ভালো বন্ধু

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৯:৫২

আউট! আউট! না না তুমি আউট বাবা! বলটা তোমার পায়ের মাঝখানে লেগেছে। পা-টা মাঝ স্ট্যাম্প বরাবর ছিল! বল ছুড়েছে জয়িতা। বাবার পায়ে লেগেছে। বোলার জয়িতার এলবিডব্লিউর আবেদন!

বাবা মেনে নিলেন। ব্যাট দিলেন কন্যাকে। উইকেট কিপার তামিম। আম্পায়ার নেই। নিজেরাই বিচারক। খেলার নিয়ম নিজেরাই ঠিক করে নিয়েছে। পালাক্রমে ব্যাট করবে বাবা, জয়িতা ও তামিম। যে আউট করবে সে ব্যাট পাবে।

বাংলোর ভেতরে তিন জন মিলে ক্রিকেট খেলছে! জয়িতা ও তামিমের বার্ষিক পরীক্ষা নভেম্বরে শেষ। ডিসেম্বরে ফলাফল ঘোষণা। এখন ছুটি। দুই পরিবার মিলে ঢাকা থেকে রাঙামাটি বেড়াতে এসেছে। জয়িতা, মা হেনা, বাবা অনীক ভট্টাচার্য, তামিম, মা শাহিদা, বাবা মহিতুল ইসলাম এবং জয়িতাদের গাড়িচালক কাশেম রানা। রাঙামাটি ভ্রমণের পরিকল্পনা দুই মাস আগেই ঠিক করা ছিল। জয়িতার বাবার বন্ধু রাঙামাটি জেলার এনডিসি। সেই সুবাদে সরকারি এই বাংলোর অতিথি তারা!

জয়িতার বাবা সাংবাদিক, মা ব্যাংকার। তামিমের বাবা সরকারি একটি কলেজের বাংলার অধ্যাপক। মা গৃহিণী। দুই পরিবারের বসবাস গোপীবাগে। একই বিল্ডিংয়ে পাশাপাশি ফ্ল্যাটে থাকে ওরা। দুজন একই স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে, ফুলকুঁড়ি শিশু নিকেতনে।

কয়দিন ধরে তামিম আর জয়িতার মধ্যে কথা নেই! অথচ জয়িতা বেশ বাকপটু! আসার সময় সারাক্ষণই ও বাবার সঙ্গে কাটিয়েছে। বাবা জানতে চাইলেন তামিমের সঙ্গে কথা বন্ধের কারণ।

—ওর সঙ্গে এমনি এমনি কাট্টি দেইনি বাবা!

—কেন নির্দয় আচরণ ওর সঙ্গে, বলো?  ও তোমার ভালো বন্ধু!

—এই যে দ্যাখো জিপের সিট কভার! এটা টানলে গাড়িটা কষ্ট পায় না বুঝি? ওকে কতবার বলেছি তুমি আমার চুল ধরে টানবে না! কান ধরবে না! ও কথাই শোনে না। আসার আগের দিন ও আমার চুল ধরে মাটিতে ফেলে দেয়! কিছুই বলিনি। তাই ওর সঙ্গে আড়ি!

—বেড়াতে এসে রাগ রাখতে নেই মা! আড়ি দেওয়া ভালো নয়। বিপদে বন্ধুরাই রক্ষা করে! ও ভালো ছেলে।

দুজনের কথা যখন হচ্ছিল তখন ওর মায়ের কোলে ঘুমাচ্ছিল তামিম।

বাবা প্রায়ই জয়িতাকে গল্প শোনান! রাতে বাবার পাশে শোবার সময় রাজা রানী, ভূত-পেতনির গল্প! মেয়ের শর্ত রাখতে গিয়ে বাবার গল্পের মজুদ শেষ হয়ে যায়। তখন তিনি বানিয়ে বানিয়ে বলেন! জয়িতাও বুঝে ফেলে সেটা! মুখের ওপর বলে বসে, ‘তুমি সত্যি বলছো তো গল্পটা বাবা?’ বাবা মুচকি হাসেন! মাথা বুলাতে বুলাতে একসময় জয়িতা ঘুমিয়ে পড়ে।

মা হেনার শখ পাহাড় দেখা! বনভূমিতে পা রাখবেন! সহকর্মী নূরুননাহারের কাছে শুনেছেন রাঙামাটি ভ্রমণে মজা হচ্ছে পাহাড়ি বনে হাঁটা!

মধ্যাহ্নভোজ সম্পন্ন সবার! লনের পাশে বাংলোর বারান্দায় দোলানো চেয়ারে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন মহিতুল সাহেব! টিলার ওপরে বাংলোটা বেশ খোলামেলা। উঁচু পাহাড়টা দেখছিলেন তিনি! হাতে কয়টি ক্যান্ডি। পাশের রিজার্ভ বাজার থেকে এনেছেন!

শাহিদাকে ডেকে বললেন, ‘এগুলো ওদের দাও’।

রানাসহ সবাই পাহাড়ের দিকে রওনা হলো! হেনা তামিমকে এবং বাবা জয়িতাকে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলেন পেছনের আসনে। সামনের আসনে বাকিরা।

—ওরে বাবা! কত্তো বড়ো পাহাড়! জয়িতার চিত্কারে সবার দৃষ্টি গেল পাহাড়ের দিকে। সবাই নামল। জয়িতা গাড়ি থেকে নেমেই দৌড়! পেছনে তামিম।

—মামনি! এই মামনি, থামো থামো! পড়ে যাবে! হাঁপাতে হাঁপাতে রানা ডাকছিল। পাহাড়ের দিকে হাঁটতে থাকে সে! পেছনে বাবাও!

যেতে যেতে মহিতুল সাহেব ইতিহাস বলেন! রাঙামাটির নামকরণ, বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের পূর্বপুরুষের আদি নিবাস কোথায় ছিল ইত্যাদি নানা কাহিনি! শ্রোতা হেনা ও শাহিদা।

জয়িতা ও তামিম পাহাড়ে উঠে গেল। নানা গাছের সমাবেশ পাহাড়ের বনভূমিতে। হঠাত্ জয়িতা দেখতে পেল একটি ডোরাকাটা বিড়াল। তাকে তাড়া করছে তুষার ধবল লোমশ সাদা একটি কুকুর। জয়িতার মনে হলো ওরা পরস্পর বন্ধু। গাছের শুকনো ডাল ও আগাছায় ঘেরা সবুজ ভূমি। তার মধ্যে গভীর সুড়ঙ্গ! কুকুরটি কী যেন দেখছে সেখানে দাঁড়িয়ে। ওরা দেখল বিড়ালটি সেই বিশাল গর্তে পড়ে গেছে। অসহায় বিড়াল ওপরে ওঠার প্রাণপণ চেষ্টা করছে! কিন্তু সকল চেষ্টা ব্যর্থ।

ওরা দুজন সরে এল সেখান থেকে। একটি জারুল গাছের নিচে এসে বসল ওরা। জয়িতা লক্ষ করল কুকুরটার মুখে একটা দড়ি। তার কিছু অংশ ফেলছে সে মাটির সেই গহ্বরে। তারপর দড়ির শেষ অংশ কুকুরটা মুখে নিয়ে তিন-চারবার ঘুরে তা বাঁধল একটা গাছের সঙ্গে। এবার কুকুরটা দড়ির মাঝখানটা মুখে নিয়ে টানতে শুরু করল। দড়ি ধরে বিড়ালটা আস্তে আস্তে বের হয়ে আসে! কুকুর বিড়ালটাকে জড়িয়ে ধরল! বিড়াল কুকুরটার গালে হাত বুলিয়ে দিয়ে সজোরে দৌড়! আর কুকুরটা তার পেছনে ছুটতে থাকে। তারপর হারিয়ে গেল দুজন। দৃশ্যটি দেখে অবাক হয়ে যায় জয়িতা ও তামিম! জয়িতার দিকে তাকাল তামিম কষ্টময় চোখে। বাবার কথা ভাবল জয়িতা। ‘বন্ধুর সঙ্গে রাগতে নেই। বিপদেই বন্ধুর পরিচয়।’ হাত বাড়িয়ে দেয় তামিমের দিকে।

এসো তামিম আড়ি ভাঙি!

জয়িতা বুড়ো আঙুলটি তামিমের মুষ্টিবদ্ধ একই আঙুলে স্পর্শ করল।