মো. শহীদুল ইসলাম
ক্ষমতা গ্রহণ করার পরেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তার জামাতা জ্যারেড কুশনারকে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক উপদেষ্টা নিয়োগ দিয়ে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধানের দায়িত্বও দিয়েছিলেন। গত তিন বছর আলাপ-আলোচনার পর জ্যারেড কুশনার একটা পরিকল্পনার রূপরেখা তুলে ধরেন। কয়েক মাস আগে এই পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়। গত ২৮ জানুয়ারি এই পরিকল্পনাটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি এই পরিকল্পনাটিকে অভিহিত করেন শান্তি ফেরানোর ‘নতুন ভোর’ হিসেবে। এটিকে শতাব্দীর সেরা চুক্তি হিসেবে তিনি ঘোষণা করেছেন। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হচ্ছে, জ্যারেড কুশনার তার দীর্ঘ তিন বছরের প্রচেষ্টায় বা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তার এই তথাকথিত শান্তির রূপরেখা প্রণয়ন করেন। কিন্তু কোনো ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেননি। ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধানে যে বিষয়টি নেই, সেটি হচ্ছে ফিলিস্তিনি জনগণের মতামত।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি প্রস্তাবের প্রতিবাদ হয়েছে গাঁজা, রামাল্লা, বেথেলহামসহ ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে। বিক্ষোভ হয়েছে ইরান, মিশর, তুরস্কসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশে। তাত্ক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান, তুরস্ক, মিশরসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ। ট্রাম্পের ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে ইসরায়েল, যুক্তরাজ্য। জার্মানি জানিয়েছে, তারা বিষয়টা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ঐ দিনই প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে ফোন করে ফিলিস্তিনিদের পাশে থাকার দৃঢ় অবস্থান স্পষ্ট করেছে সৌদি আরবের বাদশা। এই প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করেছে আরব লিগ।
২০১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক জেরুজালেমকে ইসরায়েল রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করার পর থেকেই মূলত সন্দেহ ও অবিশ্বাসের সূত্রপাত। তখন থেকেই ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ বারবার বলে আসছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের আর কোনো ধরনের মধ্যস্ততা মানবেন না। কিন্তু যে পদ্ধতি অনুসরণ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার শান্তি চুক্তির প্রস্তাবনা প্রদান করলেন তা কোনোভাবেই যে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না—এটা প্রতীয়মান ছিল। তিনি যেভাবে দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক মানচিত্র তুলে ধরছেন তাতে মূলত ফিলিস্তিন রাষ্ট্রটি হবে কতগুলো ছিটমহলের সমন্বয়ে গঠিত একটি রাষ্ট্র যে রাষ্ট্রের এক স্থান অন্য স্থানে যেতে হলে ইসরায়েলি নিরাপত্তা চৌকির তল্লাশির মাধ্যমে যেতে হবে, একটি স্বার্বভৌম রাষ্ট্র কখনো এমন হতে পারে না। অবৈধ বসতিগুলোকে বৈধতা দিয়ে আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করেছেন।
ফিলিস্তিন সংকট একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। ৭০ বছর ধরে চলে আসা এই সংঘাত সম্ভবত আধুনিক কালের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাগুলোর একটি। ১৯৪৮, ১৯৫৬, ১৯৬৭, ১৯৭৩ চারটি সামরিক সংঘাতও এটির কোনো চূড়ান্ত সমাধান দিতে পারেনি। দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা এই সংঘাতে ইসরায়েল সর্বদাই যুক্তরাষ্ট্রকে পাশে পেলেও আরবরা একটুও প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। ১৯৭৮ সালে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির জন্য মিশরকে আরব লিগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল কিন্তু আজকের বাস্তবতা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যর অনেক দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে খুব সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছে।
কিন্তু আশার কথা হচ্ছে, আরব লিগ ইতিমধ্যে এই শান্তি প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করেছে। সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান ফিলিস্তিনিদের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। পশ্চিমা অনেক দেশের কাছেই এই শান্তি প্রস্তাব গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। এখনই সময় মুসলিম দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে বিষয়টার স্বপক্ষে আন্তর্জাতিকভাবে জোরালো দাবি উপস্থাপন করা। ফিলিস্তিনি জনগণ বা সরকারের সঙ্গে ইসরায়েলি সরকারের সরাসরি আলোচনার যে প্রস্তাব, সৌদি আরব দিয়েছে খুবই যৌক্তিক প্রস্তাব। জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্রসহ পরাশক্তিগুলে এবং মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সমন্বয়ে আন্তর্জাতিক আইন অনুসারেই এই বিষয়টা নিয়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটি সমাধানই কেবল একটি চূড়ান্ত শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে। ওআইসি এবং আরব লিগকে এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। এটি ব্যতীত অন্য কোনো উপায়েই ফিলিস্তিন সমস্যার একটা সমাধান সম্ভব নয়। একদিকে চলমান যে আন্দোলন অব্যাহত আছে, এটির মাধ্যমেও হয়তো কখনোই স্বাধীন ফিলিস্তিন সম্ভব নয়, অন্যদিকে ইসরায়েল যেভাবে দমনপীড়ন চলমান রেখেছে, এটির মাধ্যমেও ফিলিস্তিনিদের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিকে নির্মূল করা সম্ভব নয়। ফলাফল হিসাবে যেটা পাওয়া যাবে, সেটা হচ্ছে সংঘাত, হানাহানি, বর্বরতা। বিশ্বের সব দেশকেই মানবিক দিক বিবেচনা করে এগিয়ে আসতে হবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
