জরিপ শাহ্র বারোদুয়ারী মসজিদ

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:৫১

হযরত শাহজালালের (রহ) সিলেট বিজয়কালে তার তিন শতাধিক সঙ্গীর মধ্যে অন্যতম ছিলেন জরিপ শাহ (রহ)। তিনি বাংলাদেশের উত্তর সীমান্ত এলাকা—শেরপুরে ইসলাম প্রচারের দায়িত্ব পান। এ মহান সাধক তার ৩৬০ একর খানকাহ এলাকা নিরাপত্তার জন্য চারপাশে খাল খনন করান। প্রচলিত আছে, তার জিন মুরিদরা এক রাতে খাল খননের কাজ করে ফেলে। এতেই তার সুনাম ছড়িয়ে যায় এবং এলাকার নাম হয় গড় জরিপা। অন্যদিকে জরিপ শাহের (রহ) খালটিই কালক্রমে ‘কালিদহ সাগর’ নামে পরিচিত হয়। এ মহান সাধকের মৃত্যুর পর তার খানকাহর পাশে তাকে দাফন করা হয়, বর্তমানে যা জরিপ শাহর মাজার নামে খ্যাত। তারই স্মৃতিস্মারক গড় জরিপা বারোদুয়ারি মসজিদ। এটি শেরপুরের ১৮ কিমি দূরে উত্তর-পশ্চিমের উপজেলা শ্রীবরদীতে অবস্থিত। জনশ্রুতি অনুযায়ী গড় জরিপার বারোদুয়ারি মসজিদটি অন্তত ৭০০ বছর আগে জরিপ শাহ নির্মাণ করেন। মসজিদটিতে বারোটি দরজা থাকার কারণেই বলা হয় বারোদুয়ারি। আছে তিনটি জানালা, তিনটি গম্বুজ।

মসজিদটি বর্তমানে যে অবস্থানে আছে, মোগল আমলে সেখানে মসজিদটি একটি সেনাছাউনি মসজিদ বলে পরিচিতি পায়। কালের বহতাধারায় ভূমিকম্পে মসজিদটি ধ্বংস হয়ে মাটিচাপা পড়ে। মসজিদের ওপর জমতে থাকে মাটির স্তূপ এবং আস্তে আস্তে তৈরি হয় টিলা। টিলার ওপর গজায় নানান গাছগাছালি। বিশাল জঙ্গল হয়ে ওঠে ‘আড়া’ (জঙ্গলের স্থানীয় পরিভাষা)।

ইসলামি শরিয়া অনুযায়ী, যে স্থানে একবার মসজিদ হয়ে যায় তা কিয়ামত পর্যন্তই মসজিদ। গড় জরিপা মসজিদকে আবারও ইবাদতের মহিমায় ফিরিয়ে আনতে ভূমিকা রাখলেন আরেক মহান দরবেশ। ঐতিহ্যবাহী শর্ষিনা পাক দরবারের মহান পিরসাহেবের খলিফা হয়ে শ্রীবরদীতে আগমন করলেন আজিজুল হক সাহেব। তিনি মুরিদদের নিয়ে মাটি খনন করতে লাগলেন। তারা জঙ্গল পরিষ্কার করে মাটির কয়েক গজ গভীরেই এক প্রাচীন মসজিদের অস্তিত্ব খুঁজে পান। মসজিদের ইটগুলো গোলাপফুলের নকশা খোদাইকৃত ছিল। দীর্ঘদিন দুর্লভ ঐ ইটগুলো জনগণের হেফাজতে থাকলেও ১৯৬৩ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ তা নিয়ে যায়। হারিয়ে যাওয়া জরিপ শাহের স্মৃতিবিজড়িত ও ৭০০ বছরের প্রাচীন বারোদুয়ারি মসজিদ খুঁজে পাওয়ার পর বহুবার সংস্কার ও সম্প্রসারণের ফলে বর্তমান রূপ পেয়েছে। এতে প্রাচীনত্ব ও আধুনিকতার চমত্কার সমন্বয় ফুটে উঠেছে শিল্পীর সযত্ন ছোঁয়ায়। অপরূপ প্রত্ননিদর্শন বারোদুয়ারি মসজিদ ইবাদত ও ঐতিহ্যের আবহে পর্যটক আকর্ষণে বিশাল অবদান রাখতে পারে। বিশেষত অনন্য কারুকাজ খচিত মসজিদের মেহরাব ও কার্নিশ শিল্পবোদ্ধা তো বটেই সাধারণ মানুষেরও নজর কাড়ে মায়াবী আধ্যাত্মিক টানে।

—লেখক :সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, গাজীপুর