বসন্তের কবিতা

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৯:৪৮

/ আবুল কালাম আজাদ

 

আমাদের বন্ধু রমজান আলী কবিতা লিখতে শুরু করেছে বছর দুই হলো। কবিতা লেখা শুরু করার পর নামে একটু পরিবর্তন এনেছে। নাম রেখেছে, রুদ্র রমজান।

শুনেছি, রবীন্দ্রনাথ সারাজীবনে যা লিখেছেন, তা যদি কেউ দেখে দেখে কপি করতে চায় তাহলে তার পঁচিশ বছর লাগবে। আমাদের বন্ধু রমজান আলী, থুক্কু রুদ্র রমজান যদি একাশি বছরের জীবন পায় তাহলে সে যত কবিতা লিখবে তা কপি করতে গেলে যে কারও লাগবে তেপ্পান্ন বছর। এই হিসাবটা বের করেছে আমাদের বন্ধু তাজুল। ও মেথমেটিকসে খুব ভালো। কোন সূত্র প্রয়োগ করে ও এটা বের করেছে তা আমরা কেউ জানি না। তবে ওর হিসাবটা আমরা মোটামুটি বিশ্বাস করি।

রুদ্র রমজান ঘণ্টায় ঘণ্টায় নতুন কবিতা প্রসব করে আর আমার আমাদের পড়ে শোনায়। শুধু শুনলে হবে না, তার কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে হবে। তবে সমালোচনা করা যাবে না, কোনো ভুল ধরা যাবে না। আমরা সেটা করিও না।

কারো হয়ত শরীরটা তেমন ভালো না, কারো হয়ত বাসায় কিছু ঝামেলা হয়েছে, কারো হয়ত প্রেমিকার সাথে মহাঝামেলা চলছে, রুদ্র রমজান এসব আমলে নেবে না। ওর কবিতা শুনতে হবে এবং তা নিয়ে আলোচনা করতে হবে। ওর থেকে দূরে থেকেও রেহাই নেই। ও ফোন করে কবিতা শোনাবে।

আমরা কবিতার নির্মম যাতনা হজম করে নেই দাঁত-মুখ চেপে। কিন্তু শিপলুটা তা পারে না। ও রুদ্র রমজানের সাথে তর্ক করে: দ্যাখ রমজান আলী, শুধু কবিতা লিখলে হবে না, মানুষের মন-মানসিকতাও বুঝতে হবে।

: রমজান আলী না, রুদ্র রমজান।

: দ্যাখ রুদ্র রমজান, তুই গত শীতে শীতকাল নিয়ে ৩৭টি কবিতা লিখেছিস, আর এই শীতেও একের পর এক...।

: তাতে সমস্যা কী? প্রতিটা কবিতায় শীতের একেক রূপ বৈচিত্র্য তুলে ধরা হয়েছে। কোনোটায় খেজুরের রস, আবার কোনোটায় সর্ষেফুল। বোরিং ফিল করার তো কোনো কারণ দেখি না। প্রকৃতির রূপের সূক্ষ্মতম পার্থক্য কি তোদের চোখে ধরা পড়ে? সেটা ধরা পড়ে আমার চোখে। তোদের হলো গরুর চোখ, আমার হলো কবির চোখ। তোরা শুধু ঘাস দেখিস, আমি ঘাসফুলও দেখি।

শীতের কবিতা শুনতে শুনতে বসন্ত এসে গেল। রুদ্র রমজান বসন্তে কবিতা লেখায় মত্ত হলো। আমরা বসন্তের কবিতা শুনি।

বসন্তের শুরুতেই শিপলু বসন্ত রোগে আক্রান্ত হলো। জলবসন্ত। শরীরে বড় বড় গোটা। ভেতরে পানির মতো। সারা শরীরে ব্যথা। চিটমিট চুলকানি। জ্বরজ্বর ভাব। মুখে স্বাদ নেই। গৃহবন্দি। তারপরও শিপলু খুশি। বসন্তের কবিতা যাতনা সইতে হচ্ছে না।

আমরা শিপলুকে দেখতে যাই। কিন্তু কবি রুদ্র রমজান যায় না। বসন্ত রোগটা আবার ছোঁয়াচে। যদি তাকে ধরে বসে! তাহলে যে কবিতা লেখায় মনোনিবেশ থাকবে না। একটা বসন্ত ব্যর্থ হয়ে যাবে। একজন কবির জন্য এ বড়ই কষ্টের।

রুদ্র রমজান শিপলুকে ফোন করল—

: দোস্ত, কেমন আছো?

: খুব ভালো আছি।

: বলো কি! গা ভর্তি বসন্তের গোটা নিয়েও ভালো আছো?

: হ, ভালো আছি।

: শোনো, পানিতে নিমপাতা দিয়ে গোসল করবা।

: আইচ্ছা।

: আর হোমিও খাইও না, তায়লে আরও বেশি উঠবে। অ্যালোপ্যাথি খাও।

: আইচ্ছা।

: তা দোস্ত, তুমি তো চায়ের দোকানে আসতে পারো না। ফোনেই কয়েকটা কবিতা শোনো।

: সেরে উঠি তারপরে...।

: আরে না। গরম গরম শুনতে মজা। সবাই শুনছে। ব্যাপক প্রশংসা করছে। তুমি শুধু ফোনে কান লাগায়া থাকবা...।

: কবিতা কী বিষয়ে?

: বসন্ত।

: তুমি বসন্ত রোগ নিয়েও কবিতা লেখো! আবার বসন্ত রোগীকে সেই কবিতা শোনাতে চাও? রোগীর সাথে এ একরকম তামাশা।

: আরে ধুর! বসন্ত রোগ নিয়া না। ঋতুরাজ বসন্তকে নিয়ে লেখা। ছোট ছোট গীতিকবিতা। রবীন্দ্রনাথের বসন্তের কবিতাগুলো খুব ভালো করে পড়ে নিয়ে তারপর লিখেছি।

: আইচ্ছা, একটা পড়ো তাহলে...।

: পড়তেছি, শোনো দোস্ত....

 

আহা আজি এ বসন্তে এত ফুল ফোটে

এত বাঁশি বাজে, এত পাখি গায়,

সখীর হূদয় কুসুম-কমল—

কাহার অনাদরে আজি ঝরে যায়।

কেন কাছে আসো, কেন মিছে হাসো

কাছে যে আসিত সে তো আসিতে না চায়।

সুখে আছে যারা, সুখে থাক তারা

দুঃখিনী নারীর নয়নের নীর

সুখিজনে যেন দেখিতে না পায়।

তারা দেখেও দেখে না, তারা বুঝেও বোঝে না

তারা ফিরেও না চায়।

কবিতা শুনে শিপলু মন-প্রাণ উজাড় করে প্রশংসা করতে লাগল : তুই এ যাবতকালে যত কবিতা লিখেছিস, একমাত্র এটাই হয়েছে একটা কবিতা। অতুলনীয় এক গীতিকবিতা। তোর কণ্ঠে না শুনে মিতা হকের কণ্ঠে শুনলে আরও ভালো লাগতো।

রুদ্র রমজান ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলল : দোস্ত, মহাসর্বনাশ হয়ে গেছে! রবীন্দ্রনাথের কিছু বসন্তের গীতিকবিতা আমার ডায়েরিতে লেখা ছিল। সেখান থেকেই একটা...। দুঃখিত দোস্ত, এবার আমারটা শোন। রবীন্দ্রনাথেরগুলা তো পুরানা ধাছের। দোস্ত... শিপলু... দোস্ত হ্যালো...! হ্যালো...!

শিপলু ফোন কেটে দিয়েছে। শুধু তাই না, ফোনটা বন্ধও করে দিয়েছে।

রুদ্র রমজান মাথা চাপড়াতে লাগল।   g