গ্রামের নাম জাঙ্গালিয়া। সেই কবে বনজঙ্গল উজাড় হয়ে গেছে, তবু বাসিন্দারা এখনো জাঙ্গালিয়া পরিচয়েই গর্ববোধ করে। এটি মধুপুর বনাঞ্চলের দারিদ্র্যপীড়িত গারো গ্রাম। এই গ্রামের শতাধিক তরুণী পেটের দায়ে রাজধানীর বিভিন্ন বিউটি পার্লারে কাজ করেন। এদেরই একজন মাধবী মাংসাং, যার জীবনের বঞ্চনা ও লড়াইটা গল্পের মতো।
মাধবীর বাবা সুধীর রিছিল। মা রিংমী মাংসাং। গারো সমাজ মাতৃতান্ত্রিক। তাই রীতি অনুযায়ী মা রিংমী সম্পত্তির পুরো মালিক। এই দম্পতির ছয় ছেলে দুই মেয়ের মধ্যে মেজো মাধবী। মা রিংমী পৈতৃক সূত্রে উঁচু টিলা ও বাইদে যে জমি পান, তার সবটাই এখন বেহাত। রিংমী জানান, গারোরা উত্তরাধিকার সূত্রে পাহাড়ি জমি ভোগদখল করে, যার দলিল বা কাগজপত্র নেই। নব্বইয়ের দশকে টাঙ্গাইল বন বিভাগ এসব জমিতে সামাজিক বনায়ন শুরু করলে মাধবীর পরিবার পাঁচ বিঘা আবাদি জমি হারায়। নিয়ম থাকা সত্ত্বেও সামাজিক বনায়নের প্লট থেকেও বঞ্চিত হয় পরিবারটি। এর মধ্যে রিংমীর জটিল রোগের চিকিত্সায় অবশিষ্ট জমি বন্ধক দেওয়া হয়। এক বিঘা বন্ধকিতে দুই বিঘা বেদখলের যে মহাজনি কারবার, সেই ফ্যাকড়ায় পুরো জমি হারান মাধবীরা। টিকে থাকে শুধু পাঁচ শতাংশের ভিটে। সংসারের ধকলে বাবা সুধীর অকালে মারা যান। বন্ধ হয়ে যায় সব ভাইবোনের পড়ালেখা। পুরো পরিবার কলা ও আনারসের বাগানে দিনমজুরি শুরু করে। পরিবারের এমন দুর্দিনে বড়ো ভাই মৃণাল, হ্যান্ড্রিক, রঞ্জন ও রতন প্রথানুযায়ী বিয়ে করে শ্বশুরবাড়িতে চলে যান। সবার বড়ো ভাই মিন্টু মাংসাং দুরারোগ্য ব্যাধিতে বিছানায় পড়েন। অসুস্থ মা এবং নাবালক ভাইবোন বিলাস ও পাপড়িকে নিয়ে বিপাকে পড়েন মাধবী। শুরু হয় তার জীবনের কঠিন সংগ্রাম।
বড়ো ভাই মিন্টু মাংসাং জানান, জলছত্র কর্পোস খ্রিষ্ট হাইস্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্রী মাধবী বই-কলম ছেড়ে জীবিকার তাগিদে পাড়ি জমান ইট-কাঠ-পাথরের শহরে। বাকিটুকু মাধবীর মুখেই শোনা—বিউটিশিয়ান এক আত্মীয়ার হাত ধরে তিনি অচেনা শহর ঢাকায় এসে কঠিন সংগ্রামের মুখে পড়েন। খাওয়া-পরার শর্তে মগবাজারের মিং বিউটি পার্লারে কাজ নেন। তিন মাস পর আনজুশ পার্লারে। এরপর একসিলেন্টো, ফ্রিল, এস্তোভা হয়ে বর্তমানে আফসারা পার্লারে। সেই যে বিউটিশিয়ানের তকমাপ্রাপ্তি, সুখে-দুঃখে সেটিই এখন ভরসা। টানা ১৬ বছর বিউটিফিকেশনের কাজে অলরাউন্ডার হলেও বেতন মাত্র ২০ হাজার। থাকা-খাওয়া বাদে যত্সামান্য যা থাকে, তা-ই পাঠাতে হয় বাড়িতে।
মাধবীদের মতো গারো তরুণীদের অরণ্য ছেড়ে শহরে বিউটিশিয়ান হওয়ার নেপথ্যের কারণ—দিনে দিনে বন কমছে, জনসংখ্যা বাড়ছে, জীবিকা সংকুচিত হচ্ছে, নিত্য নতুন টানাপোড়েন, পুষ্টিকর খাবার নেই, ঐতিহ্য সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির সরকারি স্বীকৃতি নেই, সর্বক্ষণ উচ্ছেদ আতঙ্ক, পাড়ায় পাড়ায় বাঙালি বসতির অবিরল চাপ, নিজভূমে পরবাসী ও প্রান্তজন হওয়ার আশঙ্কা।
এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মধুপুর বনাঞ্চলের শোলাকুড়ি, অরণখোলা, বেড়িবাইদ, ফুলবাগচালা ও কুড়াগাছা ইউনিয়নের ৪৪টি গ্রামের প্রায় ৫০ হাজার অধিবাসীর মধ্যে গারো ও কোচ ২০ হাজার। বেসরকারি সংস্থা সেডের তথ্য অনুযায়ী, এখানকার ১ হাজার ১৮৯ জন তরুণী বিউটি পার্লারে কাজ করেন। আচিকমিচিক সোসাইটির পরিচালক সুলেখা ম্রং জানান, দারিদ্র্যের কারণে পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বাবা-মায়ের মুখে অন্ন তুলে দিতে উদ্গ্রীব হয়ে ওঠে গারো মেয়েরা। তখন শহর তাদের হাতছানি দিয়ে ডাকে। তারা স্কুল ছাড়ে। গ্রাম ছাড়ে। বনের সহজ-সরল বৃত্ত ছেড়ে নগরের জটিল আবর্তরেখায় প্রবেশ করে। যেখানে শ্রম শোষণ, যৌন হয়রানি, নানা মাত্রার নিপীড়ন ও অপবাদের শিকার হতে হয়। মানুষ সৌন্দর্যের পূজারি। বিউটিশিয়ানরা সেই সৌন্দর্য ও লাবণ্যতা তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলেন। পার্লারের ব্যবসা লাভজনক হলেও বিউটিশিয়ানরা তেমন বেতন-ভাতা পান না। পান না বোনাস। এমনকি চাকরির নিশ্চয়তা নেই। এটি এমন একটা পেশা, যেখানে অভিজ্ঞদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর সময় এলে নির্বিচারে ছাঁটাই চলে।
মাধবী অভিযোগ করেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কাজের কোনো টাইমটেবল নেই। বারো ঘণ্টা হাড়ভাঙা খাটুনি। পার্লার ম্যানেজার সুযোগ পেলে খারাপ প্রস্তাব দেন। সেটি না মানলেই হয়রানি। মিথ্যা অপবাদে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়া হয়। ফাঁদে আটকিয়ে কম বেতনে চাকরি করতে বাধ্য করা হয়। তিনি জানান, উচ্চবিত্ত ছাড়াও মধ্যবিত্তরাও এখন সাজুগুজুর জন্য পার্লারে আসেন। তাদের যারা সাজিয়ে রূপবতী, সৌন্দর্যবতী ও কমনীয় করে তোলেন, সেই বিউটিশিয়ানরা থাকেন ‘অসুন্দর’। তাদের দুঃখ, বেদনা ও বঞ্চনার খবর কেউ রাখে না। পার্লার ব্যবসাকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা এবং বিউটিশিয়ানদের শিল্পীর মর্যাদা দেওয়ার দাবি জানান মাধবী।
