সময় এখন জনতুষ্টিবাদের

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২২:০৫

হাসান ইমাম

২০১৮ সালের মধ্যে নাকি বিশ্বব্যাপী জাতীয়তাবাদের আবেদন কমে যাবে—এমনটাই নিদান দিয়েছিলেন ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অধ্যাপক ইথেয়েল ডে সোলা পুল, সেই ১৯৬৮ সালে। কিন্তু ফলেনি তার এই ভবিষ্যদ্বাণী। বাস্তবে জাতীয়তাবাদ আরো প্রকট হয়েছে। সঠিকভাবে বললে ক্রমে ধূসর হচ্ছে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক জামানা।

এই অবস্থার অনুবাদে অনেকে বলছেন, যুগটা জনপ্রিয়তাবাদের, যার অন্য নাম লোকরঞ্জন বা জনতুষ্টিবাদ। কেউ কেউ আরো এক ধাপ এগিয়ে বলছেন, আসলে এই যুগে ডানপন্থা আর বর্ণবাদ মিলেমিশে একাকার। তাই চিরাচরিত সংজ্ঞায় আর ডান, বাম বা মধ্যপন্থাকে ধরা যাচ্ছে না। বিশ্বের নানা প্রান্তের উদাহরণ টেনে বলা হচ্ছে জনপ্রিয়তাবাদী বা লোকরঞ্জনবাদী আন্দোলন, রাজনীতি ডানপন্থি হতে পারেত বটেই, এমনকি বামপন্থি হওয়াও আশ্চর্যের নয় এখন। জনতুষ্টিবাদের চশমায় দৃষ্টিভ্রম হবেই, ঘাপলা হবে বাছবিচারে, মোটা দাগে সবই লাগবে একই রকম। তবু এমন ‘ধূসর-সময়ে’ একটা দিক মোটামুটি পরিষ্কারই বলছেন বিশ্লেষকেরা। তাদের মূল্যায়নে, প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের কাল নাকি ফুরিয়ে আসছে। বিশ্ব জুড়ে ডানপন্থি রাজনীতির উত্থান, কর্তৃত্ববাদের বিস্তার, বামপন্থার অবনমন সেই কথাটিই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে এলান করছে। আর এ কথারই প্রতিধ্বনি করল ইকোনমিস্টের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের গণতন্ত্র সূচক-২০১৯। এই সূচক বলছে, পূর্ণ গণতন্ত্র, ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র, হাইব্রিড শাসন ও কর্তৃত্ববাদী শাসন—এই চার ক্যাটাগরির মধ্যে পূর্ণ গণতন্ত্রের অবস্থা নাজুক। লাতিন আমেরিকার ব্রাজিল, ভেনেজুয়েলা, বলিভিয়া থেকে শুরু করে ইউরোপের ফ্রান্স, ব্রিটেনসহ কয়েকটি দেশ এবং মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও আফ্রিকার বেশির ভাগ দেশ এর সপক্ষে জাজ্বল্য উদাহরণ। লুলা ডি সিলভা লুলা, হুগো চাভেস ও এবো মোরালেস—এই ত্রয়ীকে একসময় বলা হতো লাতিন আমেরিকায় নতুন বামপন্থার প্রতীক। টিকে আছেন কেবল চাভেসের উত্তরসূরি মাদুরো, তিনিও নানা সমস্যায় ন্যুব্জ। লুলাকে হারিয়ে প্রেসিডেন্ট হওয়া বোলসোনারো গত শতকের সামরিক শাসনের সখা। নারী ও শ্রমিক অধিকারসহ সব ধরনের অধিকারের বিরোধী তিনি। নিজেই অকপটে স্বীকার করেছেন, খ্রিষ্টান মূল্যবোধের ভিত্তি শক্ত করাই তার লক্ষ্য।

কাজেই বোলসোনারোকে লাতিন আমেরিকার ডোনাল্ড ট্রাম্প বলায় এতটুকু গোঁজামিল নেই। মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাহিনিও অভিন্ন। নারীর অধিকার, শরণার্থীদের সহায়তা, জলবায়ু সংকট মোকাবিলা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সহযোগিতা—এসব মূল্যবোধ তার রাজনৈতিক অভিধানে অনুপস্থিত। করুণ অবস্থা ব্রিটেনেরও। ব্রেক্সিট প্রশ্নে মতানৈক্যের জেরে দেশটির রাজনীতি গত কয়েক বছরে ঝাঁজরা হয়ে গেছে। বরিস জনসনের উত্থান এই গভীর রাজনৈতিক সংকট থেকেই। সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতি তাচ্ছিল্যপূর্ণ মনোভাব, খানিক সত্য-আধেক মিথ্যার রাজনীতি এবং বরিসকে ঘিরে কট্টর রক্ষণশীল, উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির পরিসর। তবে এটুকু কি বলা চলে, জনসনই হয়তো নেতৃত্ব দেবেন ৩০০ বছরের যুক্তরাজ্যের শেষ পর্বে? এই প্রথম জাতীয়তাবাদী বামপন্থীরা জয়ী হলো উত্তর আয়ারল্যান্ডে; স্কটল্যান্ডের জাতীয়তাবাদী দলও ফের জয় ছিনিয়ে নিয়েছে; জাতীয়তাবাদী সত্তা ফিরে পেতে ইংল্যান্ডও মরিয়া।

ইউরোপের আরেক দেশ ফ্রান্সেও সংকট দ্বিমুখী। দেশটিকে ইউরোপীয় বলয়েই রাখতে চান বলেই ম্যাখোঁ জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে সামনে আনেননি। কিন্তু অর্থনীতি শক্তিশালী করার নামে চাপিয়েছেন নতুন নতুন কর, সংকোচন চেয়েছেন পেনশন-ব্যবস্থার, শরণার্থী ও অভিবাসী শ্রমজীবীদের প্রতি আরোপ করেছেন কঠোর নিয়ন্ত্রণ, এমনকি বাড়াচ্ছেন সামরিক শক্তি-সামর্থ্যও। দেশটিতে তাই ‘ইয়েলো ভেস্ট’ নামে খ্যাত প্রতিবাদ বাড়ছে বেশ কিছুদিন থেকেই। ইতালিতে উগ্র ডানপন্থিদের ব্যাপক উত্থানসহ অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, এমনকি উদারনৈতিক সুইডেনেও মাথা চাড়া দিচ্ছে বর্ণবাদী প্রবণতা, সংখ্যাগরিষ্ঠের দাপট। রাশিয়ায় আরেক দফায় নেতৃত্বে ভ্লাদিমির পুতিন। শি জিনপিং চীনের সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে নিজের ক্ষমতার ব্যাপ্তি আজীবন মেয়াদি করে নিয়েছেন। তুরস্কের এরদোয়ান, ফিলিপাইনের দুতার্তে, মিশরের জেনারেল আল সিসি, চেক প্রজাতন্ত্রের জিমান—এমন আরো অনেক নাম পরপর বলে যাওয়া যায়। অবশ্য এ কথাও তোলা দরকার, প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই কিন্তু গত শতকে হত্যালীলা চালিয়েছিল ভিয়েতনামে। ঘটেছিল শতাধিক ঔপনিবেশিক সংঘাত, খুনোখুনি, রক্তপাত।

জার্মান গবেষণা সংস্থা ‘বেরটেলস ম্যানস্টিফটুং’-এর প্রতিবেদনেও গণতন্ত্রের অপুষ্ট অবস্থার চিত্র আঁকা হয়েছে। গণতন্ত্র, বাজার অর্থনীতি ও সুশাসনের অবস্থা নিয়ে করা তাদের সমীক্ষার সঙ্গে দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের গণতন্ত্র সূচকের মোটা দাগে কোনো ফারাক নেই। তবে গণতন্ত্র সূচকের পরিধি আরেকটু বিস্তৃত। নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও বহুত্ববাদ, সরকারের কার্যক্রম, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও নাগরিক স্বাধীনতা—এই পাঁচটি বিষয় আমলে নেওয়ায় সাধারণের চোখেও বিদ্যমান পরিস্থিতির গ্রাফ সহজেই ধরা পড়ে। দেশে দেশে গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকারের দিকে নজর রাখা ফ্রিডম হাউস বলছে, বিশ্বের মাত্র ১৩ শতাংশ মানুষ ‘মুক্ত গণমাধ্যমের’ দেশে বাস করে। এই নিবন্ধ যেহেতু গণমাধ্যমেই প্রকাশিত হবে, কাজেই এতে বিশ্বের বাদবাকি ৮৭ শতাংশ মানুষের ‘অবরুদ্ধ অবস্থার’ তত্ত্বতালাশ গণমানুষের কাছে ভুল বার্তা দিতে পারে!

n লেখক :সাংবাদিক

[email protected]