অজয় দাশগুপ্ত
বাঙালির অহংকার বাংলাদেশের বইমেলা। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় মানুষের প্রবল উত্সাহে দিন দিন বেড়ে উঠছে প্রাণের এই বইমেলা। আজ এটি সারা বিশ্বে বাংলাদেশ ও বাঙালির অহংকার। তার নানাবিধ সমস্যা সংকট আর দীনতার বিপরীতে এক প্রবল আনন্দ আর শক্তির উত্স। আমাদের দেশের ইতিহাস অনন্য অসাধারণ। নেগেটিভ বিষয়গুলো বাদ দিলে আমাদের যেসব অর্জন আছে তাতেই বেঁচে থাকতে পারে শত বছরের এই দেশ। আমাদের আগে পৃথিবীর কয়েকটি দেশে ভাষা নিয়ে সংগ্রাম বা আন্দোলন হলেও তারা আমাদের মতো করে ভাষা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণ দেয়নি বা দিনটিকে ইতিহাসে পরিণত করতে পারেনি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সবার থেকে এগিয়ে। বলাবাহুল্য, এই ভাষা আন্দোলনই বাঙালির বইমেলার প্রেরণা।
ঢাকার বইমেলাটি শুরু হয়েছিল নিতান্ত সাধারণভাবে। মুক্তধারার চিত্তরঞ্জন সাহা বন্ধন মুক্ত করে দিয়েছিলেন বইকে। চাদর, চাটাই ও পাটি বিছিয়ে, কিছু বই রেখে যে মেলার শুরু, তার ব্যাপ্তি আজ অন্য উচ্চতায়। কিন্তু আমরা যেহেতু বাঙালি আর বাংলাভাষার মানুষ, আমাদের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে উভয় বাংলার ইতিহাস। তখন আমরা ছিলাম এক দেশের বাসিন্দা। সে সূত্রে মূলত প্রথম বইমেলার শুরু ১০২ বছর আগে। কলকাতার কলেজ স্ট্রিট চত্বর ঘিরে বসেছিল বইয়ের প্রদর্শনী।
তখন ছিল স্বরাজী আন্দোলনের যুগে। স্বদেশী আন্দোলনের ধারায় স্বদেশী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগে ১৯০৬ সালে তৈরি হয়েছিল বঙ্গীয় জাতীয় শিক্ষা পরিষত্। সে পরিষত্-এর উদ্যোগে ১৯১৮ সালে যে শিক্ষা সপ্তাহ শুরু হয়, তাদের আয়োজিত দুটি প্রদর্শনীর একটি ছিল শিল্প প্রদর্শনী আরেকটি পুস্তক প্রদর্শনী। প্রদর্শনী নাম হলেও তাতে যোগ দিয়েছিলেন স্বদেশী প্রকাশকের দল। কলকাতার নামজাদা বসুমতী প্রকাশনও ছিল সেখানে। সম্ভবত এটিই ছিল ভারতের প্রথম বইমেলা। এই পুস্তক প্রদর্শনীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিপিনচন্দ্র পাল, নীলরতন সরকার, চিত্তরঞ্জন দাশ তথা সি আর দাশ ও ঋষি অরবিন্দের মতো মনীষা। ইতিহাসের ধারাতেই পরিষ্কার কতটা অগ্রণী আর পুস্তকপ্রেমী ছিল বাঙালি। সে চারাগাছ আজ মহীরুহ। এখন কলকাতার বইমেলাও জমজমাট। তবে ঢাকার বইমেলা ছাপিয়ে গেছে তাকে।
বইমেলাকে ঘিরে আমাদের উত্সব বা আনন্দ যতটা, ততটা কাজ হচ্ছে কি না সেটা এখন ভাবার বিষয়। আমি সবসময় একটা গল্প বলি। এক সময়কার চেকস্লোভাকিয়া ভেঙে চেক দেশ নামে একটি ছোটো দেশ হয়েছে। সে দেশের বাংলাপ্রেমী এক অধ্যাপক আমাদের খবরাখবর রাখেন। ঢাকায় আসেনও। তিনি দুঃখ করে বলছিলেন, ইতিহাস আর ভাষার আন্দোলনে বলিষ্ঠ হওয়ার পরও আমাদের কোথায় ঘাটতি। তিনি জানতে চেয়েছিলেন সব বিষয়ে বাংলায় কী প্রকাশিত বইপত্র আছে? না পাওয়া যায়? অথচ তার ছোটো দেশ কম মানুষের ভাষা হওয়ার পরও দুনিয়ার এমন কোনো বিষয় নেই, যা চেক ভাষায় মিলবে না। আমাদের কি তা আছে? সৌরজগত মহাশূন্য থেকে চলচ্চিত্র আইন বা যৌনতা আসলে কী সব বিষয়ে প্রকাশিত বাংলা বই আছে? থাকলেও কি তা মানসম্মত? এই যে না, এর ভেতরেই জবাব নিহিত। মূলত আমাদের ঝোঁক হচ্ছে কবিতা, গল্প, ছড়া বা উপন্যাসে। এর ভেতর ছড়া আর কবিতায় পরিশ্রম কম বলে দেদারসে তার বই বের হয়। বের হয় ছোটো গল্পের বই। কিন্তু খেয়াল করবেন বেশির ভাগ লেখকরা পরের বছর উধাও। তারা বুঝতে পারেন টিকতে কষ্ট হবে বা টেকা যাবে না। এই প্রবণতা ভালো কিছু না। বরং এতে সাময়িক আর্থিক লাভ হলেও ভবিষ্যত্ বিপন্ন হয়ে পড়বে।
ভরসার কথা এই যে, এই বইমেলা এখন দুনিয়ার নানা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। তা-ও ব্যাপক হারে। আমরা যখন সিডনি এলাম ছিল না। দুই বছর পর নেহাল বাঋই নামে এক ভদ্রলোক শুরু করল ছোটোখাটোভাবে বইয়ের প্রদর্শনী। এখন তার দায়িত্বে আছে একুশে একাডেমি এবং তার নেতৃত্ব নিয়ে লড়াইও চলে। যার অর্থ, এটা এখন বিস্ময় ও গৌরবের। মূল কাজ তারা কতটা করেন সেটা বিতর্কের হলেও বইমেলা তো হয়।
কোথাও হয় না? আমেরিকা ইউরোপে ভূরি ভূরি উদাহরণ। মানুষ প্রাণের টানে ছোটে। আজকাল ই-রিডার কম্পিউটার আরো কত কী আছে। চাইলে ঘরে বসেই বই পাওয়া সম্ভব। ইলেকট্রনিকভাবে অর্ডার দিলেই ঘরে পৌঁছে যাবে। তবু বই কিনতে বাঙালি মেলায় যায়। মেলা থেকে কেনার আনন্দই আলাদা। এ ধারণা আর এই অনুভূতি যত দিন আছে, তত দিন বাঙালির বইমেলা চলবে। চলবে প্রকাশনা আর ভালোবাসার মেলবন্ধন।
n লেখক :সিডনি প্রবাসী প্রবন্ধকার
