‘হারজিত ওদের, বুক খালি হলো আমার’

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২২:৪২

 ‘আমার ছেলেটার কী দোষ ছিল? সারাদিন লালমাটিয়া মহিলা কলেজ কেন্দ্রে নৌকা আর ঠেলাগাড়ির জন্য কাজ করেছে। বিকেলে বাসায় আইসা নাস্তা খাইয়া গেছে আড্ডা দিতে। সুস্থ-সবল ছেলেকে আমি আর ফিরে পাই নাই, পাবও না। হারলেও ওরা, জিতলেও ওরা। কিন্তু বুক খালি করল আমার। আমি এ হত্যার বিচার চাই।’

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার এলাকায় দুর্বৃত্তদের এলোপাতাড়ি কোপে নিহত সুমন শিকদারের (২৪) মা ঝুমুর বেগম গতকাল সাংবাদিকদের কাছে এভাবেই আহাজারি করছিলেন। রাজধানীর লালমাটিয়া এফ ব্লকের ৪/২ ভবনের কেয়ারটেকার আনোয়ার আহমেদ শিকদারের ছেলে নিহত সুমন। এ ভবনের নিচতলায় বাবা-মায়ের সঙ্গেই থাকতেন তিনি। রবিবার ঐ বাসায় গিয়ে দেখা গেল সন্তান হারানোর শোকে শয্যাশায়ী মা ঝুমুর বেগম। দুই বোন সুইটি ও সুবর্ণা মায়ের পাশে বসে তাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে হাউমাউ করে কাঁদছেন।

নিহত সুমনের বোন সুবর্ণা বলেন, ঢাকা উত্তরের নৌকা মার্কার                 প্রার্থী আতিকুল ইসলামের নির্বাচনী প্রচারণায় সক্রিয় ছিল সুমন। ভোটের সারাদিন কাটিয়েছে লালমাটিয়া মহিলা কলেজে। ভোট শেষ হওয়ার পর বাসায় এসে নাস্তা খায়। এরপর তার মোবাইলে একটা কল আসে। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। আর ফেরেনি। রাত ১০টার দিকে খবর পেয়ে ছুটে যাই সোহ্রাওয়ার্দী হাসপাতালে। দেখি রক্তাক্ত নিথর শরীর নিয়ে স্ট্রেচারে শুয়ে আছে আমার ভাই। ডাক্তার আর পুলিশের মুখে জানতে পারি সুমন ভাইকে কারা কুপিয়ে খুন করেছে।

ঝুমুর বেগম বলেন, ‘আল্লাহ তুমি বিচার করো, কারা এমন করে আমার ছেলেডারে খুন করল। আমার বুকটা ফাঁকা করল। আমি এখন কেমনে বাঁচুম!’ তিনি বলেন, রাত ৯টার দিকে এ খুনের ঘটনা ঘটেছে।  ‘ছেলেডারে কোপাইছে। আমি খুনের বিচার চাই। আমার ছেলের মতো আর ছেলে হয় না। এ মহল্লায় সবাই ওরে চেনে-জানে। আমার মতো আর কোনো মায়ের বুক যেন কখনো খালি না হয়। ছোটো বোন সুইটি বলেন, রাতে খেতে আসার জন্য ভাইকে কল দেই, ধরে না। পরে আমরা খেতে বসি। ভাইয়ের খুনের খবরে খাবার ফেলে দৌড়ে গেছি হাসপাতালে। আর কখনো ভাইকে পাব না। আর একসঙ্গে খাওয়াও হবে না।

স্থানীয়রা জানান, নিহত সুমন ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের নবনির্বাচিত কাউন্সিলর সৈয়দ হাসান নূর ইসলামের লালমাটিয়া মহিলা কলেজ কেন্দ্রের পোলিং এজেন্ট ছিলেন। তাদের গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতিতে।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নিহত সুমনের বন্ধু সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘আমি, সুমন, রুবেল, আল-আমিন, ইমরান (মেসি) ও ইমরানসহ ছয় জন মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজারের রহিম ব্যাপারী ঘাটে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম। হঠাত্ অর্ধশত যুবক এসে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের যুবলীগ নেতা শাহ আলম জীবনের লোক কে কে আছে বলে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। এতে সুমন আহত হলে আমরা তাকে শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাই। পরে কর্তব্যরত চিকিত্সক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

তিনি বলেন, হামলাকারী সবার মুখে মাস্ক পরা থাকায় কাউকে চিনতে পারিনি। সোহ্রাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিত্সক ডা. প্রবাহ বিশ্বাস বলেন, ‘আমাদের এখানে নিয়ে আসার আগেই সুমনের মৃত্যু হয়। বুকের ডান পাশে ধারাল অস্ত্রের আঘাতে তার মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া তার পেট, পা ও পিঠসহ শরীরের বেশ কয়েকটি জায়গায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণেই সুমনের মৃত্যু হয়েছে।’ মোহাম্মদপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল লতিফ বলেছেন, সুমন হত্যায় জড়িতদের শনাক্তে ঘটনাস্থলের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এখনো মামলা নথিভুক্ত হয়নি। নিহতের বাবাকে থানায় আসতে বলা হয়েছে। তিনি বাদী হয়ে মামলা দায়ের করবেন। এ ঘটনায় যে বা যারাই জড়িত থাকুক না কেন তাদের গ্রেফতার করা হবে।’