হুসাইন রবিউল
সোনারগাঁওয়ের লোকজ উত্সবের মূল চত্বরে প্রবেশ করে যে কারো মনে হতে পারে তারা যেন দেখছেন একই বৃত্তে পুরো বাংলাদেশকে। কী নেই এখানে বাঁশের তৈরি ডুলা, চালুনি, ঝুড়ি, বেতের ঝাপি, কাঠের হাতি ঘোড়া, শঁখের হাঁড়ি, নকশিকাথাঁ, পাটের শিকা, শীতল পাটি, তাঁতের শাড়ি একসঙ্গে সবকিছুর আয়োজন। প্রাচীন বাংলার রাজধানী ঐতিহাসিক সোনারগাঁওয়ে বসেছে লোক ও কারুশিল্পীদের এ মিলনমেলা। কারুশিল্পীরা এখানে বসে আপন মনে তৈরি করছেন তাদের শিল্পকর্ম। যা দেখে অনেকেই ফিরে যাবেন সেই আবহমান গ্রামবাংলায়। যান্ত্রিকজীবনে বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকজ উপাদানের সঙ্গে হয়তো বর্তমানে অনেকেরই পরিচয় নেই। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে লোকজ ঐতিহ্যের বিরাট দূরত্ব লক্ষণীয়। বিলুপ্তপ্রায় বাংলার লোক ও কারুশিল্পের সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রদর্শন, বিপণন ও পুনরুজ্জীবনের লক্ষে সোনারগাঁওয়ের বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন মাসব্যাপী লোকজ উত্সবের আয়োজন করেছে। গত ১৪ জানুয়ারি শুরু হওয়া উত্সবে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয় ৬৪ জন লোক কারুশিল্পীকে।
কারুশিল্পী প্রর্দশনীতে এবার ঝিনাইদহ ও মাগুরার শোলা শিল্প, রাজশাহীর শখের হাঁড়ি, চট্টগ্রামের তালপাতার পাখা, রংপুরের শতরঞ্জি, সোনারগাঁওয়ের ঐতিহ্যবাহী চিত্রিত হাতি, ঘোড়া, পুতুল ও কাঠের কারুশিল্প, নকশিকাথাঁ, নকশি হাতপাখা, মুন্সিগঞ্জের শীতল পাটি, মানিকগঞ্জের তামা-কাঁসা ও পিতলের কারুশিল্প, রাঙামাটির ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কারুপণ্য, কিশোরগঞ্জের টেরাকোটা শিল্প, সোনারগাঁওয়ের পাটের কারুশিল্প, নাটোরের শোলার মুখোশ শিল্প, মুন্সিগঞ্জের পটচিত্র ও ঢাকার কাগজ কাটা হস্তশিল্প স্থান পেয়েছে।
লোকজ উত্সবে শুধু কারুশিল্পীদের শিল্পকর্ম প্রদর্শন করাই নয়, এখানে বাংলার হারিয়ে যাওয়া লোক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরছেন কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশের লোক সংস্কৃতির অন্যতম উপাদান বাউলগান, পালাগান, কবিগান, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালী , জারি-সারি, হাছন রাজার গান, লালনসংগীত, মাইজভাণ্ডারি গান, মুর্শিদী গান, আলকাপ গান, গাঁয়ে হলুদের গান, বান্দরবান বিরিশিরি, কমলগঞ্জের-মণিপুরী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শরীয়ত-মারফতি গান, লোকজ ছড়া পাঠের আসর, পুঁথি পাঠসহ লোকনৃত্য ও লোকজ নাটক পরিবেশন করা হচ্ছে লোকজ উত্সবের সোনার তরী লোকজ মঞ্চে।
লোকজ মঞ্চের অদূরে ব্যবস্থা করা হয়েছে গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ খেলাধুলার। উত্সব চত্বরের গ্রামীণ খেলার মাঠে স্থানীয় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে প্রদর্শিত হচ্ছে বিলুপ্তপ্রায় গোল্লাছুট, কানামাছি, বৌচি, দাড়িয়াবান্ধা, লাঠি খেলাসহ নানারকম গ্রামীণ খেলা। যা দেখে এখানে আগত শিশু-কিশোররা জানতে পারছে বাংলার গ্রামীণ খেলা সম্পর্কে।
এছাড়া আয়োজন করা হয়েছে লোক জীবন প্রদর্শনী। এতে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা অভিনয়ের মাধ্যমে লোকজ জীবনধারার গ্রামীণ বিচার, গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান, গ্রামীণ কবিরাজ, পিঠা তৈরি ও গ্রাম্য বিয়েসহ গ্রামীণ জীবনের বিভিন্ন লোকাচার দর্শনার্থীদের মাঝে তুলে ধরছে।
লোকজ উত্সবের বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে রয়েছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী পুতুল নাচ ও বায়াস্কোপ প্রদর্শনী। নির্দিষ্ট ফি দিয়ে যে কেউ পুতুল নাচ ও বায়াস্কোপ দেখতে পারবেন। পাশাপাশি রয়েছে নাগর দোলা ও আঁকাবাঁকা স্বচ্ছ লেকে নৌ-ভ্রমণের ব্যবস্থা। লোকজ উত্সবে কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজ থেকে উত্সারিত লোকজ উপাদানকে সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরায় কারুশিল্পীরা তাদের কারুপণ্য তৈরি প্রদর্শনী ও বিপণনের সুযোগ পেয়েছেন। এতে উত্সবে আগত ক্রেতা-দর্শনার্থীরা কারুশিল্পীদের কারুকর্ম তৈরি প্রক্রিয়া স্বচক্ষে দেখে কারুশিল্পীদের কাছ থেকে সরাসরি কারুপণ্য ক্রয় করতে পারছেন। পাশাপাশি পরিচিত হচ্ছেন আমাদের লোক সংস্কৃতির শেকড়ের সঙ্গে। গত ১৪ জানুয়ারি শুরু হওয়া এ উত্সব শেষ হবে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারিতে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকছে এ উত্সব। উত্সবে প্রবেশ মূল্য ৫০ টাকা।
