বৃহত্ সুপেয় পানি আর নদীনালার দেশ বাংলাদেশ। এখানে প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম—দুই ধরনের জলাধার রহিয়াছে। পানিসংকট মোকাবিলায় একসময় এই দেশে সৃষ্টি করা হইয়াছে অসংখ্য কৃত্রিম জলাধার, যেমন—পুকুর, দিঘি, খাল ইত্যাদি; কিন্তু প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম উভয় জলাধার সরকারি-বেসরকারিভাবে দিন দিন দখল-দূষণ ও ভরাটের শিকার হইতেছে। ব্যক্তিগত সম্পত্তির অন্তর্গত জলাধারগুলি রক্ষায় সুস্পষ্ট আইন না থাকায় তাহা রক্ষা করা এমনিতেই কঠিন। আবার আইনি দুর্বলতা ও আইন প্রয়োগে আন্তরিকতার অভাবে প্রাকৃতিক জলাধারগুলিও ঠিকমতো সংরক্ষিত হইতেছে না। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলির সমন্বয়হীনতা এবং সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও মনিটরিংয়ের অভাবও ইহার জন্য দায়ী। এই ব্যাপারে আসলে পরিবেশসচেতন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দরকার সাহসী কর্মতত্পরতা।
সম্প্রতি গত ২ ফেব্রুয়ারি সারা বিশ্বে পালিত হইল বিশ্ব জলাভূমি দিবস। এই দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল—‘টেকসই জলাভূমি ব্যবস্থাপনা : সমৃদ্ধ জীবন’। প্রকৃতপক্ষে যে কোনো জলাভূমি আমাদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ; কিন্তু নগর পরিকল্পনায় ইহাকে আমরা তেমন গুরুত্ব দিতেছি না। আমাদের অবহেলা ও অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের কারণে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলা হইতে গত চার দশকে অসংখ্য জলাভূমি হারাইয়া গিয়াছে। অপরিকল্পিত শিল্পায়নেও ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে জলাভূমি। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত এক দশকে ঢাকা হারাইয়াছে ২২ শতাংশ জলাভূমি। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করিতে হইলে আমাদের প্রাকৃতিক জলাভূমিগুলি রক্ষা করিতে হইবে। তৈরি করিতে হইবে নূতন নূতন কৃত্রিম জলাধার। জলাভূমি রক্ষায় জাতিসংঘের আয়োজনে ইরানের রামসার শহরে ১৯৭১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি একটি কনভেনশন হয়। রামসার সেই আন্তর্জাতিক সনদ অনুযায়ী জলাভূমি বলিতে বোঝায় এমন নিচুভূমি যাহার পানির উত্স প্রাকৃতিক কিংবা কৃত্রিম। ইহার পানির স্থায়িত্বকাল সারা বত্সর অথবা মৌসুমভিত্তিক। সামুদ্রিক এলাকায় জলাভূমি বলিতে ছয় মিটারের কম গভীরতাসম্পন্ন ভূমিকে বুঝায়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী নদনদীর বাহিরে বাংলাদেশের মোট আয়তনের ৬ হইতে ৭ শতাংশ জলাভূমি অন্তর্ভুক্ত। এই জলাভূমিগুলি রক্ষায় যেমন সচেতনতা দরকার, তেমনি দরকার আইনের কঠোর বাস্তবায়ন।
পানি ও জলাধার-সম্পর্কিত উল্লেখযোগ্য দুইটি আইন হইল—বাংলাদেশ পানি আইন, ২০১৩ এবং প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০। জলাধার-সম্পর্কিত আইনের বিভিন্ন দুর্বল দিক হইল—কোম্পানির ক্ষেত্রে জরিমানার পরিমাণ কম, অনেক ক্ষেত্রে লাইসেন্স বাতিল বা স্থগিতের ক্ষমতাই দেওয়া হয় নাই। জলাধারের সংজ্ঞা নিয়াও পানি আইন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও জলাধার আইনের ক্ষেত্রে ভিন্নতা বিদ্যমান। জলাধার আইনে প্রাকৃতিক জলাধার হিসাবে মাস্টার প্ল্যান বা গেজেট প্রজ্ঞাপন দ্বারা চিহ্নিত স্থানকে বুঝানো হইয়াছে। অথচ এমন অনেক স্থান বা এলাকা রহিয়াছে যেখানে কোনো মাস্টার প্ল্যানই নাই। অন্যদিকে জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের হাতে কোনো ধরনের ক্ষমতা না দেওয়ার কারণেও সমস্যা তৈরি হইতেছে। আইন বাস্তবায়নে ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতাও নিশ্চিত করা হইতেছে না। এইসব কারণে আমরা জলাধার সংরক্ষণের কথা যতই বলি না কেন, আসলে বাস্তবে তাহা রক্ষা করা দিন দিন কঠিন হইয়া পড়িতেছে।
