চাকরিজীবনের স্মৃতি

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৯:৪৯

চাকরির স্মৃতিকথা যখন, তখন একেবারে শুরু থেকেই, মানে চাকরি পাওয়া থেকে শুরু করি। চাকরি পাওয়ার আগ পর্যন্ত আমার পেশা হিসেবে গৃহিণীই সবচেয়ে পছন্দের বিষয় ছিল। স্বপ্ন দেখতাম কীভাবে সংসার সাজাব, কীভাবে একজন আদর্শ গৃহিণী হব। শ্বশুরবাড়ির লোকজন আমাকে মাথায় তুলে নাচবে এইরকম। শ্বশুরবাড়ি মানে সত্যিকারের শ্বশুরবাড়ি, টোনাটুনির সংসার নয়; দেবর ননদ, শ্বশুর-শাশুড়ি নিয়ে একেবারে জমজমাট সংসার। আমার সেই স্বপ্নে চাকরির চ’ও ছিল না।

কথা ছিল অনার্স পরীক্ষা শেষ হলেই মহাধুমধামে না হোক সাধ্যমতো হৈচৈ করে আমার বিয়ে হবে। আমাদের বাসায় শেষ বিয়ে আর উনাদের বাসার প্রথম বিয়ে। হালকা পাতলা কেনাকাটা শুরু হয়েছে, পঞ্জিকা-টঞ্জিকা দেখা হচ্ছে, এই সময় বিনামেঘে বজ্রপাত ঘটল। আমার অনার্স পরীক্ষার রেজাল্ট বের হলো। নিজেকে সুদ্ধ হতবাক করে আমি ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে নিজের বিয়ের বারোটা নিজেই বাজিয়ে দিলাম। ঐ আমলে, মানে ১৯৮২ সালে আর্টস ফ্যাকাল্টিতে ফার্স্ট ক্লাস ছিল অনেকটা ডুমুরের ফুল বিশেষ। এমন রেজাল্ট পেয়ে সবাই খুশি হয়, আমি লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদি। কারণ শ্বশুরমশাই ঘোষণা করে দিয়েছেন, এক বছরের আগে বিয়েশাদির কথা মুখেও আনা যাবে না, খবরদার! আগে ওর পড়া শেষ হোক, তারপর বিয়ে। এর মধ্যে কেউ ওকে ডিস্টার্ব করবে না।

রাগের চোটে আমি পড়ার বই সব চাঙে তুলে রাখলাম। ঠিকমতো ক্লাসও করি না। মনে-মনে ঠিক করলাম ফেল করে বুড়াকে শিক্ষা দিতে হবে। কথাগুলো লিখলাম একারণে যে কতটা ইমম্যাচুরড আর অকালকুষ্মাণ্ড ছিলাম, সেটা বোঝাতে। মনে-মনে ভাবলাম একটা বছর কেটে যাবে যা হোক। কিন্তু সব সময় যে বলি, নন্দলালের মন্দ কপালখানি আমারই, সেকি এমনি এমনি! আমাদের এক মামা (ইনকামট্যাক্স ক্যাডারের, নাম মতিয়ুর রহমান, অতিরিক্ত সচিব হিসেবে অবসরে গেছেন), উনি থাকতেন দোতলায়। তখনকার দিনে আত্মীয়তার, প্রতিবেশীদের বন্ধন অনেক দৃঢ় ছিল। নিয়মিত যাওয়া-আসা হতো। দাওয়াত পানি হতো উত্সবে-পার্বণে। এর আগে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় মাত্র তিনমাস পড়ে আমার মিরাকল রেজাল্টের সাক্ষী উনি হয়েছিলেন। সেই থেকে তার এই ভুল ধারণা হয়েছিল, আমি না-জানি কী একজন বাক্কারে বাক্কা ছাত্রী। উনি আমার আম্মাকে বললেন, ‘আপনার এই মেয়েকে বিসিএস দেওয়ান, দিলেই পাস করবে।’ আম্মা বলেছিলেন, ‘মোটে পড়তেই চায় না, রাজি হবে না।’ উনি বললেন, ‘বুঝিয়ে শুনিয়ে রাজি করান, খালি বলবেন প্রত্যেক পরীক্ষায় সাদা খাতা দিলেও যেন অ্যাবসেন্ট না থাকে। প্রেজেন্ট লিখে যেন আসে। এবার যদি পাস নাও করে, তবুও অভিজ্ঞতা হবে। ৮২ ব্যাচের পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে পত্রিকায়। ফরম আনান।’

বাসায় এসে আম্মা বলামাত্র আমি একেবারে বোমার মতো ফাটলাম। মনে তো বিয়ে পেছানোর রাগ ছিলই, সারাজীবন পড়া থেকে রেহাই পেতেই বিয়ে করার এত উত্সাহ আমার, আর সেই আমাকেই কিনা পড়ার ওপর পড়া! কত বড় অবিচার! সব বোন বিয়ের পর গ্র্যাজুয়েশন করেছে, আর আমার বেলাতেই কিনা উল্টো চলন! (অবশ্য বোনগুলা সবক’টা সুন্দরী ছিল, আমার একেবারে বিপরীত, তাইতো বিএ পাসের বেড়া ডিঙানোর আগেই আসল বিয়ে পাস করতে হয়েছে তাদের, সবক’টা আমার চাইতে মেধাবীও ছিল বেশি।)

আমি একেবারে ভালোমতো বেঁকে বসলাম। যদি কেউ একটু ধমক দিত তাহলে বেশ গোঁ ধরে থাকা যেত। সবাই জানে আমি কাঠগোঁয়ার নাম্বার ওয়ান। আম্মা ধরলেন অন্য রাস্তা। নিজের পেটের মেয়েকে উনার চাইতে আর কে বেশি চিনবে! ইমোশনাল ব্ল্যাকমেলের রাস্তা ধরলেন, ‘বাবা বাছা’ করে একাকার। পা ধরতেই শুধু বাকি রেখেছিলেন, বললেন ফেল করলেও কেউ কিছু বলবে না। মা যদি এমন করে, তবে সন্তানের পক্ষে সেটা না-মেনে থাকা যায় না। তার ওপর আমি ভাবলাম, বিসিএসে ফেল করব এ তো জানা কথাই, এমএ-তেও ফেল, অজুহাত হিসেবে বলা যাবে দুই পরীক্ষা একসাথে দিতে গিয়ে ফেল। দিব্যি ফাঁকিজুকি দিয়ে দিন কাটাতে লাগলাম। সেপ্টেম্বরের শেষে আমার এমএ পরীক্ষা, চলবে অক্টোবরের শেষ নাগাদ। বিসিএস শুরু অক্টোবরের চার তারিখে, এক তারিখে আবার ঈদ-উল-আজহা।

কে ফরম এনেছিল জানি না। আমাকে পূরণ করতে বলাতে গরম চোখে তাকালাম। তাতে আম্মা আর ইন্টারমিডিয়েট-পড়ুয়া ছোটভাই সেটা পূরণ করতে বসল। আমি পড়ার টেবিলে বসে উদাস নয়নে দেখতে লাগলাম; ভাবখানা এমন, তোমাদের ছাগল (বিসিএস পরীক্ষা) লেজে কাটো আর গলায় কাটো আমার কী! অপশনাল সাবজেক্টও তারাই বাছাই করলেনু হোম ইকনোমিকস, পলিটিক্যাল সায়েন্স আর সমাজকল্যাণ। কিচ্ছু বললাম না। ফেলই যখন করছি তখন আর সাবজেক্ট নিয়ে ভেবে কী হবে! এই ছিল আমার মনোভাব।

ফ্যাঁকড়া বাধল ক্যাডার চয়েসের বেলায়। দুইজনেই সমান অজ্ঞ এ ব্যাপারে, আমিও কিছু জানি টানি না। (এই ফাঁকে বলে রাখি, পরিবারের সবাই টেকনোক্র্যাট, আমার পরিবারে একমাত্র আমিই ব্যুরোক্র্যাট।) অনেক ভেবেচিন্তে ইনফরমেশন ক্যাডারে রেডিও টিভির অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর পোস্ট দেখে দুইজনে ভাবলেন, অনেক বিরাট পোস্ট, ঐটার স্থান হলো একনম্বরে। আর প্রশাসন ক্যাডারের স্থান হলো দশ নম্বরে, কারণ সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট অবলিক সার্কেল অফিসার লেখা ছিল। আমার সহজ সরল গৃহবধূ মা তার প্র্যাক্টিকেল অভিজ্ঞতায় দেখেছেন, পাকিস্তান আমলে মফস্বলে আব্বার পোস্টিং থাকাকালে যখন অফিসারদের পার্টি হতো, তাতে সার্কেল অফিসারদের ডাকা হতো না, ওটা ছিল সেকেন্ড ক্লাস গেজেটেড পোস্ট। পাকিস্তান আমলে এইসব বাড়াবাড়ি বেশ ছিল। বেচারি মা কোত্থেকে জানবেন যে ওটাও এখন প্রথম শ্রেণির, না হলে বিসিএসে স্থান হতো না। কাজেই মেয়েকে সার্কেল অফিসার বানানোর কোনো ইচ্ছা তার ছিল না। আর আমি মনে-মনে ভাবলাম, যতখুশি জিলাপি পেঁচাও, প্রিপারেশন ছাড়া পরীক্ষায় পাস আর করতে হচ্ছে না। আর অক্টোবরের এখনও ছয়-সাত মাস দেরি। ততদিনে সবাই ভুলে যাবে। আমাকেও আর পরীক্ষা দিতে হবে না। আমার ভাবনামতোই সব এগুচ্ছিল, কিন্তু সেই-যে বলে না কপালে গেঁড়ো থাকলে ঠেকাবে কে? এ হলো সেই বৃত্তান্ত। সেটা যথাসময়েই বলব।

বাসায় সবার আগে পত্রিকা দখল করতাম আমিই। পড়া না-হওয়াতক কাউকে দিতাম না। একদিন পত্রিকায় দেখি বিসিএস পরীক্ষার রুটিন ছেপেছে। আলগোছে সেই পাতাখানি গায়েব করে ফেললাম। আব্বা পত্রিকার আংশিক খুঁজে না পেয়ে সবাইকে বকে তুলোধুনো করলেন, নিরীহ মুখ করে শুনলাম। সবার সাথে খোঁজাখুঁজিতে হাত লাগালাম, কিন্তু কেউ জানতেই পারল না আসল খবর। এদিকে আমার পরীক্ষা শুরু হয়েছে, এমএ পরীক্ষা, মরণকালে হরিনামের মতো দাঁত কিড়মিড় করতে করতে পড়তে বসি, পরীক্ষা দিই। বাসার সবাই বিসিএসের কথা ভুলেই গেছে, আমিও হাঁফ ছেঁড়ে বেঁচেছি।

এরমধ্যে ঈদ এসেছে। ঈদ এলেই আমাদের দুই বাসায় এবং ভাড়াটে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে দাওয়াত খাওয়া হতো দুই-তিন দিন ধরে। একেকদিন একেক বাসায়। তিন তারিখ রাতের বেলা সিরিয়াল পেয়েছেন আমার সেই মামা। মামি সুগৃহিণী ছিলেন, খুব ভালো রান্না করতেন। রাত আটটা নাগাদ সবাই দোতলায় গেছি খেতে। মামা আমাকে দেখা মাত্র বলে উঠলেন,

ুকী পুষ্প! তোমার প্রিপারেশন কেমন হয়েছে?

আম্মা চমকে গিয়ে বললেন,

ুকিসের প্রিপারেশন?

ুকেন? কাল চার তারিখ না! কাল থেকে বিসিএস পরীক্ষা শুরু।

আম্মা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,

ুতোকে খেতে হবে না, যাওয়ার সময় নিয়ে যাব। এক্ষুনি গিয়ে পড়তে বোস্।

যেমন মামার দিকে রাগ উঠেছিল তেমনি আম্মার দিকে, কালকের দিনটা পার হলেই তো বেঁচে যাচ্ছিলাম। রাগের চোটে গোঁয়ারের মতো বললাম,

ুনা, আমি খেয়েই যাব। আর কী পড়ব? রুটিন তো জানি না!

মামা বললেন,

ুপ্রথম পরীক্ষা বাংলা নয়তো ইংরেজিই হবে হয়তো। ও ওটা এমনিতেই পারবে। এতদিন যখন পড়েনি, একবেলা পড়ে আর কী হবে! খেয়েই যাক।

ঘুমের গাধা ছিলাম, রাত দশটায় শুয়ে পড়তাম আর আটটার আগে কখনোই উঠতাম না। বাসায় এসে দীর্ঘশ্বাস ফেলে খুঁজে পেতে অ্যাডমিট কার্ড বের করলাম। সিট পড়েছে টিচার্স ট্রেনিং কলেজে। তারপর ঘুমিয়ে গেলাম।

সকালে উঠে দেখি আব্বা রেডি, আমাকে নিয়ে যাবেন। তখন গেন্ডারিয়া থেকে নতুন ঢাকায় আসতে আলাউদ্দিন রোড বংশাল হয়ে যেতে হতো। একঘণ্টার ওপরে সময় লাগত, জ্যাম লাগলে আরও বেশি। তাই দশটার পরীক্ষা ধরবার জন্য আটটায় যাওয়া লাগত। রেডি হয়ে ভ্যাবলার মতো রুটিন টুটিন না-জেনেই গেছি পরীক্ষা দিতে।

আমাকে পৌঁছে দিয়ে আব্বা অফিসে চলে গেছেন। হল খুঁজে বের করলাম। অনেকেই এসে পরিচয় করল। আমার পেছনে এক ডাক্তার, সামনে ইঞ্জিনিয়ার, ডানে অ্যাকাউন্টসের একজন, বামে দেয়াল। এই তিনজনের সাথে প্যাক্ট করলাম, আমি যা পারব সেটা তাদের বলব, আর আমি যেটা না পারব সেটা উনারা আমাকে বলে দেবেন। একটু নিশ্চিন্ত হলাম।

প্রথম পরীক্ষা একশো নাম্বারের। বাংলা রচনা একটা। আমার তো আর পাস-ফেলের ভয় নেই, কাজেই যা মনে আসে হাতি ঘোড়া লিখে খাতা জমা দিতে গেলাম। পরীক্ষক আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন, তারপর বললেন, লেখা শেষ? আমি মাথা হেলিয়ে জানালাম শেষ। উনি বললেন, যান রিভিশন দেন গিয়ে। এই জিনিসটা কোনোকালে কোনো পরীক্ষায় করতাম না। ভীষণ বিরক্তি লাগত। পড়া জিনিসটাই বিরক্ত লাগত, যেনতেন প্রকারে তার হাত থেকে মুক্তি পেলেই খুশি হতাম। কাজেই আমি বললাম,

ুরিভিশন লাগবে না। জমা নেন।

ুদু ঘণ্টার আগেতো বের হতে পারবেন না। ঘণ্টা পড়ুক আগে।

অগত্যা সিটে ফিরে বসে বসে তামাশা দেখতে লাগলাম, কীভাবে এক-এক জন জানপ্রাণ দিয়ে লিখে চলেছে। দুই ঘণ্টা পড়লে বের হতে পারলাম। তখন কীভাবে মনে নেই আমি পরীক্ষার রুটিন জোগাড় করলাম। বিকেলে সেকেন্ড পেপার বাংলা গ্রামার। পরদিন ইংরেজি।

বাসায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা। এসেই আমি গোঁ ধরলাম, আমার ইন্টারমিডিয়েট লেভেলের ইংরেজি গ্রামার বইয়ে হবে না, অনার্স লেভেলের গ্রামার বই লাগবে। না হলে আমি পরীক্ষাই দেব না। দুই বাসা লণ্ডভণ্ড করে গ্রামার বই খোঁজা চলল, পাওয়া গেল না। আমি নিশ্চিন্তমনে ঘুরতে লাগলাম, কাল আর পরীক্ষা দিতে হচ্ছে না। ...

চাকরিজীবনের স্মৃতি

জিকরুর রেজা খানম

প্রচ্ছদ :শফিক শাহীন

প্রকাশকাল :ফেব্রুয়ারি ২০২০

প্রকাশক :আগামী প্রকাশন