মাহমুদুর রহমান মানিক
ক্লাসরুমের ব্ল্যাক বোর্ডে শিশুরা কত রকমের স্বপ্নই না আঁকে। তাদের সেই স্বপ্নে থাকে না কোনো বাঁধা, ভবিষ্যতকে জয় করার শক্তি পায় এই ক্লাসরুম থেকেই। কিন্তু সবাই সেই ক্লাসরুমের অংশ হতে পারে না, অর্থনৈতিক কারণে ক্লাসরুম অনেকের কাছে শুধুই স্বপ্ন থেকে যায় আর তাদের সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্যই দায়বদ্ধতা থেকে এগিয়ে আসে সমাজের অনেকে। শিক্ষা প্রতিটি মানুষের অধিকার, প্রত্যেক মা-বাবা স্বপ্ন দেখে তাদের সন্তান শিক্ষার আলোয় আলোকিত মানুষ হয়ে সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচবে। কিন্তু দারিদ্রতার কারণে অনেকের সে স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই থেকে যায়। সুবিধাবঞ্চিত এসব শিশুদের মানুষ করে গড়ে তোলার দায়িত্ব যে এ সমাজের সেই দায় থেকেই সাভারের উন্মুক্ত পাঠশালার যাত্রা শুরু।
গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তৌহিদ মোরশেদ নোমান স্বপ্ন দেখেছেন সমাজের সুবিধাবঞ্চিত এসব শিশু, যারা অর্থের অভাবে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত তাদের মাঝে কোনো পারিশ্রমিক ছাড়া শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিয়ে একটি আলোকিত সমাজ গড়ার। আর সে লক্ষ্যেই ২০১৭ সালে মাত্র একজন ছাত্র নিয়ে যাত্রা শুরু উন্মুক্ত পাঠশালার। সেদিন সকালে সাভারের একটি বস্তির পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় নোমান লক্ষ্য করেন যে সময় শিশুরা স্কুলে থাকে সেই সময়ে একটি ছেলে বস্তির পাশে ময়লার ভাগাড়ে বসে আছে। এরপর কথায় কথায় নোমান ছেলেটির কাছে জানতে পারে তার নাম সাগর ও তার মা রানা প্লাজা ট্রাজেডিতে আহত একজন কর্মী। আর্থিক দিক ভালো নয় বলে সে স্কুলে যেতে পারে না। আর সেই সাগরকে দিয়েই শুরু উন্মুক্ত পাঠশালার যাত্রা। এরপর নোমান খুঁজতে থাকে এ বস্তির আর কোন কোন শিশু স্কুলে যেতে পারে না।
মাত্র ৩ বছরের কম সময়ে এখন উন্মুক্ত পাঠশালার ছোট ক্লাসরুমে ৫০ জন সুবিধাবঞ্চিত শিশু নিয়মিত শিক্ষার আলোয় আলোকিত হচ্ছে। প্রতিটি শিশু এখন স্বপ্ন দেখে আলোকিত মানুষ হয়ে একদিন তারাও সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচবে। দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। এসব শিশুদের শুধু শিক্ষা নয়, শিক্ষার যাবতীয় উপকরণ বিতরণ করে থাকে উন্মুক্ত পাঠশালার প্রতিষ্ঠাতা নোমান। বই, খাতা, কলম এছাড়াও অন্যান্য স্কুলের মতো খেলাধুলা ও জাতীয় দিবসগুলোও নিয়মিত আয়োজন করা হয় শিশুদের মাঝে জাতীয়তাবোধ জাগিয়ে তোলার জন্য। নিজের অল্প হাত খরচ কিংবা টিউশন থেকে প্রাপ্ত টাকা দিয়েই ৫০ জন শিশুর স্বপ্ন গড়ে দেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করছেন। এইতো কয়েক দিন আগেই মুজিববর্ষ উপলক্ষে উন্মুক্ত পাঠশালার উদ্যোগে হয়ে গেল শিক্ষা উপকরণ বিতরণ ও বয়স্ক ভাতা কার্যক্রম। নোমানের প্রচেষ্টায় অনেকেই এখন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন। ইচ্ছাশক্তি ও চেষ্টা থাকলে যে আমাদের ছোট ছোট দায়িত্ববোধ থেকেই একদিন বড় পরিবর্তন আসবে এতে কোনো সংশয় নেই।
যে সব শিশু কিছুদিন আগেও দিন কাটাতো প্লাস্টিকের বোতল কুড়িয়ে বা ময়লার ভাগাড়ে বসে, আজ সাভারের উন্মুক্ত পাঠশালার কল্যাণে তারা ক্লাসের ব্ল্যাক বোর্ডে হরেকরকম স্বপ্ন আঁকে। সে স্বপ্নগুলো একদিন সত্যি হবে, সমাজের অন্য শিশুর মতো তারাও বড় হয়ে এদেশের সম্পদ হবে।
