গত বত্সর জুলাই মাসে রাজধানীতে সড়কের পার্শ্ববর্তী যেই সকল ভবনে কার পার্কিংয়ের জায়গায় নকশাবহির্ভূত ব্যবসায়প্রতিষ্ঠান ও দোকান নির্মিত হইয়াছে, সেইগুলি এক মাসের মধ্যে অপসারণ করিতে ভবন-মালিকদের নির্দেশ দিয়াছিল হাইকোর্ট। অক্টোবর মাসে মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সুপারিশে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) গাড়ি রাখিবার জায়গা উদ্ধারে অভিযানেও নামিয়াছিল। বুলডোজার দিয়া ভাঙা হইয়াছে স্থাপনাগুলি, কিন্তু অভিযান শেষ হইতেই আবারও অবৈধ স্থাপনা নির্মিত হইয়াছে। নগরের অনেক বহুতল ভবনের গাড়ি রাখিবার জায়গায় কেবল তাই ভাঙা-গড়ার খেলাই চলিতেছে। কোনোক্রমেই দখলমুক্ত হইতেছে না রাজধানীতে ইমারত বিধিমালা ভাঙিয়া নির্মিত বহুতল ৩০৯ ভবনের পার্কিং স্থানের অবৈধ স্থাপনা। এমনকি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) পার্কিংয়ের জায়গা খালি করিতে দুই দফা চিঠি প্রদান করিলেও এখন পর্যন্ত কয়েকটি ভবন ছাড়া কোনো ভবন-মালিকই কর্ণপাত করেন নাই। উপরন্তু কোনো কোনো স্থানে নূতনভাবে পার্কিংয়ের জায়গায় অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণ করা হইতেছে। আবাসিক ও বাণিজ্যিক সর্বপ্রকার বহুতল ভবনেই এই চিত্র। বিল্ডিং কোড ও ইমারত বিধিমালা অনুযায়ী ইহা অপরাধ।
২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীর বনানীর এফ আর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর গণপূর্তমন্ত্রী সকল বহুতল ভবনের নকশা পরীক্ষা এবং সর্বশেষ পরিস্থিতি জানিতে জরিপ পরিচালনার নির্দেশনা দেন। তাহারই অংশ হিসাবে রাজউকের মোট আট জোনের ২৪ টিম জরিপকৃত বহুতল ভবনের রিপোর্টে এই সকল ভবনকে চিহ্নিত করে। রাজধানীর অতি গুরুত্বপূর্ণ গুলশান, বনানী, বারিধারা, নিকেতন, কাওরান বাজার, খিলক্ষেত, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, নিকুঞ্জ ও তেজগাঁও শিল্প এলাকায় নির্মিত বহুতল ভবনেই সবচাইতে বেশি রাজউকের নিয়ম লঙ্ঘিত হইতেছে। ১০ তলার ওপরে নির্মিত এই সকল বহুতল ভবনের পার্কিংয়ের স্থানকে দোকান, মালামাল রাখিবার গোডাউন, ফুল চাষের স্থানসহ নানা কাজে ব্যবহার করিতেছেন ভবনের মালিকেরা। তদুপরি, অনেক বাণিজ্যিক ভবন কিংবা বিপণিবিতানের গাড়ি রাখিবার জায়গায় বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার ফলে বাড়তি চাপ সৃষ্টি হইতেছে রাস্তাগুলিতে। ক্রেতাদের গাড়ি রাস্তার ওপর দাঁড়াইয়া থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সৃষ্টি হয় ব্যাপক যানজটের। এই সকল বহুতল ভবনের পার্কিং স্পেস কবে মুক্ত হইবে তাহা সকলেরই অজানা। রাজউক নিয়মানুযায়ী নকশা গ্রহণের সময় নির্ধারিত শর্তাবলি এই সকল ভবনের মালিকগণ কোনোমতেই মানিতেছেন না। অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী প্রতিটি ভবনের নিচে গাড়ি রাখিবার জন্য পার্কিং স্পেস শুধু পার্কিং কাজেই ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা আছে। কিন্তু অধিকাংশ মালিকই অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং সমাজের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকায় আইনের তোয়াক্কা করেন না। অবশ্য রাজউক কর্তৃপক্ষ বলিতেছে, বিশেষ অভিযানের প্রস্তুতি চলিতেছে। প্রয়োজনে এই সকল ভবনের মালিককে জেল-জরিমানা করা হইবে।
আমরা এই আশ্বাসে আশ্বস্ত হইতে চাই। কিন্তু ইহাও বলিব, ফলাফলশূন্য অভিযান পরিচালনা অর্থহীন। রাজউকের কোনো মনিটরিং সামর্থ্য নাই। ফলে, সাংগঠনিক কাঠামো দিয়া কার্যকর ব্যবস্থাগ্রহণ তাহাদের পক্ষে অসম্ভব। অন্যান্য দেশের স্থানীয় সরকার অনেক ক্ষমতাধর। কমিশনারের নখদর্পণে থাকে একেকটি এলাকা। তাই রাজউকের ক্ষমতা বাড়াইতে হইবে। কেননা ভবন নির্মাণ আইনানুযায়ী অবৈধ স্থাপনা অপসারণে দায়িত্ব যথাযথ কর্তৃপক্ষের। তাহাদের অবহেলায় ঢাকার গোটা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হইতেছে। পার্কিং লট অবমুক্ত ও তদারক করিতে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়া হইবে এবং অসত্ ভবন-মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে বলিয়াই আমরা প্রত্যাশা করি।
