উন্নয়নে শামিল চট্টগ্রাম বন্দরও

আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:৩২

আবুল কাসেম ভূঁইয়া

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে চট্টগ্রাম বন্দরের ভূমিকা অনস্বীকার্য। চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ। চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে দেশের মোট বাণিজ্যের ৯২ শতাংশ এবং কনটেইনারজাত পণ্যের ৯৮ শতাংশ পরিবাহিত হয়ে থাকে। দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের সিংহভাগই সামাল দিচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর। নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে, নতুন ধরনের পণ্য খালাসের সুবিধা প্রদান করতে আর পণ্য ওঠানামার সময় কমিয়ে সেবার দক্ষতা বৃদ্ধি করতে তিলে তিলে নতুন মাত্রায় গড়ে উঠেছে চট্টগ্রাম বন্দর। আজকের বন্দর বিগত দিনের চেয়ে আরো বেশি কর্মক্ষম এবং আগামীর বন্দর হতে যাচ্ছে আরো আকর্ষণীয়, আরো সমৃদ্ধ এবং আরো বেশি কার্যকর। কনটেইনার ওঠানামায় নতুন রেকর্ড গড়েছে চট্টগ্রাম বন্দর। ২০১৮ সালে যেখানে কনটেইনার ওঠানামা হয়েছিল ২৯ লাখ ৩ হাজার টিইইউস, ২০১৯ সালে সেটি হয়েছে ৩০ লাখ ৮৮ হাজার টিইইউস। এই খাতে প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৭ দশমিক ০৩ শতাংশ। কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের এই পরিসংখ্যান চট্টগ্রাম বন্দরের ৩০ বছর মেয়াদি প্রজ্ঞাপণকে ছাড়িয়ে গেছে। ক্রমবর্ধমান কনটেইনার পরিবহনের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রণয়ন ও এর বাস্তবায়ন শুরু করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ, যার প্রত্যক্ষ ফলাফল এই পরিসংখ্যান। এই চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে পুরাতন ইয়ার্ড সংস্কার, নতুন ইয়ার্ড নির্মাণ, বিভিন্ন ইক্যুইপমেন্ট সংগ্রহের ফলে।

এছাড়া নতুন করে ৩৭ একর জায়গার ওপর ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ড যুক্ত হতে যাচ্ছে। সামগ্রিকভাবেই চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার ইয়ার্ড ও ধারণক্ষমতা বেড়েছে। বর্তমানে বন্দরের ইয়ার্ডে ৫০ হাজারের বেশি কনটেইনার রাখা সম্ভব হচ্ছে। ফলে বর্তমান প্রবৃদ্ধির হারে কনটেইনার পরিবহনের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও চট্টগ্রাম বন্দর তা হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা অর্জন করেছে। ইতোমধ্যে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের কাজ পুরোদমে চলছে। বে টার্মিনাল নির্মাণের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বন্দরকে সম্প্রসারণ করার পাশাপাশি মিরসরাইয়ে নির্মাণাধীন দেশের বৃহত্তম শিল্পনগর ‘বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর’কে সাপোর্ট দিতে সীতাকুণ্ড এলাকায় আরেকটি টার্মিনাল নির্মাণের প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ চলমান রয়েছে। লয়েডস লিস্টের জরিপে বিশ্বের সেরা ১০০ কনটেইনারবাহী বন্দরের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান অবস্থান ৬৪তম, যা ২০০৯ সালে ছিল ৯৮তম। ২০১৯ সালের হ্যান্ডলিং পরিসংখ্যান অনুযায়ী চট্টগ্রাম বন্দর এ বছরের জরিপে আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে যাবে বলে আশাবাদী। বন্দরে জাহাজের গড় অবস্থানকাল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে কনটেইনারবাহী জাহাজ বহির্নোঙরে আসার এক থেকে দুই দিনের মধ্যে জেটিতে ভিড়ছে। বহির্নোঙরে আসার পর এক দিনও অপেক্ষা না করে সরাসরি জেটিতে ভেড়ার রেকর্ডও হয়েছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে কি গ্যান্ট্রি ক্রেন সংযোজনের ফলে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর কাজে গতি বেড়েছে। অন্যদিকে সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজের জেটি খালি থাকায় সেখানেও ভেড়ানো হচ্ছে কনটেইনারবাহী জাহাজ। এতে বারো থেকে চৌদ্দটি জাহাজ থেকে একসঙ্গে কনটেইনার হ্যান্ডলিং সম্ভব হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে তথা ক্রমবর্ধমান প্রবৃদ্ধি সামাল দিতে পিসিটি অগ্রণী ভূমিকা রাখবে। বহির্নোঙরে অবস্থানরত বড়ো জাহাজ থেকে পণ্য লাইটার করে খালাস করতে কর্ণফুলী নদীর তীরে সদরঘাটে নির্মাণ করা হয়েছে পাঁচটি লাইটারেজ জেটি। জাহাজের অপেক্ষমাণ সময় কমানো এবং দ্রুত পণ্য খালাস করার উদ্দেশ্য সামনে রেখে এ জেটিগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল। উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বিভিন্ন গ্রুপকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এসব জেটি। বন্দরের ইতিহাসে বেসরকারি খাতে জেটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগ এটিই প্রথম। জেটি বরাদ্দের পর চুক্তি অনুযায়ী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের পণ্য লাইটার জেটিতে এনে খালাস করতে পারবে। আমদানিকৃত পণ্য এনে নিজেদের জেটিতে খালাস করার সুযোগ পাওয়ায় শিল্প গ্রুপগুলোর পণ্য পরিবহন খরচ ও সময় অনেক কমবে। পাঁচটি জেটি ছাড়াও পর্যায়ক্রমে আরো ১৫টি লাইটার জেটি নির্মাণ করছে কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে লালদিয়া এলাকায় ইনকনট্রেড ডিপোর পাশে পাঁচটি লাইটার জেটির নির্মাণকাজ চলছে। এ ছাড়া চান্দগাঁওয়ের হামিদচরে ছয়টি এবং সীতাকুণ্ড এলাকায় আরো চারটি লাইটার জেটি ও ব্যাকআপ ইয়ার্ড নির্মাণ করা হবে। তা ছাড়া বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতের পর্যটন এলাকায় ক্রুজশিল্প পরিচালনার জন্য একটি ক্রুজ টার্মিনাল, বক্ষু ইকোনমির জন্য একটি মাইনিং টার্মিনাল এবং বন্দর থেকে বে-টার্মিনাল পর্যন্ত একটি ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হবে।

এছাড়া আরটিজি, ফর্কলিফট, স্ট্রাডল ক্যারিয়ারের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতিও বেশি এসেছে ২০১৮ সালে। গ্রান্ট্র ক্রেন দিয়ে দ্রুত পণ্য ওঠানামা করাতে বন্দর ব্যবহারকারীরা বেশ খুশি। বন্দরে তিনটি গ্র্যান্ট্রি ক্রেন থাকার ফলে জাহাজ আগের তুলনায় কম সময়ে জেটি ত্যাগ করতে পারছে। এতে কম সময়ে বেশি জাহাজ ভিড়তে পারছে। সব মিলিয়ে কনটেইনার পরিবহনে গতিশীলতা বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। বন্দরের রাজস্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যবহারকারীদের অর্থ ও সময়ের অপচয় কমছে। চট্টগ্রাম বন্দরকে ইউরোপীয় ইমিশন স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী গ্রিন পোর্ট করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্ণফুলী নদীর ড্রেজিংয়ের কার্যক্রম পুরোদমে চালিয়ে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়নে আরো অনেক পরিকল্পনা রয়েছে, যা পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে সম্পন্ন করে দেশকে সামনের দিকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।

n লেখক :বিমা কর্মকর্তা