বাড়িটায় কে যেন থাকে

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৯:৪৫

মনজু।

ডাক শুনে আমি একটু চমকালাম। কে ডাকল? এরকম নির্জন জায়গায় কে ডাকবে আমাকে? এতক্ষণ মাঠের ওপর দিয়ে হেঁটে এসেছি। দুদিকে শুধুই ফসলের মাঠ ছিল। মাঠের মাঝখান দিয়ে রিকশা চলার মতো পথ। দুয়েকটা রিকশা এল গেল। আমি আসছিলাম হেঁটে হেঁটে। বাস থেকে নেমেছি রতনপুর বাসস্ট্যান্ডে। চৈত্রমাসের বিকেলটা বড় ভাল লাগছিল। রিকশা না নিয়ে হেঁটেই রওনা দিলাম। কাঁধে হালকা ধরনের ব্যাগ। পরনে জিনস টিশার্ট। পায়ে হালকা ধরনের স্নিকার। ঘণ্টাখানেকের পথ সোনাতলা গ্রাম। আমার ছোটফুফুর বাড়ি। বহুদিন পর ফুফুর বাড়ি বেড়াতে এলাম। হাঁটতে ভাল লাগছে।

মাঠ পেরুবার আগেই সন্ধ্যা হয়ে গেল। খোলা জায়গায় অন্ধকার জমতে সময় লাগে। সূর্য ডোবার পরও অনেকটাক্ষণ আলোকিত ভাব থাকে। গ্রামে ঢোকার আগেই সেই ভাব মিলিয়ে গেল। ভাল রকম অন্ধকার চেপে এল চারদিক থেকে।

দূর থেকেই দেখেছিলাম গ্রামে ঢোকার মুখে সেই ধসে পড়া জমিদার বাড়ি। হাতের বাঁদিকে নানা রকমের গাছপালা আর বাঁশঝাড়ের ফাঁকে দেখা যাচ্ছিল বহু বহু বছরের পুরনো ধসে পড়া দালানের মাথা। ডানদিকে ফসলের মাঠ। জমিদার বাড়ি ঘেষে রাস্তা। সেই রাস্তায় ঢোকার আগেই ঘোরতর অন্ধকার।

অন্ধকারে ভয় পাবার কিছু নেই। সঙ্গে টর্চ নেই, মোবাইল তো আছে। মোবাইলই এখন টর্চের কাজ দেয়। তাছাড়া ডরভয় আমার একটু কমই। ভূত প্রেতে বিশ্বাস করি না। চোর ডাকাত বা ছিনতাইকারিরা যদি ধরে তাহলেই বা ক্ষতি কী করবে? ব্যাগে দুচারটা জামাকাপড় আছে, সঙ্গে কিছু টাকা আর মোবাইল। আমি ঘড়ি পরি না। এখন ঘড়ি পরার দরকার হয় না। মোবাইলেই টাইম দেখা যায়। নিলে মোবাইল আর টাকাগুলো নেবে। দিয়ে দেব।

মনজু, ও মনজু।

প্রথমবার একটু যেন আবছা মতো শুনেছিলাম ডাকটা, এবার একদম স্পষ্ট। পরিষ্কার আমার নাম ধরে ডাকল। এবং ডাকটা এল জমিদার বাড়ির ভিতর থেকে। নারীকণ্ঠের ডাক। আওয়াজটা মিহি ধরনের। সুন্দর।

কাছে কোথাও কেউ নেই। খা খা নির্জন চারদিক। সোনাতলা এখনও মিনিট কুড়ির পথ। এরকম নির্জন জায়গায় কে ডাকবে আমার নাম ধরে?

কে?

সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির ভিতর থেকে সাড়া এল। আমি বাবা, আমি।

কে আপনি?

ভিতরে আসো বাবা। এলেই দেখতে পাবে।

মোবাইলের আলো ফেলে ফেলে বাড়ির ভিতরে ঢুকলাম। ঝোপঝাড় আগাছায় ভর্তি বাড়ি। ভাঙা দালানের একটা দিকে দেখি হারিকেন জ্বলছে টিমটিম করে। সাদা শাড়ি পরা এক মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন হারিকেনের সামনে। মাথায় ঘোমটা দেওয়া। মুখটা দেখা যায় না। বুঝতে পারলাম তিনিই আমাকে ডেকেছেন?

এগিয়ে গেলাম। আপনি আমাকে চেনেন?

চিনি বাবা। তুমি মনজু। সোনাতলা গ্রামে তোমার ছোটফুফুর বাড়ি। তোমার ফুফা ফুফুকেও আমি চিনি। তাদের ছেলেমেয়েদেরও চিনি। তোমার ফুফুর নাম ফরিদা।

জি। ফুফুর নাম ফরিদা। কিন্তু আপনি এই বাড়িতে কী করছেন? এই বাড়িতে তো কেউ থাকতো না।

আমি থাকি। তবে ইচ্ছা করে থাকি না বাবা। আমাকে আটকে রেখেছে।

কে আটকে রেখেছে?

জমিদার বাবু। বহু বছর ধরে আটকে রেখেছে। তুমি আমাকে মুক্ত করো বাবা। দরজাটা বাইরে থেকে তালা মারা। তালাটা ভাঙো। দরজাটা খুলে দাও। আমি বেরিয়ে আসি।

কোথায় তালা? কোথায় দরজা? আপনি তো খোলা জায়গায়ই দাঁড়িয়ে আছেন...

আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই দমকা একটা হাওয়া এল। হারিকেনটা উল্টে পড়ে নিভে গেল। আমি মোবাইল জ্বাললাম। আরে ভদ্রমহিলা গেলেন কোথায়?

ভিতরে ঢুকে এদিক ওদিক মোবাইলের আলো ফেলে তাঁকে খুঁজতে লাগলাম। কোথায় আপনি? কোথায় গেলেন?

সাড়া নেই। তাঁকে আর খুঁজেই পেলাম না। চারদিকে ঝিঁ ঝিঁ ডাকছে। গাছপালায় হাওয়ার শব্দ। বাঁশঝাড় শন শন করছে।

এবার আমার গা কাঁটা দিল। ব্যাপারটা কী? ভদ্রমহিলা কি ভদ্রমহিলা নন? আর ওই যে বললেন জমিদার বাবু তাঁকে আটকে রেখেছেন! সোনাতলার এই জমিদারের নাম ছিল প্রাণগোপাল রায়চৌধুরী। তাঁর আমল শেষ হয়ে গেছে দেড় দুশো বছর আগে। মহিলা কি তাহলে দেড় দুশো বছর ধরে বন্দি হয়ে আছেন?

আর কিছু ভাবতেই পারি না। বুঝে গেলাম কী ঘটেছে আমার সঙ্গে। তারপরও সাহস হারালাম না। প্রায় দৌড়ে এলাম বাকিটা পথ। তবে ফুফুর বাড়ির কাউকেই ঘটনা বললাম না।

রাতেরবেলা ব্যাপারটা নিয়ে খুব ভাবলাম। ছোটফুফুর বাড়িতে এলাম অনেক বছর পর। দশ এগারো বছর হবে। কারণ হল ফুফা ফুফু প্রায়ই ঢাকায় যান। ওঠেন আমাদের ফ্ল্যাটে। তখনই দেখা সাক্ষাত্ হয়। এজন্য তাঁদের গ্রামের বাড়িতে আর আসা হয় না। এবারও আসা হত না, হল সামুর জন্য। সামু হচ্ছে ফুফুর ছোটছেলে। এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ পেয়েছে। এখন ঢাকায় গিয়ে নামকরা কোনও কলেজে ভর্তি হবে। আমারও সেমিস্টার গ্যাপ চলছে। সামু ফোনে বলল, কয়েকদিন আমাদের এখানে এসে থেকে যাও। খুব ঘুরব, আড্ডা দেব, গল্প করব। আমার বন্ধু শামিম আর টিপুও থাকবে। চারজনে বেশ জমবে।

এই লোভে এসেছি।

দশ এগারো বছরে এলাকাটা অনেক বদলেছে। পল্লীবিদ্যুত্ তো এখন ঘরে ঘরে। দেশের প্রতিটি গ্রামে বিদ্যুত্ পৌঁছে গেছে। সুতরাং গ্রামে সেই আগের মতো হারিকেন আর কুপিবাতির ব্যবহার বলতে গেলে নেই। কোনও কোনও গ্রাম তো প্রায় শহর।

তবে সোনাতলা শহর হয়ে ওঠেনি। বিদ্যুত্ আছে অনেক বাড়িতেই। গাছপালা ঝোপজঙ্গল বেশি বলে, মাঠ পুকুর বেশি বলে এখনও অনেকটাই গ্রামের পরিবেশ আছে। এই তো রাতেরবেলা ঝিঁঝিঁর ডাকে কান ঝালাপালা হচ্ছে।

জমিদার বাড়িটা গ্রামের বাইরের দিকে। গ্রাম থেকে কিলোমিটার খানেক দূরে। ওদিকে রতনপুর থেকে সোনাতলায় ঢোকার দেড় দুকিলোমিটার মতো মাঠের উপর দিয়ে আসতে হয়। সব মিলিয়ে ওদিকটা নির্জন, নিরিবিলি।

জমিদার বাড়ি নিয়ে অনেক ঘটনা প্রচলিত আছে। এই ধরনের ধসে পড়া জঙ্গুলে বাড়ি নিয়ে যেমন থাকে আরকি। জ্যোত্স্না রাতে সাদা শাড়ি পরা কাকে নাকি ঘুরতে দেখা যায়। রাতেরবেলা কিংবা নির্জন দুপুরে, সন্ধ্যায় একা কেউ বাড়ির ওদিকটায় গেলে তার নাম ধরে নাকি ডাকে এক নারীকণ্ঠ। এসব আমি শুনেছি। বয়স কম ছিল। বিশ্বাস করেছি। বড় হওয়ার পর মোটেই বিশ্বাস করি না। এবার সোনাতলায় আসার সময় জমিদার বাড়ির কথাটা আমার মনেও হয়নি। বাড়ির কাছাকাছি আসার পরও কিছু মনে হয়নি। নারীকণ্ঠ নাম ধরে ডাকল। দ্বিতীয়বার ডাক শুনে বাড়িতে ঢুকলাম। তার পরের ঘটনা বিস্ময়কর। আমার জীবনে না ঘটলে আমি বিশ্বাসই করতাম না।

এমন ঘটনা কি সত্যি সত্যি ঘটে?

পরদিন সকালবেলা সামুর বন্ধু দুজন এল। শামিম আর টিপু। একই গ্রামের, একই বয়সি। ওরাও এসএসসি দিয়েছিল। সামুর মতো ভাল রেজাল্ট হয়নি। এজন্য ঢাকায় যাবে না। রতনপুর কলেজেই পড়বে। তাছাড়া ঢাকায় থেকে পড়াশোনার খরচ ইত্যাদিরও সমস্যা আছে। গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই গরিব। আমার ফুফা আর দুয়েকজন আছেন যাঁরা অবস্থাপন্ন। তবে ফুফা, হাসেম হাওলাদার প্রচুর জায়গা সম্পত্তির মালিক। বাজারে অনেকগুলো দোকান আছে, ধান চালের আড়ত আছে। ফুফার নগদ টাকাও আছে যথেষ্ট।

বাড়িটায় কে যেন থাকে

ইমদাদুল হক মিলন

প্রচ্ছদ  :ধ্রুব এষ

প্রকাশকাল :ফেব্রুয়ারি ২০২০

প্রকাশক : কথাপ্রকাশ

দাম : ২০০ টাকা