‘ভ্যাঁ’ দিবসের কিসসা

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৯:৪৩

/ রুবেল কান্তি নাথ

 

হন্তদন্ত হয়ে মোতালেব ভাইকে ছুটতে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভাই, এভাবে এত তাড়াহুড়ো করে কোথায় যাচ্ছেন?’

মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে তিনি বললেন, ‘আরে মিয়া, জানোনি আজকে কী দিবস?’

‘না তো, ভাই! আসলে কোন দিন কী দিবস এসব আমার ঠিক মনে থাকে না।

‘ধুর মিয়া, এইটা কুনো কথা কইলেন! আইজ হইলো ভ্যাঁ দিবস। এইটাও মনে নাই আপনার? আপনে মানুষ নাকি জিন?’

ভাইয়ের ভ্যাঁ দিবসের কথা শুনে মাথাটা কেমন যেন চক্কর দিয়ে ওঠল। ম্যাঁ দিবস থুড়ি, মে দিবসের কথা জানি। কিন্তু ‘ভ্যাঁ দিবস’ এটা আবার কী! বাপের জন্মেও তো এই দিবসের কথা শুনিনি।

হতেও পারে। এখন প্রতিদিনই কোনো না কোনো দিবস মহা সাড়ম্বরে পালন করা হচ্ছে। এটাও বোধহয় ওরকম কোনো দিবস হবে। তবু ওই দিবসের মাজেজা সম্পর্কে অবহিত হতে ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভাই, এই দিবসে মানুষ করেটা কী? মানে, দিবসটা পালন করে কীভাবে?’

‘ওরে আমার মূর্খ রে! এই দিবসে মানুষ ভালোবাসাবাসি করে। একজন আরেকজনরে পেয়ার করে। মহব্বত করে। একে অন্যের লগে ইটিসপিটিস করে। এক লগে সিনেমা দেখে। এক লগে বাদাম খায়। এক লগে চাইনিজে যায়। একজন আরেকজনরে কিস খায়। আরও... আরও অনেককিছু করে। এত কিছু আপনের জাইনা লাভ নাই।’

আমার বুঝতে বাকি রইল না মোতালেব ভাই আসলে ‘ভালোবাসা দিবস’ তথা ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’র কথা বলছেন। সংক্ষেপে ‘ভ্যাঁ দিবস’ হিসেবে চালিয়ে দিয়েছেন।

তবুও আমি না বোঝার ভান করে বলি, ‘ভাই, এই দিবসের কথা তো কখনও শুনি নাই। আপনার মুখ থেকেই প্রথম শুনলাম মনে হয়। তা আপনি তো জানি বিবাহিত। মানে মৃত! তো মরা মানুষ হয়ে এই দিবসে ভাবী সাহেবার সঙ্গে ভালোবাসাবাসি না করে যাচ্ছেন কই?’

‘ধুর মিয়া, এই ধরেন প্রত্যেকদিন এক তরকারিতে ভাত খাইতে ভাল্লাগে না, ঠেলায়, ঘুরতে... থুক্কু, কী কইতে কী কই! আজকে সুযোগ পাইছি বইলা দান মারতে যাইতেছি ফয়েজ লেকে। ভাগ্যে যদি একটা পাখি-টাখি জুইটা যায়!’

ওরে বাটপার! ওরে বাটপার!! ভাইয়ের বাটপারির প্রশংসা না করে পারছি না। কিন্তু এটা যে অনুচিত কাজ বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারছি। ভাইকে যে করেই হোক এই অবৈধ কাজ থেকে বিরত রাখতে হবে। কারণ তিনি বিবাহিত। আর বিবাহিতরা যত ভালোবাসাবাসিই করুক, তাদের সঙ্গী-সঙ্গীনির সাথেই করাকে আমি সম্মানের চোখে দেখি।

ভালোবাসা দিবসের ভালোবাসাটা শুধুমাত্র প্রেমিক-প্রেমিকা বা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সবার প্রতিই ভালোবাসা প্রকাশ করা যায়। মা, বাবা, ভাই, বোন, বন্ধু, স্বজন, শিক্ষক, ছাত্র, ছোটজন, গুরুজন তথা সবার প্রতি। এমনকি গাছপালা থেকে শুরু করে সকল পশু-পাখির প্রতি, সকল জীবের প্রতিও ভালোবাসা নিবেদন করা যায়। তবে তা যেন একটিমাত্র দিনে সীমাবদ্ধ না থেকে বছরের ৩৬৫ দিনই হয়।

যাই হোক, মনের কথা মনে রেখেই ভাইকে বলি, ‘আপনার এই বাটপারির কথা কি ভাবী সাহেবা জানেন?

‘কী!’ বলেই ভয়ে হেঁচকি উঠে গেল ভাইয়ের।

‘না মানে, এইখানে আবার আপনের ভাবীরে টানতেছেন ক্যান?’

মূর্খ-টুর্খ অনেককিছু বলেছেন তিনি আমাকে। আমি কিছু বলিনি এতক্ষণ। বল এবার আমার কোর্টে। বুঝতেই পারছি, ভাবীর কথা শুনে ভাইয়ের অবস্থা কেরোসিন। একটা কথা জানি, সেটা হলো—স্বামী যতই শক্তিশালী, বীর পুরুষ হোক না কেন, স্ত্রীর সামনে পড়লেই মিঁয়াও! মানে বিলাই। বিড়াল।

ভাইয়ের এই দুর্বল জায়গায় মোক্ষম আঘাত হানলাম, ‘ভাই, এটা কিন্তু ঠিক হচ্ছে না। আমি ভাবীকে কল দিচ্ছি।’

‘ভাই রে, ও রুবেল ভাই, আপনে আমার ধর্মের ভাই, দয়া কইরা আমারে এই মহা মুসিবতে ফেলাইয়েন না। আমার ভুল হইয়া গেছে, ভাই, ভাই, ভাই...’

বেচারার কাঁদো কাঁদো অবস্থা। সত্যিই মায়া হলো তার জন্য। যে মায়ার আরেক নাম— ভালোবাসা। ভাইয়ের এহেন কোঁকানি কি মেনে নেওয়া যায়! এমনিতেই আমাদের প্রিয় ভাই বলে কথা।

তাই বিপদে না ফেলে ভাইকে বলি, ‘ভাই, একটা কাজ করেন। ভাবীকে নিয়ে আজ ফয়েজ লেকে বেড়িয়ে আসুন। দেখবেন দুজনেরই ভালো লাগবে।’

কথাটা শেষ হওয়ার দেরি, তার আগেই ভাই বাড়িমুখো ছুট দিলেন।

বেশ কিছুক্ষণ পর ভাই আর ভাবীকে দেখলাম, সেজেগুজে বেড়াতে বের হয়েছেন। তাদের হাসিখুশি মুখ দেখে মনে মনে ভাবছি, আহা, বাংলাদেশের সকল মানুষ যদি এভাবে সবসময় হাসিখুশি থাকত।   g