অনেকটা শান্তিপূর্ণভাবেই শেষ হয়েছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচন। ছিল না বড়ো ধরনের কোনো গোলযোগ, হট্টগোল কিংবা ধাওয়া ও পালটা ধাওয়া। সংঘর্ষের কারণে কোনো কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত বা বন্ধ হওয়া কিংবা ফলাফল বাতিলেরও কোনো ঘটনা ঘটেনি। প্রথমবারের মতো ঢাকার দুই সিটিতে সম্পূর্ণ ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) হওয়া ভোটে বিএনপির এজেন্টদের বের করে দেওয়া ও ঢুকতে না দেওয়া, বিশেষ করে বয়স্কদের আঙুলের ছাপ না মেলার দুর্ভোগ এবং ইভিএম ব্যবহারের পদ্ধতি দেখিয়ে দেওয়ার নামে ধোঁকা দিয়ে ভোটারের ভোট দিয়ে ফেলাসহ বেশ কিছু অভিযোগ উঠেছে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে এই ভোটের প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ভোটারের খরা।
গতকাল সকাল ৮টায় শুরু হয়ে বিকাল ৪টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়া পর্যন্ত দুই সিটির অনেকগুলো কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন ইত্তেফাকের প্রতিনিধিরা। ভোটের চিত্র পর্যবেক্ষণে বেশির ভাগ কেন্দ্রেই বিএনপির মনোনীত মেয়র ও দল সমর্থিত কাউন্সিলর পদপ্রার্থীদের এজেন্ট দেখা যায়নি। বেশ কিছু কেন্দ্রে আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় ছিল ভোট দেওয়ার বুথের গোপনীয়তার ঘাটতি। স্বল্প উচ্চতার কাপড় দিয়ে বুথ আড়াল করার কারণে ভোটাররা ভোট দেওয়ার সময় কোন প্রতীকে ভোট দিচ্ছেন বা দিলেন, ভোটকক্ষের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা কেউ সেটি সহজে দেখতে পারছিলেন। ফলে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে গিয়ে অনেকে অস্বস্তি বোধ করেন।
বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা যায়, সকাল পেরিয়ে দুপুর হলেও হাতে গোনা কয়েকটি ছাড়া বেশির ভাগ কেন্দ্রেই ভোটারের কোনো লাইন দেখা যায়নি। ভোট গ্রহণের কাজে দায়িত্বরত ব্যক্তিরা দিনের বেশির ভাগ সময়ই অলসভাবে কাটিয়েছেন। মাঝেমধ্যে দু-একজন করে ভোটার আসছিলেন। তিনি ভোট দিয়ে চলে যাওয়ার পর পরবর্তী ভোটারের জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছে। তবে দুপুরের পর ভোটারের উপস্থিতি কিছুটা বাড়ে।
ফিরে গেছেন অনেকে :বেলা সোয়া ৩টার দিকে ঢাকা উত্তর সিটির শেরেবাংলা নগর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, কেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। এ সময় একজন ভোটার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তিনি ভোট দিতে গিয়ে দেখেন বুথের পাশে একজন দাঁড়িয়ে আছেন। এ কারণে তিনি ভোট না দিয়েই ফিরে যাচ্ছেন। তিনি যে ভবনে থাকেন, ঐ ভবনের একজন বাসিন্দাও তাকে কেন্দ্রে আসার আগে একই তথ্য জানিয়েছিলেন।
মিরপুর উদয়ন উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে আইয়ুব আলী সকাল সাড়ে ৮টায় ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে যান। কয়েকবার চেষ্টার পরেও ফিঙ্গার প্রিন্ট না মেলায় ভোট দিতে পারেননি। পরে দুপুর ১২টার দিকে গিয়ে আবার চেষ্টা করেন। তখনো ফিঙ্গারপ্রিন্ট না মেলায় সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তার সহায়তায় ভোট দেন তিনি। এই কেন্দ্রের ৫ নম্বর কক্ষে মোট ভোটার ৩৬৭ জন। বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ভোট পড়ে মাত্র ৫৩টি। এর মধ্যে চার জন প্রিসাইডিং কর্মকর্তার সহায়তায় ভোট দেন। এছাড়া আরো কয়েক জনকে হাত ধুয়ে আবার আসতে বলা হয়। মিরপুর আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় কেন্দে ৭৩ বছর বয়সি এক নারী ফিঙ্গারপ্রিন্ট না মেলায় ভোট না দিয়েই চলে যান।
দুপুর ১২টায় শেওড়াপাড়ার ওয়াসা রোডে জিনিয়াস কেজি স্কুল কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, বাইরে খুব বেশি ভোটার নেই। এই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার মিজানুর রহমান জানালেন, এখানে ১২টা পর্যন্ত ৩০ শতাংশের ওপরে ভোট কাস্ট হয়েছে। কিছু ভোটারের আঙুলের ছাপ মিলছে না। এই সমস্যা ছাড়া কেউ কোনো অভিযোগ করেননি। শান্তিপূর্ণভাবেই ভোট হচ্ছে বলে জানান তিনি।
মিরপুর এলাকায় অধিকাংশ কেন্দে ই বিএনপির কোনো এজেন্টের উপস্থিতি দেখা যায়নি। কোথাও কোথাও আওয়ামী লীগের কর্মীকে বিএনপির ‘ডামি’ পোলিং এজেন্ট হিসেবে বসিয়ে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে দলটির পক্ষ থেকে। মিরপুরের পল্লবী মাজেদুল ইসলাম মডেল হাইস্কুল কেন্দে ইভিএমে ভোট দেওয়ার পদ্ধতি অনেক ভোটার বুঝতে পারছেন না। সেই সুযোগে মিরপুরের বিভিন্ন কেন্দে তাদের সঙ্গে ভোটের গোপন কক্ষে ঢুকে পড়েন সরকার দলীয় মেয়র প্রার্থী বা সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীর কর্মীরা। নিজের ভোট অন্য একজন দিয়ে দিয়েছেন এমন অভিযোগ করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের মনিপুর উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভোটার মাহমুদা। তিনি বলেন, সব প্রক্রিয়া শেষ করেই আমি প্রথমবারের মতো ইভিএমে ভোট দিতে যাই। বুথের ভেতরে গেলে একজন এসে আমাকে বলল, সাহায্য লাগবে কি না? আমি বললাম, নিয়মটা বলে দেন। তখন তিনি নিজেই মেয়র পদে তার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে দিলেন। এখানে কেন্দ দখল নিয়ে পুলিশের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকরা।
মগবাজার ও ইস্কাটন :বেলা ১২টার দিকে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার ইস্পাহানি বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ পর্যবেক্ষণ করতে আসেন। এসময় ভোটার নয়—এমন একজনকে তিনি শনাক্ত করেন। তাকে আটকের নির্দেশ দেন। পুলিশ তাকে আটক করতে গেলে ঐ ব্যক্তি নির্বাচন কমিশনারের সামনে ভোঁ দৌড় দিয়ে কেন্দ থেকে বেরিয়ে যান। এই নির্বাচন কমিশনার ইস্পাহানি বালিকা স্কুলের পাঁচটি কেন্দে র বিভিন্ন বুথ ঘুরে দেখেন। পরে তিনি ১০৪৪ নম্বর কেন্দে র একটি বুথে নিজের ভোট দেন। তিনি সাংবাদিকদের কাছে বলেন, নির্বাচনের পরিবেশ আমার চেয়ে আপনারা (সাংবাদিকরা) ভালো জানেন। এই কেন্দে অনেকগুলো বুথ আছে, এখানে বিরোধী দলের মেয়র প্রার্থীর কোনো এজেন্টকে আমি দেখিনি।
শাহনূরী মডেল হাইস্কুল, বড়ো মগবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বিটিসিএল আইডিয়াল স্কুল ও কলেজ কেন্দ সহ অন্তত ১০টি কেন্দে র প্রিজাইডিং অফিসারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সকাল থেকেই কেন্দ গুলোতে বিএনপির মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের কোনো এজেন্ট প্রবেশ করেননি। এমনকি নির্ধারিত এজেন্টরা তাদের পরিচয়পত্রের জন্য প্রিজাইডিং অফিসারের কাছে কোনো আবেদনও করেননি।
ঢাকা দক্ষিণ ক্ষমতাসীনদের দখলে : ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ, সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজ, ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাব, মুগদার মহানগর আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ ঢাকা দক্ষিণের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ ঘুরে দেখা গেছে— ভোটের মাঠ দখলে রাখেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা। সকাল থেকেই পছন্দের প্রার্থীর ছবি সংবলিত ব্যাচ গলায় ঝুলিয়ে তারা ভোটকেন্দে র বাইরে অবস্থান নেন। বাইরে মহড়া আর ভেতরে চলছিল ইভিএমে ভোটগ্রহণ। আঙুলের ছাপ না মেলায় ভোট দিতে না পেরে হতাশ হয়েছেন অনেকে। এসব কেন্দে ও বিএনপির মেয়র প্রার্থী ইশরাক হোসেন ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টদের খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ঢাবিতে উত্সবমুখর পরিবেশ : এদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উত্সবমুখর পরিবেশে ভোট হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল, ল্যাবরেটরি স্কুল, উদয়ন উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়, এনেক্স ভবন, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট কেন্দে ভোটগ্রহণ হয়। সকাল ৯টায় ভোটকেন্দ গুলোতে গিয়ে দেখা যায়, ভোটাররা সুষ্ঠুভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট প্রদান করছেন।
বাড্ডায় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, সংঘর্ষ : বাড্ডার বেরাইদের ৪২ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীর কর্মীদের সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আইয়ুব আনসার মিন্টুর সমর্থক আরিফকে দুইটি পিস্তল ও ৩ রাউন্ড গুলিসহ গ্রেফতার করেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বেরাইদের কে এম রহমতউল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ কেন্দ্রের সামনে সকাল ১১টায় এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
ইভিএমে সন্তুষ্টি, বিড়ম্বনা : রাজধানীর রামপুরা একরামুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ইভিএমে ভোট দেওয়া শেষে শেখ সারোয়ার সেলিম নামে এক ভোটার ইত্তেফাককে বলেন, ভোট দিতে সমস্যা হয়নি। কিন্তু এ ব্যবস্থাটি নিয়ে যদি আরো এক মাস আগে থেকে ভোটারদের সচেতন করা হতো তা হলে খুব ভালো হতো। অল্প কিছু ব্যতিক্রম বাদে বেশির ভাগই ঝামেলা ছাড়াই ইভিএমে ভোট দিতে পেরেছেন। তবে ইভিএমে ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে কিছু বিড়ম্বনার খবরও পাওয়া গেছে। কারো কারো আঙুলের ছাপ শনাক্ত করতে পারছিল না এ মেশিন।
প্রার্থীর নাম ও প্রতীক নেই :ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৪৬ নম্বর ওয়ার্ডে গেন্ডারিয়া হাই স্কুল ভোটকেন্দ্র। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কেন্দ্রের একটি বুথে এক নারী ভোটার প্রবেশ করে দেখেন ইভিএম মেশিনের সাদা বোতামের পাশে স্ক্রিনে কোনো প্রার্থীর নাম এবং প্রতীক নেই। ঐ নারী অভিযোগ করেন, বিষয়টি পোলিং অফিসারদের জানানোর পর তারা তাকে যেভাবে আছে সেভাবেই ভোট দিতে বলেন। মার্কাসহ ভোট দেওয়া ছাড়া তিনি কেন্দ্র ত্যাগ করবেন না বলে উচ্চস্বরে জানান। পরে প্রিজাইডিং অফিসার ঘটনাস্থলে এসে ভোটদানের সুযোগ নিশ্চিত করা হবে বলে তাকে আশ্বস্ত করেন। তিনি বলেন, কারিগরি ত্রুটির কারণে হয়তো প্রতীক দেখা যাচ্ছে না। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে ঐ স্কুলের ভোটকেন্দ্রে বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীদের মারধর করে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা। এ কেন্দ্রের বাইরে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর নির্বাচনি ক্যাম্পে ভাঙচুর করে কেন্দ্র সংলগ্ন এলাকা থেকেও তাদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়।
‘চুপচাপ ভোট দিয়ে যাই’ : ঢাকা দক্ষিণ সিটির পূর্বাংশের অনেকগুলো কেন্দ্র ঘুরে বিএনপির পোলিং এজেন্টদের পাওয়া যায়নি। বেশ কিছু স্থানে বিএনপি সমর্থক ভোটারদের নীরবে ভোট দিয়ে কেন্দ্র ত্যাগ করতে দেখা যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বলেন, ‘বিএনপির যে সমর্থকরা এলাকায় পরিচিত তারা ভোটকেন্দ্রে আসতে পারেননি। সরকার-দল সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীর কর্মীরা হুমকি দিয়েছে। অনেকেই এলাকাছাড়া। আর যারা বিএনপি সমর্থক বলে পরিচিত নয় তারা নীরবে চুপচাপ ভোট দিয়ে কেন্দ্র এলাকা ত্যাগ করছি।’
বকশীবাজারে ককটেল, পালটাপালটি ধাওয়া :ঢাকা দক্ষিণ সিটির ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের বকশীবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর প্রার্থী ও বিএনপির প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে পালটাপালটি ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় আটটি ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায়। প্রায় ২০ মিনিট ভোট গ্রহণ বন্ধ ছিল।
