সুখরঞ্জন দাসগুপ্ত
না, হলো না, ভারতের শীর্ষ আদালত কয়েক মাস আগে রায় দিয়েছিলেন—৮ বছর আগে দিল্লির প্যারামেডিক্যালের ছাত্রী ‘নির্ভয়া’কে ধর্ষণ করে নৃশংসভাবে খুন করার অভিযোগে চার দস্যুকে ১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ (শনিবার) ফাঁসির নির্দেশ দিয়ে তা কার্যকর করার দিন ঠিক হয়েছিল। অপরাধীদের মধ্যে তিনজন ভারতের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়েছিল, রাষ্ট্রপতি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল দ্রুত ফাঁসি কার্যকর করার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু হঠাত্ শুক্রবার অর্থাত্ ৩১ জানুয়ারি দিল্লির পাতিয়ালা কোর্টের বিচারক ধর্মেন্দ্র রানা রায় দিয়েছেন—পরবর্তী নির্দেশ না জারি করা পর্যন্ত ফাঁসি স্থগিত থাকবে।
এই রায় শুনে ভেঙে পড়েছেন নির্ভয়ার মা, তিনি বলেছেন—‘বারবার শুধু ওই চারজনের অধিকারের কথা বলা হচ্ছে। আমার মেয়ের কি বেঁচে থাকার কোনো অধিকার ছিল না?’ ৩১ জানুয়ারি দিল্লির দায়রা আদালতে দণ্ডিতদের আইনজীবী আপিল করেন, ১ ফেব্রুয়ারি চারজনের ফাঁসির ও পরে স্থগিতাদেশ জারি করা হোক। তার যুক্তি ছিল, অন্যতম সাজাপ্রাপ্ত বিনয়শর্মা রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের কাছে প্রাণ ভিক্ষার আবেদন করেছেন। রাষ্ট্রপতি এখনো তার সিদ্ধান্ত জানাননি, আরো দুই সাজাপ্রাপ্ত অক্ষয় কুমার সিংহ ও পবন গুপ্তের সামনে ফাঁসির আদেশ চ্যালেঞ্জ করার আইনি পথ খোলা আছে। চার দণ্ডিতের মধ্যে একমাত্র মুকেশ সিংহের সামনেই আর কোনো আইনি পথ খোলা নেই। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী এক অপরাধে সাজাপ্রাপ্তদের মৃত্যুদণ্ড একই দিনে কার্যকর করতে হবে। তাই ১ ফেব্রুয়ারি শুধু মুকেশের ফাঁসি হওয়া সম্ভব নয়। পিছিয়ে দেওয়া হোক চারজনের ফাঁসি। আইনজীবীর সেই আর্জি শুনে তিহার জেল কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট তলব করেন বিচারক রানা। সেই রিপোর্ট পাওয়ার পর ফাঁসি স্থগিত করার রায় দেন তিনি।
গত পাঁচ বছরে উত্তর প্রদেশে মাসে অন্তত ‘নির্ভয়া’ কাণ্ডের মতো বহু ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। পিছিয়ে নেই পশ্চিমবঙ্গ। মাসে তাতে ১০-১২টি এরকম ঘটনা ঘটছে। তারও কোনো বিচার নেই। এবার দেখা যাক নির্ভয়াকাণ্ডের আগে কী ঘটেছিল।
নির্ভয়াকাণ্ডের চার অপরাধীর ফাঁসি কার্যকর করতে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করেছে দিল্লির এক আদালত। আগামী পয়লা ফেব্রুয়ারি, সকাল ৬টায় ঠিক হয়েছে ফাঁসি কার্যকরের নির্ঘণ্ট। তার মধ্যেই ফের একবার সুপ্রিম কোর্টে কিউরেটিভ পিটিশন দাখিল করেছে এক অপরাধী। আরো এক অপরাধী বিনয় শর্মা প্রাণভিক্ষার আবেদন নিয়ে রাষ্ট্রপতির দ্বারস্থ। সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, বৃহস্পতিবার কিউরেটিভ পিটিশন পর্যালোচনা করবে। বুধবার বিনয় শর্মার আইনজীবী এপি সিং বলছেন, ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন জানিয়েছে আমার মক্কেল। আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, অক্ষয় ঠাকুর যেহেতু কিউরেটিভ পিটিশন দাখিল করেছে, তাই ফের পিছোতে পারে ফাঁসির দিনক্ষণ। ওই চারজনের ফাঁসি কার্যকরের দিন প্রথমে চূড়ান্ত হয়েছিল ২২ জানুয়ারি। কিন্তু আইনি জটে সেই নির্ঘণ্ট পিছিয়ে হয় পয়লা ফেব্রুয়ারি। ক্রমাগত ফাঁসি কার্যকরের দিন পিছনোয় সমালোচনার মুখে পড়েছে আইনি ব্যবস্থা। সমাজকর্মী থেকে নির্ভয়ার পরিবারের সদস্যরা মৃত্যুদণ্ড পিছনোর কৌশল বলে মন্তব্য করেছেন। নির্ভয়ার মা আশা দেবীর মন্তব্য, সময় নষ্ট করতে এসব করছে অপরাধীরা।
এদিকে জানা গেছে, অক্ষয় ঠাকুরের আবেদন বদ্ধ ঘরে শুনবে সুপ্রিম কোর্ট। এজলাসে হবে না কোনো শুনানি। সেদিন যদি তার আবেদন খারিজ হয়, সেক্ষেতে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করার পথ খোলা। সেই জটে ফের পিছয়ে ফাঁসির দিন, আশঙ্কা করছেন বিশারদরা। ২০১২ সালের এই ঘটনায় ছয় অপরাধী জড়িত ছিল। যাদের মধ্যে এক জন, অপরাধের দিন নাবালক ছিল। ফলে কিশোর সংশোধনাগারে তাকে তিন বছর কাটাতে হয়েছে। আপাতত সে মুক্ত। মূল অভিযুক্ত রাম সিংয়ের বিচার চলাকালে মৃত্যু হয়েছিল। তিহার জেলে তার ঝুলন্ত মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল।
নির্ভয়া কাণ্ডে মৃত তরুণীর মা জানিয়েছেন, সময় নষ্ট করার জন্য এসব করছে অপরাধীরা। তিনি এর আগে দিল্লি প্রশাসন, রাষ্ট্রপতি এবং সুপ্রিম কোর্টের কাছে আবেদন করেছিলেন যাতে কোনোভাবেই ফাঁসির তারিখ পিছানো না হয়। এক সপ্তাহে কেন্দ্রীয় সরকার সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছিল, যাতে ফাঁসির অপরাধীদের জন্য নিয়ম সংশোধন করা হয়। কারণ, নিয়মের ফাঁক গলে সময় নিচ্ছে অপরাধীরা। তা যাতে না হয় তাই আবেদন করা হয়েছিল।
প্রাণভিক্ষার আর্জি তার টেবিলে পৌঁছনোর পরে একটুও দেরি করেননি রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। জানিয়ে দিলেন, নির্ভয়াকে ধর্ষণ ও খুনের মামলায় অন্যতম দণ্ডিত মুকেশ সিংহের ‘মার্সি পিটিশন’ খারিজ করছেন তিনি। রাষ্ট্রপতির এই সিদ্ধান্তের পরে এ দিনই দিল্লির দায়রা আদালতের অতিরিক্ত বিচারক সতীশ কুমার অরোরা ঘোষণা করেন, আগামী ১ ফেব্রুয়ারি সকাল ৬টার সময়ে ফাঁসি দেওয়া হবে চার অভিযুক্তকে। নির্ধারিত ২২ জানুয়ারির ১০ দিন পরে।
সুপ্রিম কোর্টে আর এক অভিযুক্ত পবন গুপ্ত আবেদন জানিয়েছে যে, ঘটনার সময়ে, ২০১২ সালের ডিসেম্বরে, সে নাবালক ছিল। তাই তার মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করে দেওয়া হোক। এর আগে একই আর্জি জানিয়ে দিল্লি হাইকোর্টে গিয়েছিলেন পবনের আইনজীবী। ১৯ ডিসেম্বর সেই আবেদন খারিজ করে দেয় হাইকোর্ট।
এর পরে পবন বা অন্য দুই দণ্ডিত—বিনয় শর্মা এবং অক্ষয়কুমার সিংহের মধ্যে কেউ যদি রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আর্জি জানায়, তা হলে আরও পিছোবে ফাঁসি। কারণ প্রত্যেক দণ্ডিতকে ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রাণভিক্ষার আর্জি জানানোর জন্য সময় দিয়েছে আদালত এবং নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি যদি তাদের ক্ষমা না-ও করেন, তা হলেও তার সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরে দণ্ডিতদের ফাঁসির আগে ১৪ দিন সময় দিতে হবে। আবার রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আর্জি জানিয়ে দায়রা আদালতে মুকেশের আইনজীবী আবেদন করেন, ফাঁসির দিন পিছিয়ে দেওয়া হোক। কারণ আইনের দিক থেকে দেখলে, রাষ্ট্রপতি মুকেশকে ক্ষমাও করে দিতে পারেন। আজ তাই রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তের পরেই ফাঁসির দিনক্ষণ ঘোষণা করেন দায়রা আদালতের বিচারক। রায় দেওয়ার সময়ে তিনি বলেন, ‘বোঝাই যাচ্ছে, দণ্ডিতের আইনজীবী ফাঁসি পিছোনোর জন্য নিত্য-নতুন ফিকির বার করছেন। এভাবে কত দিন চলবে।’
এদিকে নির্ভয়া মামলার চার অপরাধীদের প্রাণদণ্ডাদেশ কার্যকরে দেরি হওয়ার জন্য তাঁর আম আদমি পার্টির (‘আপ’) সরকারের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে, তা উড়িয়ে দিয়েছেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল বললেন, ‘এ ব্যাপারে আমাদের কোনো ভূমিকাই ছিল না। খাতায়-কলমে আমাদের যা যা করণীয় ছিল, সেই সবই আমরা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে করে দিয়েছি।’ নির্ভয়া মামলার চার অপরাধীর ফাঁসির দেরি হওয়ায় ধর্ষিতার মা আশা দেবী কাঁদতে কাঁদতে দিল্লি সরকারের সমালোচনা করে বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য কেউ কেউ আমার মৃত মেয়েকে নিয়েও খেলছেন।’ সামনে দিল্লি বিধানসভার নির্বাচন। তাই সুযোগটা হাতছাড়া করতে চায়নি বিজেপি-ও। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বিজেপি নেতা প্রকাশ জাভড়েকর বৃহস্পতিবার বলেন, ‘অপরাধীদের ক্ষমাপ্রার্থনার জন্য নোটিশ ধরাতে কেন আড়াই বছর লাগিয়ে দিল দিল্লি সরকার?’
এই সবেরই জবাবে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল এ দিন বলেন, ‘এ ব্যাপারে দিল্লি সরকারের যেটুকু করণীয় ছিল, তা সঠিকভাবেই করা হয়েছিল। আর তা হয়েছিল যথাসময়েও। এই মামলা-সংক্রান্ত কোনো কিছুতেই আমাদের দেরি হয়নি। তবে এ ব্যাপারে দিল্লি সরকারের ভূমিকা তেমন ছিল না বললেই হয়। আমরা চাইছি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চার অপরাধীর প্রাণদণ্ডাদেশ কার্যকর হোক।’
n লেখক: পশ্চিমবঙ্গের প্রবীণ সাংবাদিক
