বর্তমানে দাঁড়িয়ে ভাবিকালের আখ্যান বয়ানই

জলবাসর

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৯:২২

প্রাকৃতিক পরিবেশে অতিপ্রাকৃতিক বা লৌকিক পরিবেশে অলৌকিক প্রতিবেশ তৈরির মাধ্যমে দর্শক সম্মুখে বর্ণনাত্মক রীতিতে উপস্থাপিত এক মঞ্চ আখ্যান নাট্যকার মাসুম রেজার নতুন নাটক ‘জলবাসর’। বাংলাদেশের সাহিত্যপ্রেক্ষিতে পরাবাস্তবতা অতি পরিচিত একটি সাহিত্যব্যবহূত মাধ্যম হলেও জাদুবাস্তবতা খুব পরিচিত নয়। আর আরো এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে নাট্যকার সেলিম আল দীনের নিমজ্জন নাটকের মাধ্যমে সম্মুখ বাস্তবতার যে পরিচিতি তা বোধয় গুটি কয়েক লোকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাই বর্তমানে থেকে ভবিষ্যতের নির্দেশনা থাকা সম্মুখ-বাস্তবতা নির্ভরতা হয়ে ওঠে। বর্তমান ঘটনার কেন্দ্রে শুরু হওয়া একটি অলৌকিক বাস্তবতার মুখোমুখি নাট্যকার দাঁড় করান পোখরাজকে। মন্ডলপুত্র পোখরাজ হারিয়েছে নিজের ছায়া। ছায়া খোঁজার লক্ষ্যে সে ঘোরাঘুরি করতে থাকে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে। ছায়া গিয়ে থিতু হয় বানিয়াকন্যা দোপাটির ঘরে। ছায়া ফিরে পেতে পোখরাজ যখন বানিয়া কন্যাদের বাড়িতে যায় তখন তার নজরে আসে অতিপ্রাচীন এক গাছ। যে গাছ কাটতে এসে প্রাণ হারিয়েছিল তিনজন কাঠুরে। গাছ নিজেই রক্ষা করেছিল নিজেকে। সেই গাছের কাটা ডালে পোখরাজ দেখে বানিয়া কন্যাদের পূর্বজনম আর ভবিষত্ জনমের কথা লেখা। পড়ে ফেলে সেই লেখাগুলো। নাটকের শেষ ভাগে এক এক করে মিলে যায় সেইসব জনমকথা। আর মীনমালা ইয়াকুব মন্ডলের জন্য যুগ যুগ ধরে যে ভবিষত্ দেখে আসছিল তা ব্যবহার করে ইয়াকুব মন্ডল ধরে ফেলেছে নদীর শেষ মাছটাও। স্বপ্নে বানিয়াকন্যা দোপাটির সাথে মিলনের জেরে তার প্রেমে মজে মন্ডলপুত্র পোখরাজ। কিন্তু পোখরাজের এ প্রেম যেন কোনোভাবেই সফল না হয় তাই তাকে নানা  মন্ত্র দিয়ে বশে আনতে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে থাকে মাওলানা মোচন মিস্ত্রিকে। নাট্যাংশে ইয়াকুব মন্ডলের দ্বিতীয় স্ত্রী কণিশলতার অসম প্রেম গড়ে ওঠে তারই কনিষ্ঠ পুত্র আকিক মন্ডলের সাথে। জলবাসরে এই প্রেম মনে করিয়ে দেয় ঈডিপাস কমপ্লেক্সের কথা। আর চোখের সামনে ভেসে ওঠে ইংরেজ ঔপনাসিক ডি এইচ লরেন্সের ‘সানস অ্যান্ড লাভারস’ উপন্যাসের গল্প। এবার নাটকের অন্তর্নিহিত গল্পের কথায় আসা যাক। নাটকে মাওলানা চরিত্রের মাধ্যমে নাট্যকার খুব চমত্কার ভাবেই বর্তমান ধর্মীয় শিক্ষাকে তুলে এনেছেন। তার স্বভাব এবং গালগল্পে বেশ রসময় উপস্থাপন ঘটেছে চরিত্রটির। সেই সাথে আমরা উপলব্ধি করতে পারি আমাদের দেশের মাদ্রাসা শিক্ষার নৈতিকতার মানস। দর্শীর পেটের সন্তানকে পেট চিরে বের করার অনুমতি দেওয়া বা তা স্ত্রী কণিশলতার মৃত দেহ পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া ইয়াকুব মন্ডলের কর্তৃত্ব বা শাসন এক ধরনের পুরুষতান্ত্রিকতার ছাপ বলেই মনে হয়। কণিশলতার সাথে আকিক মন্ডলের অসম প্রেম এবং তার ঔরসে গর্ভবতী হওয়া, পিতার কথার অবাধ্য হওয়া পোখরাজের বাক বিতণ্ডা বর্তমান সামাজিক অবক্ষয়ের নমুনা বলা যায় নিঃসন্দেহে। নদী থেকে মাছ হারিয়ে যাওয়া, নদীতে চর জেগে ওঠা, বৃক্ষ নিধনের মাধ্যমে মানুষের ভাগ্যের বিপর্যয় এ সবই বর্তমানে দাঁড়িয়ে ভবিষতের গণনা। তাই একথাও বলা যায় যে, বর্তমানে দাঁড়িয়ে ভাবিকালের আখ্যান বয়ানই ‘জলবাসর’।

দেশ নাটক একটি সুপ্রতিষ্ঠিত নাটকের দল হওয়ায় এবং নাট্যদলে অনেক নাট্যশিল্পী থাকায় ‘জলবাসর’ নাটকটিতে অভিনেতাগণ দুই দলে ভাগ হয়ে অভিনয় করেছেন। যেটা অনেক দলের জন্যে অসম্ভব এবং দেশ নাটকের সামর্থ্য। আর এই সামর্থ্যকে কাজে লাগিয়েছেন অভিনয় নির্দেশক ইশরাত নিশাত। দলের প্রতিটি অভিনয় শিল্পী দারুন অভিনয় করেছেন তাদের নির্দিষ্ট চরিত্রে। তবে তাদের মধ্যেও জলবাসরের দ্বিতীয় দিনের প্রদর্শনীতে যারা অসাধারণ অভিনয় করে দক্ষতার ছাপ রেখেছেন তারা হলেন— দর্শী চরিত্রে নাজনীন হাসান জোয়ার্দার, দোপাটিতে বন্যা মির্জা, দাওয়া চরিত্রে তামিমা তিথি, লুবাই চরিত্রে সুস্মিতা সাহা, কণিশলতা চরিত্রে সুষমা সরকার আর পোখরাজ চরিত্রে লরেন্স উজ্জ্বল গোমেজ। তবে বিশেষ করে নজর কাড়তে সামর্থ্য হয়েছেন ইয়াকুব মন্ডল চরিত্রে অভিনয় করা ফিরোজ আলম।

নাটকের সব অভিনেতার অভিনয় অসাধারণ এবং নাট্যাখ্যানের বুনন ও সংলাপ দারুন ভাবে দর্শককে মুগ্ধ করে রাখে একথা স্বীকার্য; তবে নাটকের কোরিওগ্রাফি আরো ভালো হতে পারে বলে মনে হয়েছে। সেই সাথে নাটকের লাইট নিয়ে আরো ভাববার আছে বলে মনে হয়। বিশেষ করে নদী পাড়ের দৃশ্য এবং শেষ দৃশে দর্শীকে যখন নদীর পাড়ে মেরে ফেলতে নিয়ে যাওয়া হয় বা মীনমালার পুত্র সন্তান যখন চোরাবালিতে ডুবে মরে। আর একটি বিষয়, নাটকের ছয় মহলা বাড়ির সাথে সেটাকে অনেকটা বেমানান মনে হচ্ছিল। ছয় মহলা কথাটার সাথে যে ঝকমকে ব্যাপারটা জড়িত এ যেন সেই ভাব তৈরি করতে সামর্থ্য নয়। নির্দেশক হিসেবে মাসুম রেজাকে এসব বিষয় নিয়ে আরো ভাবতে হলেও এক কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, সম্মুখ বাস্তবতার আলোকে ‘জলবাসর’ আগামীর নাট্য নির্মাণে নতুনদের প্রেরণা এবং উদাহরণ হবে।

ছবি হামজা আনোয়ার