বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রাপ্যতা, সম্ভাবনা এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে এলএনজি আমদানির প্রয়োজনীয়তা
জ্বালানি একটি দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি। দারিদ্র্য বিমোচন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে জ্বালানির ভূমিকা অপরিসীম। বাংলাদেশের প্রধানতম প্রাথমিক ও বাণিজ্যিক জ্বালানির উত্স প্রাকৃতিক গ্যাস। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ব্রিটিশ তেল কোম্পানি শেল ওয়েল-এর কাছ থেকে নামমাত্র মূল্যে ৫টি গ্যাসক্ষেত্র ক্রয় করে দেশের স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ের জ্বালানির নিরাপত্তা নিশ্চয়তা প্রদান করেন। কিন্তু পরবর্তী সরকারসমূহ দেশের অমূল্য সম্পদ প্রাকৃতিক গ্যাসের যথাযথ উন্নয়নসাধনে মনোযোগ দেয়নি। তারই ফলে দেশের অমূল্য এ সম্পদের ক্ষেত্রসমূহ অনাবিষ্কৃত থেকে যায় বহু বছর, যা দেশের সার্বিক উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতার অন্যতম। এছাড়া বাণিজ্যিক ও শিল্পোন্নয়নে গ্যাসের ব্যবহারে সীমাবদ্ধ না থেকে আবাসিক চাহিদা পূরণে পাইপ লাইনের মাধ্যমে এ সম্পদ ব্যবহার করা হয়। এমনকি ৯০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে এমনও কথা প্রচলিত ছিল যে ‘গ্যাসের উপর বাংলাদেশ ভাসছে’। সে যৌক্তিকতার উপর ভিত্তি করে গ্যাস রপ্তানির অপচেষ্টাও হয়। কিন্তু ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ়তার কারণে তা সফল হয়নি। গ্যাসের প্রাচুর্য বিবেচনায় যেখানে ২০০৬ সালের পূর্বে দেশের মোট বিদ্যুত্ উত্পাদনের প্রায় ৯৬% আসত গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র থোকে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে গ্যাসের মজুদ দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে। গ্যাসের অভাবে বেশকিছু বিদ্যুেকন্দ্র হয়তো বন্ধ থাকছে নয়তো উত্পাদনক্ষমতার চেয়ে কম ক্ষমতায় চালাতে হচ্ছে। এমনি প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনা সরকার দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে বহুমুখী দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তারই ধারাবাহিকতায় প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করে বিদ্যুত্ উত্পাদনের পাশাপাশি অন্যান্য জ্বালানি অন্তর্ভুক্ত করে জ্বালানি বহুমুখীকরণের দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। ফলে বর্তমানে বিদ্যুত্খাত একটি নির্ভরযোগ্য জ্বালানি মিশ্রণ খাতে পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে দেশের প্রায় ৫৫ শতাংশ বিদ্যুেকন্দ্র গ্যাসনির্ভর। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার না হওয়া, দেশের প্রতিনিয়ত আবাসিক/বাণিজ্যিক গ্যাসের চাহিদা বৃদ্ধি, সর্বোপরি দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের সাথে সাথে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে বর্তমান সরকার ২০১০ সালে জরুরি ভিত্তিতে এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা গ্রহণ করে। সরকারের এলএনজি পরিকল্পনায় স্বল্পমেয়াদি FSRU-এর মাধ্যমে এলএনজি আমদানির পাশাপাশি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। সরকারের পরিকল্পনায় আগামী ২০২৩ সালে ৭০০০ এমএমসিএফডি এলএনজি আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে (টেবিল-১)।
প্রতিষ্ঠানের নাম ক্ষমতা (এমএমসিএফডি) চুক্তি/এমওইউ স্বাক্ষরের তারিখ সম্ভব্য কমিশনিং কাল
এলএনজি আমদানি FSRU
এক্সেলারেট এনার্জি ৫০০ ১৮ জুলাই ২০১৬ এপ্রিল ২০১৮
সামিট এলএনজি ৫০০ ২০ এপ্রিল ২০১৭ অক্টোবর ২০১৮
রিলায়েন্স ৫০০ ১০ এপ্রিল ২০১৭ জুন ২০১৯
হংকং সাংহাই মানজালা ৫০০ ২৪ নভেম্বর ২০১৬ জুন ২০২০
স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল
পেট্রোনেট, ভারত ১০০০ ২৯ ডিসেম্বর ২০১৬ ডিসেম্বর ২০২১
HQC, চীন ১০০০ ২০ নভেম্বর ২০১৬ ডিসেম্বর ২০২২
Sembcorp, সিঙ্গাপুর ১০০০ ২৮ মার্চ ২০১৭ ডিসেম্বর ২০২২
পায়রা ও মহেশখালীতে ২টি ল্যান্ড বেইজড এলএনজি টার্মিনাল ১০০০ প্রতিটি - ডিসেম্বর ২০২৩
দীর্ঘ ক্রয়প্রক্রিয়া শেষে ও এলএনজি-এর উত্স সন্ধানে অধিক সময় ব্যয় হলেও আনন্দের বিষয় হলো পেট্রোবাংলা কর্তৃক ৫০০ এমএমসিএফডি ক্ষমতার FSRU-এর জন্য আমেরিকান প্রতিষ্ঠান Excelerate Energy Bangladesh Ltd.-এর সাথে ২০১৬ সালের জুলাই মাসে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং গত ১৯ আগস্ট ২০১৮ থেকে গড়ে ৩০০ এমএমসিএফডি গ্যাস পাইপ লাইনে সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়াও সরকারের জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের আওতাধীন পেট্রোবাংলা এবং বিদ্যুিবভাগ কর্তৃক স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পদক্ষেপ প্রহণ করা হয়।
বর্তমান সরকার ২০৪১ সালে দেশকে উন্নত দেশে পরিণত করার বিষয়ে প্রতিটি খাতে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বিদ্যুত্খাতের উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন করা সম্ভব হবে। সেক্ষেত্রে প্রচুর পরিমাণ গ্যাস সরবরাহের প্রয়োজন হবে। বিদ্যুিবভাগ কর্তৃক ২০৪১ সালে বিদ্যুত্ উত্পাদনে ৬০ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০৩০ সালে ৪০ হাজার মেগাওয়াট-এর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। উক্ত সময়ে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র থেকে ২০৪১ সালে ২১ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০৩০ সালে ১১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এর জন্য মোট গ্যাসের চাহিদা হবে ২০৪১ সালে ৩০০০ এমএমসিএফডি যার প্রায় ৫০% নিজস্ব উত্স থেকে এবং বাকি চাহিদা এলএনজি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হবে। তাছাড়া ২০৪১ সালে বাংলাদেশকে একটি উন্নত দেশে উন্নীত করতে হলে জ্বালানি হিসেবে গ্যাস একটি বড় নিয়ামক। ফলে বিদ্যুত্ উত্পাদনের পাশাপাশি শিল্পখাতের জন্য এলএনজি আমদানি প্রয়োজন হবে। এমতাবস্থায়, জাতীয়ভাবে চাহিদা পূরণের পাশাপাশি সম্প্রসারিত বিদ্যুত্খাতের জন্য গ্যাসের চাহিদা পূরণে একটি ডেডিকেটেড স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে একটি বিষয় বিবেচনায় নিতে হয় তা হলো এলএনজি আমদানিব্যয়। বর্তমানে নিজস্ব গ্যাসের দামের তুলনায় এলএনজির আন্তর্জাতিক মূল্য কমপক্ষে ৫ গুণ বেশি। সেক্ষেত্রে বিদ্যুত্ উত্পাদনব্যয় অথবা শিল্পের উত্পাদিত পণ্যের ব্যয় প্রতিযোগিতামূলক রাখা কষ্টসাধ্য হবে। তাই দেশের শিল্পায়ন ও রপ্তানি বাণিজ্য প্রসারে এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে প্রণোদনার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
শিল্পে গ্যাস সরবরাহ ও অন্যান্য খাতে গ্যাসের চাহিদা পূরণ করে বিদ্যুত্খাতে গ্যাস বরাদ্দের বিষয়টি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। ফলে প্রতিনিয়ত আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হয় এবং প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া সম্ভব হয় না। বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হলে বিদ্যুত্ বিভাগের আওতায় এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি। এতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের মাধ্যমে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্রসমূহের বিদ্যুত্ উত্পাদন করা সম্ভব হবে।
লেখক :মহাপরিচালক পাওয়ার সেল, বাংলাদেশ
