কেবল অর্থ নহে, খাদ্য অপচয়ে ক্ষতি হয় আরো বড়ো

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:৩২

কিছু অপচয় জীবনেরই অংশ। তবে অপচয়ের সীমা থাকা উচিত। আর আমাদের উচিত সেই সীমা অতিক্রম না করা। বিশেষ করিয়া খাদ্যদ্রব্য অপচয়ের ক্ষেত্রে। কারণ খাদ্য অপচয়কারী বেশির ভাগ ব্যক্তি জানেনই না—পৃথিবীর প্রতি সাত জনের এক জন ঘুমাইতে যায় ক্ষুধার্ত পেটে। ফি বত্সর পাঁচ বত্সরের কম বয়সি ২০ হাজার শিশু জঠরের বহ্নিজ্বালা সহ্য করিতে না পারিয়া বিকশিত হইবার পূর্বেই এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করিতে বাধ্য হয়। প্রতি ১০ জন নারীর মধ্যে সাত জনই ভোগেন অপুষ্টিজনিত রক্তাল্পতায়! সম্প্রতি জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এক প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, বিশ্বের উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলিতে প্রতি বত্সর যেই পরিমাণ খাবার নষ্ট হয় তাহাতে অর্থনৈতিক ক্ষতি হইতেছে প্রায় ১ লক্ষ কোটি ডলার। ইহার মধ্যে শিল্পোন্নত দেশগুলির বত্সরে ৬৮ হাজার কোটি ডলার ক্ষতি হইতেছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ম্যাক্স রোসার ও হানা রিটশি সর্বশেষ তথ্য উল্লেখপূর্বক জানাইয়াছেন যে, বিশ্বের ৬৯ কোটি লোকের খাদ্য একেবারেই সুরক্ষিত নহে। তাহা ছাড়া ১৮০ কোটি মানুষের খাদ্য সুরক্ষা মাঝারি স্তরে রহিয়াছে। এফএও বলিতেছে, সারা বিশ্বে যেইখানে অন্তত ৮২ কোটি মানুষ রাত্রে না খাইয়া ঘুমাইতে যায়, সেইখানে প্রায় ২০০ কোটি মানুষ অতিরিক্ত খাবার খাইয়া খুব মোটা হইয়া গিয়াছেন। পরিসংখ্যানে দেখা যাইতেছে, উচ্চ আয়ের দেশসমূহেই খাদ্যগ্রহণের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপচয় বেশি হইয়া থাকে। অর্থাত্ বিষয়টি মানসিকগত একধরনের অভ্যাস।

খাদ্য অপচয়ের নেপথ্যে রহিয়াছে শিল্পোন্নত বাজার-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও। ফসলের বাজারমূল্য পতনের আশঙ্কায় প্রায়শই উত্পাদিত ফসলের একটা বৃহত্ অংশ জমিতেই ফেলিয়া রাখা হয়। সারা বিশ্বে মোট যেই পরিমাণ খাদ্য উত্পাদিত হয় তাহার জন্য লাগে ২৫ শতাংশ বাসযোগ্য জমি। আমরা যেই পরিমাণ পানি ব্যবহার করিয়া থাকি তাহার ৭০ শতাংশই লাগে খাদ্য উত্পাদন করিতে। যেই পরিমাণ অরণ্য ধ্বংস হয় তাহার ৮০ শতাংশই খাদ্য উত্পাদনের কারণে। খাদ্য উত্পাদন প্রক্রিয়ায় নির্গত হয় বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য দায়ী গ্রিনহাউজ গ্যাসের ৩০ শতাংশ। তবে আশার কথা হইল, বিশ্বনেতারা বিষয়গুলি লইয়া ভাবিতে শুরু করিয়াছেন। কিছুদিন পূর্বে মলদোভায় বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ইউরোপ আর মধ্য এশিয়ার আঞ্চলিক দপ্তরে এই বিষয়ে বিশেষ আলোচনা হয়। ঐ আলোচনায় ধনী দেশগুলি খাদ্য নষ্ট করা রোধ করিতে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা তৈরি করিতে সম্মত হইয়াছেন। অনেক দেশই খাবার নষ্ট প্রতিরোধে ব্যবস্থা লইতেও শুরু করিয়াছে। চার বত্সর পূর্বে ইতালি খাবার নষ্ট রোধ করিতে আইন করিয়াছে। বিক্রি না হওয়া খাবার ব্যবসায়ীরা ফেলিয়া না দিয়া দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলিকে দান করিতে বলা হইতেছে। ফ্রান্সও একই রকম আইন পাশ করিয়াছে ২০১৭ সালে।

স্পষ্টতই খাদ্য অপচয়ে কেবল অর্থ নহে, ক্ষতি হয় আরো বড়ো। এই জন্য বাংলাদেশেও নগরাঞ্চলে খাবার নষ্ট করিবার পরিবর্তে তাহা অভাবী মানুষের নিকট পৌঁছাইয়া দেওয়ার সামাজিক আন্দোলন গড়িয়া তোলা প্রয়োজন। এই ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের যেমন দায়িত্ব রহিয়াছে, তেমনি প্রত্যেক মানুষকেও নিজ নিজ অবস্থান থাকিয়া যত্নশীল হইতে হইবে।