ভাইরাসে জীবন সংকটাপন্ন

আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২২:৩৯

সময় যত যাচ্ছে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বিশ্বের প্রায় ৩০টির মতো দেশের মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত। শুধু করোনাভাইরাসই নয় এর আগে ইবোলা ও সার্সসহ নানা ধরনের ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লাখ লাখ মানুষ। তাতে মারা গেছে অনেক। নতুন নতুন ভাইরাসের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে সংকটাপন্ন হয়ে পড়ছে মানুষের জীবন। চিকিত্সা বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভাইরাস খুব রহস্যময় একটি জীবাণু। এ জীবাণু নিয়মিত পরিবর্তিত হয়, অব্যাহত মিউটেশন ঘটে। এ কারণেই একই প্রজাতির ভাইরাসের সংক্রমণ আগের সময়ের চেয়ে মারাত্মক হতে পারে। সবচেয়ে সমস্যাজনক দিক হলো, ভাইরাসের এ পরিবর্তনগুলো খুব সূক্ষ্ম ও সামান্য। এ প্রক্রিয়াকে বলে অ্যান্টিজেনিক ড্রিফট। অর্থাত্ শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে বোকা বানানোর কৌশল। বিজ্ঞানীরা আরো বলেন,  ভাইরাস কখনো কখনো অভূতপূর্ব অ্যান্টিজেনিক শিফট ঘটায়। তখন সম্পূর্ণ নতুন প্রজাতি তৈরি হয়। সেই প্রজাতিকে প্রতিরোধ করার মতো কোনো ব্যবস্থা শরীরে থাকে না। ফলে ওই ভাইরাস তখন মারাত্মক আকার ধারণ করে। সোজা কথায়, মানবশরীর তার পরিচিত জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করে রাখে। ফলে সেসব জীবাণু শরীরে প্রবেশ করলেও ক্ষতি করতে পারে না। কিন্তু সম্পূর্ণ নতুন ধরনের জীবাণুর আক্রমণ হলে শরীর তাকে শনাক্ত করতেও ব্যর্থ হয়।

সবচেয়ে বড়ো কথা হলো—যখন নতুন কোনো ভাইরাস মহামারি আকারে দেখা দেয় তখন তা প্রতিরোধে কোনো নির্দ্দিষ্ট ওষুধ কাজে আসে না। ইতোমধ্যে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মানুষের মৃত্যুর পাশাপাশি চীনের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। সেই প্রভাবের ঢেউ থেকে বাদ যাচ্ছে না অনেক দেশই।

কয়েক বছর আগে ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় অনেক মানুষ। ইবোলা ছাড়াও আরো অনেক ভাইরাস আছে খুবই প্রাণঘাতী। যেমনটা করোনা ভাইরাস। নতুন ধরনের এই ভাইরাসের সংক্রমণ কোথা থেকে শুরু হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি বিশেষজ্ঞরা। সার্স (সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম) এবং মার্স (মিডল-ইস্ট রেসপিরেটরি সিনড্রোম) গোত্রের এই করোনা ভাইরাসের নাম দেওয়া হয় নভেল করোনাভাইরাস; সংক্ষেপে ২০১৯-এনসিওভি।

এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক ভিসি ও ভাইরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, কিছু কিছু ভাইরাসের চিকিত্সা আছে। যেহেতু করোনা ভাইরাস একেবারেই নতুন সেহেতু এখনো কোনো ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়নি। এই ওষুধ আবিষ্কার হতে যে সময় লাগে তাতে পেরিয়ে যায় অনেক সময়। ফলে অনেক মানুষ মারা যায়। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এর সাবেক পরিচালক অ্যধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান বলেন, প্রতিটি ভাইরাসের বৈশিষ্ট্য আলাদা আলাদা। এই ভাইরাস প্রতিরোধে ওষুধ আবিষ্কৃত হতে সময় দরকার হয়। আবিষ্কৃত না হওয়া পর্যন্ত অনেক লোক মারা যায়। আইইডিসিআরের বর্তমান পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সাবরিনা ফ্লোরা বলেন, করোনা ভাইরাস নিয়ে আতঙ্কিত হচ্ছে মানুষ। অনেক প্রাণঘাতী ভাইরাসের ভ্যাকসিন রয়েছে।  যেহেতু করোনা নতুন ধরনের ভাইরাস সেহেতু একসময় এটার ওষুধ পৃথিবীতে আবিষ্কার হবে।  

ভাইরাস কী: ভাইরাস হলো অতিক্ষুদ্র জৈব কণা বা অণুজীব। যা শুধু জীবিত কোষের ভেতরে বংশবৃদ্ধি করতে পারে। ভাইরাস ল্যাটিন ভাষা থেকে গৃহীত একটি শব্দ। আদিকালে রোগ সৃষ্টিকারী যে কোনো বিষাক্ত পদার্থকে ভাইরাস বলা হতো। ভাইরাসের যে গঠন প্রক্রিয়া তাতে সে স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারে না। এজন্য ভাইরাস উদ্ভিদ, প্রাণি বা ব্যাকটেরিয়ার কোষে আশ্রয় নিয়ে ঐ অবিকল আরো ভাইরাস সৃষ্টি করতে থাকে। ভাইরাস নিউক্লিক অ্যাসিড ও প্রোটিন দিয়ে গঠিত। অতি আণুবীক্ষণিক অকোষীয় রোগ-জীবাণু বা রাসায়নিক বস্তুটি জীবকোষের ভেতরে সক্রিয় হয়ে সংখ্যা বৃদ্ধি ও  রোগ সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু জীবকোষের বাইরে জড় পদার্থের মতো নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকে।

ভাইরাস আরএনএ অথবা ডিএনএ দ্বারা গঠিত, যা একটি প্রোটিনের আবরণের ভেতর থাকে। এরা নিজেরা পুনরুত্পাদনে যেতে পারে না। তাই আশ্রয়দাতার শরীরে অনুপ্রবেশ করে এর যান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও শক্তিশালী কোষ দখল করে ভাইরাসের নিজস্ব ডিএনএ প্রবেশ করিয়ে দেয়। ভাইরাসের প্রাণ বা জীবন আছে কি না তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। সব জীবসত্তার কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন এটি নিজে জন্মাতে পারে, পুনর্জন্ম নিতে পারে, নানা ধরনের বিপাকীয় প্রক্রিয়া পরিচালনা করে, সময়ের পরিক্রমায় জীবসত্তা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বিকশিত হয়। সে মতে জীবসত্তার ধরা বাধা সংজ্ঞার মধ্যে ভাইরাসকে ফেলা যায় না।

যেভাবে ভাইরাস ছড়ায়

সরাসরি সংস্পর্শ : সংক্রমিত ও অসংক্রমিত ব্যক্তি যদি শারীরিক সংস্পর্শে আসে তাহলে আক্রান্ত ব্যক্তির দেহ থেকে ভাইরাস ছড়াতে পারে। যেমন : চুম্বন, কামড়, যৌন সম্পর্ক। পরোক্ষভাবে : ভাইরাস সংক্রমিত বস্তু বা উপাদানের মাধ্যমেও ছড়াতে পারে। যেমন : পানি ও খাদ্যে সংক্রমিত হলে ছড়াতে পারে। বায়ুর মাধ্যমে : শ্বাস প্রশ্বাস, হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ভাইরাস এক জনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

ভাইরাসের ইতিহাস : ১৮৮৬ সালে নেদারল্যান্ডসের প্রাণরসায়নবিদ এডলফ মেয়ার তামাক গাছের ‘মোজাইক’ ভাইরাস রোগ নিয়ে সর্বপ্রথম কাজ শুরু করেন। রোগটি বান্ট, রাস্ট বা স্মাট নামে পরিচিত ছিল। মেয়ার রোগটিকে টোবাকো মোজাইক নাম দেন। ১৮৯২ সালে রাশান জীবাণুবিদ দিমিত্রি ইভানোভস্কি তামাক গাছের মোজাইক রোগ নিয়ে গবেষণা করে প্রমাণ করেন, রোগাক্রান্ত তামাক পাতার রস ব্যাকটেরিয়া নিরোধক চেম্বারল্যান্ড ফিল্টার দিয়ে  ফিল্টার করার পরও সুস্থ তামাক গাছে রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম। তখন তিনি এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেন, তামাক গাছে রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু ব্যাকটেরিয়া হতে নিঃসৃত কোনো বিষাক্ত পদার্থ কিংবা এর চেয়েও ক্ষুদ্রকার কোনো জীবাণু। ডাচ জীবাণুতত্ত্ববিদ মারটিনিয়াস বাইজেরিনিক ১৮৯৮ সালে অনুমান করেন, তামাকের এ রোগের কারণ হয়তো কোনো এক ধরনের সংক্রমণশীল জীবন্ত তরল পদার্থ। তিনিই সর্বপ্রথম এ পদার্থকে ভাইরাস নাম দেন। পরবর্তীতে ১৯৩৫ সালে মার্কিন জীব-রসায়নবিদ ডব্লু এম স্ট্যানলি তামাকের মোজাইক ভাইরাসকে পৃথক করে কেলাসিত করতে সক্ষম হন। ফ্রয়েংকাল-কনরোট ও অন্যান্য গবেষক ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় ভাইরাসের নিউক্লিক এসিডকে প্রোটিন হতে পৃথক করেন এবং প্রমাণ করেন যে, নিউক্লিক এসিডই ভাইরাস রোগের বাহক।

বর্তমানে কীভাবে ভাইরাস বিকশিত হচ্ছে সে ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন করেছেন; কিন্তু তারা এখন পর্যন্ত খুবই সামান্য জানতে পেরেছেন কীভাবে আদিতে এর উত্পত্তি হয়েছে। পৃথিবীতে যেকোনো প্রাণের উত্পত্তি বা বিকাশের ইতিহাস জানতে বিজ্ঞানীরা মূলত ফসিল রেকর্ড এবং একই ধরনের ঐতিহাসিক সাক্ষ্যপ্রমাণের শরণাপন্ন হন। কিন্তু ভাইরাসের ফসিল নেই। বিজ্ঞানীরা ভাইরাসের বিকাশের ইতিহাস জানতে শুধু হাইপোথিসিসের আশ্রয় নেন এখন কীভাবে ভাইরাসের বিকাশ হচ্ছে। এক্ষেত্রে তারা বায়োক্যামিকাল এবং জেনেটিক তথ্য ব্যবহার করে থাকে।

ধারণা করা হয়ে থাকে, প্রায় ৩৮০ ট্রিলিয়ন ভাইরাস আমাদের ঘিরে আছে। কিন্তু সব ভাইরাসই বিপজ্জনক নয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, এই ভাইরাস আমাদের শরীরে থাকা ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করে, যা ব্যাকটেরিয়োফ্যাজেস নামে পরিচিত।

সারাবিশ্বের আলোচিত যত ভাইরাস

ইবোলা : ১৯৭৬ সালে পরপর দুটি প্রাদুর্ভাবের পর এ ভাইরাসের বিষয়টি সামনে আসে। এর প্রথম প্রাদুর্ভাব ঘটে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কংগোতে। ইবোলা নদীর কাছে এক গ্রামে। ঐ নদীর নামেই ভাইরাসের নামকরণ। দ্বিতীয় প্রাদুর্ভাব ঘটে বর্তমান দক্ষিণ সুদানে, যা কংগো থেকে ৫০০ মাইল দূরে। বিজ্ঞানীরা প্রথমে মনে করেছিল একই ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি দুই স্থানে গিয়ে এর প্রাদুর্ভাব ঘটিয়ে ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে আবিষ্কার হয় দুটি জিনগত আলাদা ভাইরাসের কারণে এ সংক্রমণ। বিজ্ঞানীরা তখন আরো জানতে পারে যে, ঐ প্রাদুর্ভাবের বহু আগেও ইবোলা ভাইরাসের অস্তিত্ব ছিল। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অরণ্য দখল এবং বন্যপ্রাণীর আহারের কারণে ইবোলার বিস্তার লাভ করে। ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালে ইবোলা ভাইরাসে ১১ হাজার ৩০০ জন মারা যান। গিনিয়া, লাইবেরিয়া, সিয়েরা লিওনসহ আফ্রিকান দেশে এটি তখন ছড়ায়। ‘ইবোলা জোয়ারে’ সংক্রমিত ৯০ শতাংশ মানুষই মারা যায়। ইবোলা ভাইরাসের কারণে আক্রান্ত ব্যক্তির তীব্র জ্বর হয় এবং রক্তপাত হয়ে থাকে। ঐ রক্ত  কিংবা তার শরীরের অন্যান্য ফ্লুইড হতে মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। 

সিভিয়ার অ্যাকুইট রেসপিরেটরি সিনড্রোম বা সার্স : ২০০৩ সালে চীনে ব্যাপকহারে সংক্রমণ ঘটা সার্সকে করোনা ভাইরাসের নিকটাত্মীয় বলা যায়। গত সোমবার নেচার ম্যাগাজিনে প্রকাশিত দুটি গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়, দুটি ক্ষেত্রেই বাদুড় থেকে এ ভাইরাস ছড়িয়েছে। তবে এমন নয় যে, বাদুড় থেকে সরাসরি মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়েছে বরং বিজ্ঞানীর ধারণা করছেন, বাদুড় মধ্যবর্তীতে অন্য কোনো প্রাণীকে সংক্রমিত করেছে এবং সেটি বা সেগুলো মানুষকে ছড়িয়েছে। বাদুড় ও গন্ধগোকুলের শরীরে সার্স ও করোনা ভাইরাস পাওয়া গেছে। ২০০২-০৩ সালে সার্স ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চীনের মূল ভূখণ্ডে ৩৪৯ জন মারা গেছে। ২০০২ সালের ১৬ নভেম্বর চীনের গুয়াংডং প্রদেশের এক জন কৃষকের শরীরে প্রথম সার্স দেখা দেয়। সিডিসির মতে সার্সে এখন পর্যন্ত সারা বিশ্বে ৮ হাজার ৯৮ জন আক্রান্ত হয়েছে। নিহতের সংখ্যা ৭৭৪ জন। মৃত্যুহার ১০ শতাংশ।

মারবার্গ ভাইরাস : ১৯৬৭ সালে জার্মানির একটি ল্যাবরেটরিতে কর্মীদের মধ্যে সর্বপ্রথম এ ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দেয়। তারা উগান্ডা থেকে আনা বানর নিয়ে কাজ করছিলেন। ইবোলার মতো এই ভাইরাসে আক্রান্তদের তীব্র জ্বরের সঙ্গে রক্তক্ষরণ হয়ে থাকে। তখন মৃত্যুহার ছিল ২৫ শতাংশ। ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কংগোতে ১৯৯৮-২০০০ সালে প্রাদুর্ভাবের সময় মৃত্যুহার ৮০ শতাংশ হয়ে যায়। ২০০৫ সালে অ্যাংগোলায় আবার এর প্রাদুর্ভাব ঘটে।

র্যাবিস :১৯২০-এর দশকে পোষা প্রাণীদের শরীরে র্যাবিসের ভ্যাকসিন পুশ করা হতে থাকে। উন্নত বিশ্বে এই রোগ তেমন না হলেও আফ্রিকা ও ভারতে এখনো এর ঝুঁকি আছে। এই ভাইরাস সংক্রমণে মস্তিষ্কের ব্যাপক ক্ষতি হয় এবং এতে মৃত্যু অবধারিত।

এইচআইভি :আধুনিক বিশ্বের অন্যতম খুনি ভাইরাস হলো এইচআইভি। ১৯৮০-এর দশকে এই ভাইরাস শনাক্তের পর এখন পর্যন্ত ৩৬ মিলিয়ন মানুষ মারা গেছে। এইচআইভি মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়, ফলে নানা সংক্রামক রোগ ও কয়েক রকম ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে রোগী মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ে। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ৩ হাজার ৬৭৪ জন ব্যক্তি এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত; আর ঝুঁকিতে আছে আরো ১৪ হাজার ৩০০ জন। গুটিবসন্ত :১৯৮০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পৃথিবীকে গুটিবসন্ত মুক্ত ঘোষণা করেছে। কিন্তু তার আগে হাজার হাজার বছর ধরে মানুষকে এই ভাইরাসের সঙ্গে লড়তে হয়েছে।

হানটা ভাইরাস :১৯৯৩ সালে আমেরিকায় এই ভাইরাস ব্যাপক আলোচিত হয়। এ পর্যন্ত ৬০০ মার্কিন নাগরিক এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৬ জন মারা গেছে। সিডিসির তথ্যমতে, ১৯৫০-এর দশকে কোরিয়া যুদ্ধের সময় ভিন্ন এক ধরনের হানটা ভাইরাসে অনেকে সংক্রমিত হয়েছে।

ইনফ্লুয়েঞ্জা :বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একটি সাধারণ ফ্লু মৌসুমে সারা বিশ্বে ৫ লাখ লোকের মতো মারা পড়তে পারে ইনফ্লুয়েঞ্জায়। ১৯১৮ সালের দিকে এটি সারা বিশ্বে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। সারা বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ এতে আক্রান্ত হয়।

ডেঙ্গু :ডেঙ্গুর তিক্ত ও করুণ অভিজ্ঞতা এখনো আমাদের মনে দাগ কেটে আছে। ১৯৫০-এর দশকে ফিলিপাইনস এবং থাইল্যান্ডে সর্বপ্রথম ডেঙ্গু ছড়ায়। বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ ডেঙ্গু মহামারি হতে পারে এমন এলাকায় বসবাস করছে। ........ রোটা ভাইরাস :এই ভাইরাস সংক্রমিত হলে তীব্র ডায়রিয়া, পেটে পীড়া, বমি হতে পারে। এর হাত থেকে বাঁচতে এখন দুই ধরনের ভ্যাকসিন পাওয়া যায়। শিশু ও বয়স্করা বেশি এ ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে। এক্ষেত্রে তারা যা কিছু স্পর্শ করে সেখানেই ছড়িয়ে পড়ে ভাইরাস।  নিপা ভাইরাস :বাদুড় থেকে সংক্রমিত হয়। খেঁজুর রসে এটি ছড়িয়ে পড়ে।

মেনিনজাইটিস :আক্রান্ত ব্যক্তির লালা, নাকের ঝিল্লি থেকে মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। অত্যন্ত প্রাণঘাতী এটি।

সোয়াইন ফ্লু :২০০৯ সালে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের নতুন প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। সাধারণত একে সোয়াইন ফ্লু নামে ডাকা হয়। যদিও ভাইরাসটি শুকরের মাধ্যমে নয় বরং মানুষের মাধ্যমে ছড়ায়। এর কারণে মিশর তাদের দেশের সব শুকর মেরে ফেলেছিল। এ যাবত্ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সোয়াইন ফ্লুতে আক্রান্তের খবর পাওয়া গেছে। ২০০৯ সালের আগস্ট পর্যন্ত এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৮২ হাজার। মৃত্যু ঘটেছে ১ হাজার ৭৯৯ জনের। বিশ্বের প্রায় সবকটি মহাদেশেই (৭৪টি দেশে) এই ভাইরাসের উপস্থিতি চিহ্নিত করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে ৫২২ জনের মৃত্যুর হয়েছে। ২০০৯ সালের ১৮ জুন বাংলাদেশে প্রথম সোয়াইন ফ্লু শনাক্ত করা হয়। ১৭ বছর বয়স্ক রোগী যুক্তরাষ্ট্র সফর করে দেশে ফিরে অসুস্থ হয়ে পড়েন। সরকারের গভীর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে রোগীর দেহে সোয়াইন ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের উপস্থিতি নির্ণয় করা হয়। তবে রোগীরা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠেন। বাংলাদেশে এই যাবত্ ১০২ ব্যক্তির মাঝে সোয়াইন ফ্লু ভাইরাস পাওয়া গেছে। যদিও কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।

করোনা ভাইরাস :একে করোনা ভাইরাস বলে উল্লেখ করা হলেও এটা আসলে ঐ ভাইরাসটির নাম নয়। বরং ভাইরাসের যে গ্রুপ বা দলে এটির অবস্থান সেটির নাম করোনা ভাইরাস। এটির সাময়িক একটা নামও দেওয়া হয়েছিল ২০১৯-এনকভ হিসেবে। বিজ্ঞানীরা একে নোভেল বা নতুন করোনা ভাইরাস নামে ডাকছেন। কঠোরভাবে কোয়ারেন্টাইন এবং ব্যাপক সচেতনতার পরেও রোধ করা যাচ্ছে না এর ছড়িয়ে পড়া। গত বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত সারাবিশ্বে ২৮ হাজার ২৫৬ জন এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। শুধু চীনেই আক্রান্ত হয়েছেন ২৮ হাজার। এ পর্যন্ত ৫৬৩ জন এ রোগে মারা গেছেন। এর মধ্যে চীনের বাইরে মারা গেছেন দুই জন। এদের একজন ফিলিপাইনে অন্যজন হংকংয়ে। এমনকি দুই জন নবজাতক শিশু এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে।