ফিরে দেখা

গণবিক্ষোভের মুখে মুসলিম লীগ দলের নাভিঃশ্বাস

আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ২০:৩২

উপদলীয় চক্রের ক্ষমতা দখলের দ্বন্দ্বেও লীগের সমাধি রচনার সম্ভাবনা

কেন্দ্রীয় কোটারীর শক্তির কাছে নুরুল আমীনের প্রথম পরাজয়

(ইত্তেফাকের রাজনৈতিক ভাষ্যকার)

লীগশাহীর বিরুদ্ধে জনমত যতই বিক্ষুব্ধ হইয়া উঠিতেছে, তাদের ভিতরকার অন্তর্দ্বন্দ্বও ততই বাড়িয়া যাইতেছে। পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে এবং লীগবিরোধী যুক্তফ্রন্ট গঠনের ধাক্কায় সারা পাকিস্তানে মুসলিম লীগ ধসিয়া পড়িতেছে। পশ্চিম পাকিস্তানে তথাকথিত মুসলিম লীগের পাত্তা গুটাইতে হইয়াছে। পাঞ্জাব, সিন্ধু ও বেলুচিস্থানের মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠানসমূহ একদম ভাঙ্গিয়া দেওয়া হইয়াছে।

ক্ষমতায় আঁকড়াইয়া থাকিবার ভিত্তিতে গঠিত মুসলিম লীগে ক্ষমতা দখলের কোন্দলের ফলেই সারা পশ্চিম পাকিস্তানের মুসলিম লীগের ‘অস্তিত্ব’ বিপন্ন হইল। গুরমানী-ফিরোজ নুন প্রভাবান্বিত কেন্দ্রীয় দলটিকে রক্ষা করিবার উদ্দেশ্যেই ভাঙ্গা-গড়ার এই ‘বৈপ্লবিক’ কাণ্ডটা ঘটিয়াছে বলিয়া রাজনৈতিক মহলের ধারণা।

পাঞ্জাবের প্রাক্তন মন্ত্রী মমতাজ দৌলতানার দল লীগ সভাপতি মালিক ফিরোজ খান নুনের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনয়ন করিয়াছিলেন। এই পরিস্থিতি হইতে মালিক নুনকে বাঁচাইবার জন্যই গোটা প্রাদেশিক মুসলিম লীগই বাতিল করা হইল। বরখাস্ত মন্ত্রী ও বর্তমানে সিন্ধু প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পীরজাদা আবদুস সাত্তার ও খুরো গ্রুপের মধ্যে যে প্রতিযোগিতা চলিতেছিল, তাহার পরিণতিতে সিন্ধু লীগ এবং বেলুচিস্থানের কাজী মোহাম্মদ ইসা প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলীর সহিত লীগ সভাপতির পদের জন্য প্রতিযোগিতা করার অপরাধে বেলুচিস্থান লীগ ভাঙ্গিয়া দেওয়া হইয়াছে।

পশ্চিম পাকিস্তানের তিনটি প্রাদেশিক লীগকে মোহাম্মদ আলী ও তাঁর পকেটের তিনজন সদস্য মিলিয়া যেভাবে এক তুড়িতে উড়াইয়া দিলেন, উহা হইতে আর একবার প্রমাণিত হইল যে, মুসলিম লীগ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান নয়, ইহার পলিসি বা অস্তিত্ব নির্ভর করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত  প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সমর্থকদের উপর।

রাজনৈতিক মহল এ প্রসঙ্গে নাজিম মন্ত্রিসভার পতন ও তত্পরবর্তীকালে মুসলিম লীগের ভূমিকার উল্লেখ করিয়া বলিতেছেন যে, লীগ সভাপতি ও লীগ পার্লামেন্টারী নেতা নাজিমুদ্দিন গবর্ণর জেনারেল কর্তৃক বরখাস্ত হইবার পর মুসলিম লীগের কোন মহলই উহার প্রতিবাদ করে নাই, বরং ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত মোহাম্মদ আলীকে সমর্থন যোগাইতে লীগারদের মধ্যে দস্তুরমত প্রতিযোগিতা শুরু হইয়াছিল। এই সময়ই মুসলিম লীগের আসল রূপটি জনসাধারণের নিকট স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।

হালে পশ্চিম পাকিস্তানের তিনটি প্রাদেশিক লীগকে যেভাবে এক খোঁচায় বাতিল করা হইয়াছে, তার প্রতিক্রিয়া লীগের  পক্ষে আরও মারাত্মক হইয়াছে। যে দুই-চারিজন সরলভাবে বিশ্বাস করিত যে, ভিতর হইতে মুসলিম লীগকে সংশোধন করার সম্ভাবনা রহিয়াছে বা জনদাবী নিয়া সরকারের উপর চাপ দেওয়া যায়, তারাও শেষবারের মত মোহমুক্ত হইলেন।

এখন পূর্ব-পাকিস্তানের পালা। এখানে মোহাম্মদ আলী-গুরমানী-বিরোধী মুসলিম লীগের সরদার নিশতার মওলানা আক্রাম খান, ফজলুর  রহমানরা, নুরুল আমিন লীগের সমর্থনে কাজ করিতেছেন। কেন্দ্রীয় লীগ চক্র এ সম্পর্কে হুশিয়ার আছেন বলিয়া প্রকাশ। তাঁরা ইতিমধ্যেই কতকগুলি অভূতপূর্ব ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়াছেন। ঢাকায় কেন্দ্রীয় লীগের একটি দফতর খোলা হইয়াছে। এবং বাঙ্গালী-বিদ্বেষী মিঃ ব্রোহী শীঘ্রই লীগ টিকিট বিতরণের জন্য ঢাকায় আসিতেছেন। শুনা যায় নির্বাচনী তহবিল ও অন্যান্য ব্যাপারে মিঃ নুরুল আমিনের দলের কোন কর্তৃত্ব থাকিবে না।              

দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম সংখ্যার লিড নিউজের অংশবিশেষ