ডা. ফাহমিদা ফেরদৌস
প্রতি বছর একুশ আসে আমাদের নতুন চেতনা, অঙ্গীকার এবং মাতৃভাষার নতুন অধ্যায় নিয়ে। মাতৃভাষা যেকোনো ব্যক্তির, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। মানবশিশু মাতৃগর্ভে থাকাকালেই তার মায়ের ভাষার শ্রবণক্ষমতার প্রতি সংবেদনশীল হয়ে থাকে, মাতৃগর্ভে বেড়ে ওঠার সময়ই মায়ের গর্ভের ভেতরে ও বাইরের শব্দ সে শুনতে পায়। ফলে এই শিশু জন্মকালেই তার মায়ের ভাষার ধ্বনিতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া, বিশেষ করে এই ভাষাটি সম্পর্কে অল্পবিস্তর পরিচিত থাকে। এই প্রক্রিয়ার কারণে যেকোনো নবজাতক জন্মগ্রহণের পর মাতৃগর্ভে থাকাকালে যে ভাষার ধ্বনি শুনেছে এবং শোনে তা-ই হয়ে থাকে একটি শিশুর মাতৃভাষা। আর এই কারণে মাতৃভাষার প্রতি থাকে যেকোনো জাতির আবেগ, অহংকার, চেতনা ও সীমাহীন ভালোবাসা।
আমরা যদি ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাই তাহলে দেখব আমাদের মাতৃভাষা বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দাবিতে সংঘটিত গণ-আন্দোলনের ইতিহাসের শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। ‘বাংলা ভাষা’কে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে যখন ক্ষোভে উত্তাল রাজপথ তখন ছাত্রসমাজ, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, চিকিত্সক এবং বাংলা ভাষাভাষী সব শ্রেণির জনগণ নেমে এসেছিল রাজপথে, তখন আওয়ামী লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক দলের প্রতিনিধিদের সভায় গঠিত হয় ‘সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’। তখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের হোস্টেল, যা ব্যারাক নামে পরিচিত ছিল (বর্তমানে শহিদ মিনার অবস্থিত) তা ছিল ভাষা আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র এবং ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি যখন হাজার হাজার ছাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমবেত হন এবং ছাত্ররা পরবর্তী সময়ে ১৪৪ দ্বারা ভঙ্গ করে নেমে আসেন রাজপথে, তখন বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন সালাম, রফিক, শফিকসহ নাম না জানা আরো অনেক ভাষাশহিদ এবং কারা বরণ করেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র এম আই শহীদ, আবু সিদ্দিক, আলী আজগর, জসিমুল হক ও ফরিদুল হক। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন কর্নেল রোকেয়া আনিস (গাইনি ও অবস্) সিএমএইচ এবং শহিদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরী বাংলা বর্ণমালার ধ্বনির উচ্চারণকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
২১শে ফেব্রুয়ারি, শহিদদের রক্তে রঞ্জিত রাজপথ, থমথমে সারা বাংলাদেশ, তখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্ররা সিদ্ধান্ত নিলেন যে, শহিদদের রক্তে রঞ্জিত স্থানে একটি মিনার স্থাপন করবেন। তখন এই জায়গাটি নির্ধারিত ছিল হাসপাতালের নির্মাণকাজের জন্য ফলে সে জায়গাটি সংরক্ষিত করে রাখা হয়েছিল। ইট, বালু ও সিমেন্ট নিয়ে সূর্যাস্তের পর ছাত্ররা ১২ নম্বর ব্যারাকের ৬ নম্বর রুম এবং হোস্টেলের পূর্ব পাশের গেটের মধ্যবর্তী এক জায়গায় মিনারটি স্থাপন করেন।
আমাদের ভাষা আন্দোলনের পরিণতি ছিল সুদূরপ্রসারী। বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন এখানেই শেষ হয়নি। বাংলা ভাষা (মাতৃভাষা) বাঙালিদের ভালোবাসা, গর্ব অহংকার, অস্তিত্ব। পরবর্তী সময়ে ‘২১শে ফেব্রুয়ারি’কে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।
‘চিকিত্সা ভাষাবিজ্ঞান’ বাংলা ভাষার আরেকটি নতুন উন্মেষদ্বার, সেখানে ‘অটিজমসহ ভাষা বৈকল্য রোগীদের নিয়ে শুরু হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণামূলক কার্যবিধি। মানসিক/মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা ও ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ভাষাবিদরা, বাংলাদেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী ভাষা-বৈকল্য রোগীদের সেবা প্রদানে কাজ করে যাচ্ছে সব সময়।
n লেখক :মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও চিকিত্সা ভাষাবিদ,
সহকারী অধ্যাপক (মনোরোগ বিদ্যা বিভাগ),
জেড এইচ সিকদার ওমেন্স মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, ঢাকা।
