চীনে কাঁকড়া ও কুঁচিয়া রপ্তানি বন্ধ চাষি ব্যবসায়ী ও শ্রমিক বিপাকে

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:১৭

করোনা ভাইরাসের প্রভাব

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি

করোনা ভাইরাসের কারণে গত ২৫ জানুয়ারি থেকে চীনে রপ্তানি হচ্ছে না সাতক্ষীরার কাঁকড়া ও কুঁচিয়া। ফলে কাঁকড়া-কুঁচিয়া আহরণ ও রপ্তানির সঙ্গে সম্পৃক্ত সাতক্ষীরা জেলার কয়েক হাজার মানুষ পড়েছেন বিপাকে।

দেবহাটার পারুলিয়া বাজারের হেমন্ত এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী হেমন্ত দুলাই বলেন, গত ছয় বছর ধরে তিনি পারুলিয়া বাজারে কাঁকড়া ও কুঁচিয়া কেনাবেচা করে থাকেন। সাতক্ষীরার কালিগঞ্জের উজিরপুর, দেবহাটার গাজীরহাট, পারুলিয়া, কুলিয়া ও আশাশুনির বদরতলাসহ বিভিন্ন বাজার থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এই বাজারে কাঁকড়া ও কুঁচিয়া বিক্রি করে থাকেন। এই বাজারে তিনি একাই কুঁচিয়া কিনলেও কাঁকড়া কেনেন অনেকে। এক সময় কাঁকড়া ও কুঁচিয়া প্রাকৃতিকভাবে নদী, খাল, পুকুর ও বিভিন্ন জলাশয়ে পাওয়া যেত। সাতক্ষীরায় সাধারণত মিষ্টি পানির কুঁচিয়া ও লোনা পানির কাঁকড়া পাওয়া যায়। মিষ্টি পানির কুঁচিয়া প্রতি কেজি ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হয়। আর লোনা পানির কুঁচিয়া বিক্রি হয় ১০০ থেকে ১১০ টাকা কেজি।

তিনি আরো বলেন, আগে হিন্দু ও খ্রিষ্টান সমপ্রদায়ের মানুষ মিষ্টি পানির কুঁচিয়া খেত। তখন কম দামেই মিলত এসব। কয়েক বছর আগে চীনসহ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ বাংলাদেশের কুঁচিয়ার ওপর ঝুঁকে পড়ে। ফলে শুরু হয় বাংলাদেশ থেকে ঐসব দেশে কাঁকড়া ও কুঁচিয়া রপ্তানি। তখন থেকেই কাঁকড়া গ্রেড অনুযায়ী বিক্রি শুরু হয়। কাঁকড়ার আকার ও গুণগত মান অনুযায়ী কেজিপ্রতি চীনে বিক্রি হতো ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায়। ফলে সাতক্ষীরার মানুষ কাঁকড়া ও কুঁচিয়া সংগ্রহের প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়ে। চীনে রপ্তানির জন্য তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে দুই-তিন দিন পর পর পাঁচ থেকে ছয় টন কুঁচিয়া ঢাকার উত্তরায় পাঠনো হতো। কিন্তু করোনা ভাইরাস আক্রমণের ফলে গত ২৫ জানুয়ারি থেকে চীনে কাঁকড়া ও কুঁচিয়া রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে খরিদ্দার না থাকায় বেশ কিছু কুঁচিয়া মারা যাচ্ছে। মরা এই কুঁচিয়া শুকিয়ে কাঁকড়া ধরার কাজে ব্যবহূত হচ্ছে শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ, কলবাড়ি ও বুড়িগোয়ালিনী এলাকায়। শুকনা কুঁচিয়া প্রতি কেজি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়।

একই কথা জানালেন পারুলিয়া বাজারের সন্দীপ পোইট, প্রসেনজিত্ মণ্ডল ও আবুল কাশেম।

দক্ষিণ পারুলিয়ার সুনীল ভুঁইয়া বলেন, তিনি গত ১২ বছর ধরে কুঁচিয়া মজুত করে ঢাকায় পাঠান। তিনিসহ ছয় জন এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। চীনে কুঁচিয়া রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বাজার থেকে কিনে ঘরে রাখা কুঁচিয়ার একটি বড়ো অংশ মারা যাচ্ছে। ফলে তারা আর্থিকভাবে লোকসানের মুখে পড়েছেন। একই গ্রামের মৃণাল ভুঁইয়া বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি বাজার থেকে কুঁচিয়া সংগ্রহ করে পারুলিয়াসহ বিভিন্ন সেটে বিক্রি করে জীবনজীবিকা নির্বাহ করতেন। সাতক্ষীরা থেকে চীনে কুঁচিয়া রপ্তানি বন্ধ হওয়ার পর গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে সংসারে অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে।

পারুলিয়া বাজারের কাঁকড়া ব্যবসায়ী মনিরুজ্জামান মনু, মিজানুর রহমান ও শাহীন ইসলাম বলেন, হঠাত্ করে চীনে কাঁকড়া ও কুঁচিয়া রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঢাকার মহাজনদের কাছ থেকে তারা তাদের বকেয়া টাকা পাচ্ছেন না। ফলে ঘের মালিক ও খুচরা ব্যবসায়ীদের পাওনা টাকা পরিশোধ করতে না পেরে তারা বিপাকে পড়েছেন। একই কথা জানালেন, কালিগঞ্জ উপজেলার উজিরপুরের কাঁকড়া ও কুঁচিয়া ব্যবসায়ী আব্দুল বারী ও মিজানুর রহমান। সাতক্ষীরা জেলা কাঁকড়া ও কুঁচিয়া ব্যবসায়ী সমিতির সহসাধারণ সম্পাদক বাসুদেব মণ্ডল বলেন, ঢাকার উত্তরার তমা এন্টারপ্রাইজ, জ্যোতি এন্টারপ্রাইজ ও জেড এল এন্টারপ্রাইজ, কাশেম ইন্টারন্যাশনাল ও সিরাজ ইন্টারন্যাশনালসহ কয়েকটি কোম্পানিকে তারা কাঁকড়া ও কুঁচিয়া সরবরাহ করে থাকেন। ঐ সব কোম্পানি মূলত চীন ও উত্তর কোরিয়ায় কাঁকড়া ও কুঁচিয়া রপ্তানি করত। গত ২৫ জানুয়ারি থেকে চীনে কাঁকড়া ও কুঁচিয়া রপ্তানি বন্ধ হওয়ায় সাতক্ষীরার ব্যবসায়ীদের প্রায় ১০ কোটি টাকা ঢাকার রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে আটকা পড়েছে। এতে করে সাতক্ষীরার অনেক ব্যবসায়ী তাদের ঘর বন্ধ করে দিয়েছেন।

সাতক্ষীরা জেলা মত্স কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন, ২৫ জানুয়ারি থেকে কুঁচে ও কাঁকড়া রফতানি বন্ধ রয়েছে। এতে রফতানিকারক-চাষিসহ সংশ্লিষ্ট সবাই ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছেন।