে ইমপিচমেন্ট, যা ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য লাল সংকেত। সব সমালোচনা পাশ কাটিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি পরিকল্পনা হতে পারে আগামী নির্বাচনের জন্য প্রেসিডেন্টের ‘ট্রাম্প কার্ড’। অপরদিকে ঘরোয়া রাজনীতিতে কোণঠাসা নেতানিয়াহু। গত ২০১৯ সালে তিনটি নির্বাচন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় সরকার গঠন করতে ব্যর্থ  হয় নেতানিয়াহুর দল। এই মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি পরিকল্পনা তার আগামী রাজনীতিতে বড়ো প্রভাব ফেলবে, সেটা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

 মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘শান্তি পরিকল্পনা’ প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বড়ো ধরনের অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হলো। সেই সঙ্গে, ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা সংগ্রাম চালিয়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক। সুতরাং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে উভয় পক্ষকে একই আলোচনার টেবিলে বসার কোনো বিকল্প নেই। সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে নিরপেক্ষ রেফারির দায়িত্ব পালন করতে হবে। তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত এড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া