পিরোজপুরে এহ্সান গ্রুপের অস্বাভাবিক মুনাফার টোপ

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:৫৯

পিরোজপুরে এহ্সান গ্রুপ নামে একটি সমবায় সমিতি অস্বাভাবিক মুনাফার টোপ দিয়ে হাজার হাজার মানুষের নিকট থেকে কোটি কোটি টাকা আমানত সংগ্রহ করেছে। কিন্তু নানা কারণে এই সমিতির প্রতি গ্রাহকদের আস্থাহীনতা তৈরি হওয়ায় তারা বিনিয়োগকৃত অর্থ খোয়ানোর আতঙ্কে আছেন। টাকা ফেরত পাবার আশায় প্রতিষ্ঠানের লোকজনের নিকট ধরনা দিচ্ছেন তারা। কিন্তু টালবাহানা করছে প্রতিষ্ঠানটি। অনেকে আঙুল ফুলে কলাগাছ হবার লোভে পড়ে তাদের জীবনের শেষ সম্বল আমানত রেখেছিলেন এখানে। এখন তারা পথে বসার ঝুঁকিতে।

ভুক্তভোগীরা জানান, পিরোজপুর জেলা শহর ও সন্নিহিত কয়েকটি জেলার মধ্যম ও নিম্নআয়ের মানুষের কাছ থেকে এই গ্রুপটি সাত-আট বছর ধরে কোটি কোটি টাকা আমানত সংগ্রহ করে। ব্যাংকের মতোই ফিক্সড ডিপোজিট এবং ডিপিএস পদ্ধতিতে মানুষকে বড়ো অঙ্কের মুনাফার লোভ দিয়ে টাকা রাখতে উত্সাহ দেয় তারা। লোকজনও লোভের বলি হয়ে সেই ফাঁদে পা দেয়। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, তারা প্রতি লাখ টাকা বিনিয়োগে মাসিক ২ হাজার টাকা মুনাফার প্রলোভন দেয়। অথচ এত উচ্চমুনাফা দেশের সরকারি বেসরকারি কোনো ব্যাংক কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠান দিতে পারে না।

এ প্রতিষ্ঠানের তত্পরতা নিয়ে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ জেলা প্রশাসনের পরিচালিত তদন্ত এবং ব্যাবসায়িক আন্তঃকোন্দলের কারণে প্রতিষ্ঠান প্রধান কিছু দিন জেলে থাকেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার জেলে যাবার খবর ছড়িয়ে পড়ায় গ্রাহকরা সন্দেহ করে নিশ্চয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডে কিছু গণ্ডগোল আছে। এছাড়া নানা মহল থেকে ব্যাপক অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে অধিকতর তদন্ত করা হবে বলে জেলা প্রশাসক আবু আলী মো. সাজ্জাদ হোসেন ইত্তেফাককে জানিয়েছেন। একটি জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থাও  এই প্রতিষ্ঠানের  বিরুদ্ধে আরেকটি তদন্ত করলে তার জের ধরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে সমবায় অধিদপ্তরের উচ্চপর্যায়ের একটি দলও কয়েক দিন আগে পিরোজপুরে তদন্ত চালায়। এসব সংবাদেও আতঙ্কিত গ্রাহকরা তাদের টাকা তুলে নিতে ভিড় জমাচ্ছেন।

পিরোজপুর শহরের মাছিমপুর বলাকা ক্লাব এলাকার বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত খাদ্য কর্মকর্তা মো. রফিকুল আলম জানান, দেড় বছর আগে মাসে ২ হাজার টাকা মুনাফা দেওয়ার        শর্তে ৩ লাখ টাকা এ প্রতিষ্ঠানে আমানত রেখেছিলেন। এখন আমানতের অর্থ ফেরত চাইলে গড়িমসি করা হচ্ছে। একই অভিযোগ দক্ষিণ কৃষ্ণনগরের কালাম খানের ছেলে রুহুল আমীনেরও। তাকে দুই মাস ধরে কোনো মুনাফা দেওয়া হচ্ছে না। এরকম আরো বহু গ্রাহক জানান, লোভে পড়ে কষ্টের টাকা এখানে জমা রেখে এখন তা ফেরত পেতে জুতার তলা ক্ষয় করে চলেছেন। ‘দিব দিচ্ছি’ বলে কেবলই সময়ক্ষেপণ করছে।

শহরের সিও অফিস এলাকার বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী মনসুর আলী শেখ ও তার বোন রওশন আরা বেগম ২০ লাখ টাকা আমানত রেখেছেন। বতর্মানে তাদেরও কোনো মুনাফা দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন।

সার্বিক বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার মুফতি রাগীব আহ্সান ইত্তেফাককে বলেন, একটি চেক ডিজ-অনারের মামলায় ঢাকায় তার কয়েক দিন হাজতবাসের কথা মিডিয়া ও ফেসবুকে ভাইরাল হয়। ফলে সমিতির ভবিষ্যত্ নিয়ে আতঙ্কিত সদস্যরা আমানত হারানোর আশঙ্কায় গ্রুপের শাখা অফিসে ভিড় করছেন। তবে তাদের আতঙ্কিত হবার কিছু নেই বলে তিনি দাবি করেন।

পিরোজপুর শহরের কেন্দ্রস্থলে একটি শপিং কমপ্লেক্সে প্রধান অফিস ও বাইপাস সড়কে শাখা অফিস বসিয়ে এ ব্যবসা চালানো হচ্ছে। এহ্সান গ্রুপ তাদের প্রোসপেক্টাসে লিখেছে, তাদের সঞ্চয় ও ঋণদান, ক্যাডেট একাডেমি, কোটি কোটি টাকার রিয়েল এস্টেট ব্যবসা, গার্মেন্টস ও প্রসাধনী ব্যবসা, স্যানিটারী ও হার্ডওয়ার ব্যবসা, মহিলা মাদ্রাসা, ইসলামি রিসার্স সেন্টার ইত্যাদি নামে ১৭টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যার আটটি চালু রয়েছে ও এই আমানতের টাকায় পরিচালিত হয়।

তবে অভিযোগ উঠেছে, এগুলোর অধিকাংশ কাগুজে প্রতিষ্ঠান। এ ব্যাপারে রাগীব আহ্সান ইত্তেফাককে বলেন, অচিরেই এগুলো চালু হবে। লভ্যাংশ ও আমানত ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করে দাবি করেন, আমানত ফেরত দেওয়া শুরু হয়েছে। দাবিদার বেশি বলে কিছুটা ধীরগতি হয়ে যাচ্ছে। চলতি মাস থেকে তা বেগবান হবে এবং আশা করছি তাড়াতাড়ি সৃষ্ট সংকটের সমাধান হবে।