মানুষের জীবিকা নির্বাহের জন্য নানা ধরনের পেশায় নিয়োজিত থাকে। কেউবা উন্নত, ভালো এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করে, কেউবা অনুন্নত ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করেন। যারা অস্বাস্থ্যকর এবং অনুন্নত পরিবেশে কাজ করেন তাদের নানা রকম শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি হয়ে থাকে। বিবিধ পেশা এবং পেশার পারিপার্শ্বিক পরিবেশের ফলে সৃষ্ট শারীরিক সমস্যার মধ্যে বক্ষব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে এমন রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। সাধারণ শ্রমিক শ্রেণির লোকেরা যেসব মিল-কলকারখানাতে কাজ করেন, সেসব ফ্যাক্টরি বা মিল-কারখানার মধ্যে অধিকাংশই অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। এতে করে এসব কারখানার অভ্যন্তরীণ পরিবেশ অর্থাত্ শ্রমিকদের কাজ করার পরিবেশ থাকে খুব নিম্নমানের। ফলে শ্রমিকরা বুকের ব্যাধিসহ বিভিন্ন প্রকারের ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। মিল-কলকারখানা ছাড়াও আরো বিভিন্ন পেশা রয়েছে যার কারণে মানুষ বুকের নানাবিদ রোগ বালাইতে আক্রান্ত হয়ে থাকে।
ভিন্ন ভিন্ন পেশার কারণে সৃষ্ট বক্ষব্যাধিসমূহ হচ্ছে :
১. অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা মিল-কলকারখানার অভ্যন্তরের স্যাঁতসেঁতে, বন্ধ ও নোংরা পরিবেশ যক্ষ্মার জীবাণু বেড়ে ওঠার অনুকূল পরিবেশ। তাই এসব পরিবেশে যারা কাজ করেন তাদের যক্ষ্মার জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে বেশি।
২. সিলিকা নিয়ে যে সকল ব্যক্তি কাজ করেন তাদের সিলিকোসিসনামক বক্ষব্যাধিতে আক্রান্ত হতে দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে সিলিকোসিসের সাথে কারো কারো যক্ষ্মাও হয়ে থাকে।
৩. নানা ধরনের রাসায়নিক পদার্থ-ক্রমিয়াম, ক্যাডমিয়াম, এসবেসটস ইত্যাদির সংস্পর্শে দীর্ঘদিন যারা কাজ করেন তাদের ক্ষেত্রে ফুসফুসে ক্যানসার হওয়ার প্রবণতা থাকে বেশি।
৪. এমন অনেক কর্মস্থল আছে যেসব জায়গায় প্রচুর ধূলিকণা, গ্যাস, কিউম এবং ঝাঁজালো পদার্থ বিদ্যমান থাকে। এসব বস্তু মানুষের শ্বাসের সাথে নাকে ঢুকে ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি করে।
৫. ফ্যাক্টরি বা মিল-কল-কারখানার অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে দীর্ঘ দিন জমে থাকা ধূলিকণা সেখানে কর্মরত ব্যক্তিদের ফুসফুসে জমা হয়ে ফাইব্রোসিস তৈরি করে।
৬. পাটের সূক্ষ্ম আঁশ শ্বাসকষ্ট সৃষ্টির একটি প্রধান উপাদান। তাই পাটের মিলে অনেক দিন কাজ করলে পাটের আঁশ ফুসফুসে জমতে জমতে শ্বাস কষ্টের উদ্ভব ঘটায়।
৭. তুলার তন্ত্রও ফুসফুসে প্রবেশ করে বক্ষের রোগ সৃষ্টিতে সহায়তা করে।
৮. নিউমোকোনিওসিস নামক এক ধরনের বুকের অসুখ রয়েছে। যেসব লোক কয়লার খনিতে কাজ করেন তাদের দেহে এ ব্যাধির উপক্রম দেখা দেয়।
৯. সার, সিমেন্ট এবং রঙের ফ্যাক্টরিতে যারা কাজ করেন তাদেরও বুকের বিবিধ অসুখ বিসুখে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা থাকে।
১০. পাখি বিক্রির কাজ যারা করেন, দীর্ঘ দিন অনেক পাখির সংস্পর্শে থাকতে থাকতে তাদের বার্ড ফেনসিয়ার্স লাঙ্গ নামক বক্ষব্যাধি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
১১. ভেজা ধান থেকে যে বুকের অসুখ হয়ে থাকে তার কারণে মানুষের শরীরে কাশি ও শ্বাসকষ্টের উপক্রম হয়। আর যারা শস্য কাটার কাজ করেন তাদের ক্ষেত্রে এই ধরনের বুকের অসুখে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বেশি।
১২. এছাড়াও বিভিন্ন মিল-কল-কারখানায় এমন অনেক রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহূত হয়, যার কারণে সেখানে কর্মরত ব্যক্তিদের হাঁপানির সৃষ্টি হতে পারে।
তাই, যেসব পেশার কারণে বক্ষব্যাধি হওয়ার ঝুঁকি থাকে সেসব পেশার লোকদের এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। পেশাগত কোনো কারণে বক্ষব্যাধির উপসর্গসমূহ পরিলক্ষিত হলে দ্রুত বক্ষব্যাধি চিকিত্সকের শরণাপন্ন হতে হবে। মিল-কলকারখানা প্রতিষ্ঠার সময় কর্তৃপক্ষের শ্রমিকদের স্বাস্থ্যের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। কারখানা অভ্যন্তরীণ পরিবেশ যাতে নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারখানার কোনো কর্মী অসুস্থ্য হলে তার চিকিত্সার ব্যাপারে মিল কর্তৃপক্ষকে সচেতন হতে হবে। কোনো কর্মী যদি এমন কোনো ব্যাধিতে আক্রান্ত হয় যে, তার দীর্ঘ সময় বিশ্রামের প্রয়োজন, সেক্ষেত্রে ফ্যাক্টরি কর্তৃপক্ষকে ঐ কর্মীর পর্যাপ্ত ছুটি মঞ্জুর করতে হবে। যেসব বিষয় এড়িয়ে চললে কর্মীদের বুকের রোগবালাইতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে সেসব বিষয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক শ্রমিকদের মধ্যে প্রচার করতে হবে। যেমন—ধূমপান হচ্ছে বক্ষব্যাধি সৃষ্টির একটি অন্যতম উপাদান। মাত্রাতিরিক্ত ধূমপানের ফলে ফুসফুসের ক্যানসার ও ব্রংকাইটিস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ধূমপানের কুফল সম্পর্কে শ্রমিকদের অবগত করতে হবে।
অধ্যাপক ডা. একেএম, মোস্তফা হোসেন
বক্ষব্যাধি ও এজমা বিশেষজ্ঞ
চেম্বার :ইউনাইটেড হাসপাতাল, গুলশান-২, ঢাকা
