সানেমের সম্মেলনে অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ
ইত্তেফাক রিপোর্ট
গত চার দশকে বাংলাদেশের নাটকীয় উন্নতি হয়েছে। যাকে বলা হয় ডেভেলপমেন্ট সারপ্রাইজ। সরকারি সেবা সরবরাহের ক্ষেত্রে অত্যন্ত দুর্বল প্রশাসন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে অনেক কম ব্যয় সত্ত্বেও বাংলাদেশ এ অর্জন করেছে। আর্থসামাজিক এই উন্নয়নগুলো টেকসই করতে হলে সুশাসনের উন্নতি করতে হবে। উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে যেতে হলে উদ্ভাবনীমূলক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। গতকাল রবিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে সাউথ এশিয়ান (সানেম) আয়োজিত ৫ম বার্ষিক অর্থনীতিবিদ সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে এ কথা বলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। সানেমের চেয়ারম্যান ড. বজলুল হক খন্দকারের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন ব্র্যাকের চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান, সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান।
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ তার উপস্থাপনায় উল্লেখ করেন, সুশাসনের সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্বব্যাংক, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামসহ বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা প্রকাশিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুশাসনের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে রয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো সুশাসনে উন্নতি ছাড়া এ অর্জন কীভাবে হলো। তিনি বলেন, জনসংখ্যা কমিয়ে আনা, স্বল্প মজুরি, তৈরি পোশাক শিল্পের মাধ্যমে নারীদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ছাড়াও দেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট বা তরুণদের মাধ্যমেই এ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে খাবার স্যালাইনের মতো স্বল্প খরচের সমাধানের মাধ্যমে অনেক উন্নতি হয়েছে। কৃষি খাতেও উত্পাদনশীলতা বেড়েছে। কিন্তু উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে যেতে হলে উদ্ভাবনীমূলক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। সেইসঙ্গে বাজার উপযোগী কর্মসংস্থান তৈরিতে দক্ষতা বাড়াতে হবে। সবচেয়ে বড়ো যে চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের সামনে তা হলো প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সুশাসনের ঘাটতি।
তিনি বলেন, দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামো এবং অকার্যকর জবাবদিহি ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও, এখনো পর্যন্ত আর্থসামাজিক খাতে যে অগ্রগতি হয়েছে তাতে সরকারের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। সংসদ ও বিচার ব্যবস্থা শক্তিশালী না হলেও গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ এক্ষেত্রে বড়ো ভূমিকা রাখছে। তবে এ অবস্থার পরিবর্তন ছাড়া ভবিষ্যতে আর্থসামাজিক অর্জনগুলো টেকসই করা কঠিন হবে।
সফল উন্নয়নশীল দেশের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, টেকসই অগ্রগতি কেবল সুশাসনের মাধ্যমেই সম্ভব। আর এই সুশাসনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সব স্তরে দক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়। বাংলাদেশ কোন পথটি ধরবে এখন সেটি দেখার বিষয়। গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিতের মাধ্যমে দক্ষ ও জবাবদিহিতামূলক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে এ উন্নয়ন আরো টেকসই ও বেগবান হবে।
তিনি আরো বলেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বড়ো বিনিয়োগ ছাড়া আর্থসামাজিক খাতে আর উন্নয়ন সম্ভব নয়। ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের অনেক ক্ষেত্রেই উন্নয়ন হচ্ছে। কিন্তু কিছু প্রশ্নও থেকে যাচ্ছে। সুশাসন না থাকলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে কীভাবে?’
ড. সেলিম রায়হান বলেন, দেশে পাজলের মতো উন্নয়ন হচ্ছে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন না হলেও অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন হচ্ছে ঠিকই। কিন্তু এই উন্নয়ন টেকসই হবে না। আর্থিক খাতে সংস্কার, কর কাঠামো উন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি জরুরি। পাশাপাশি দুর্নীতি প্রতিরোধেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
