অশেষ উপকারী সব সময়ের সঙ্গী আপনার প্রিয় স্মার্টফোনটি কখনো কখনো বিপদ ডেকে আনতে পারে। বিশেষ করে, গাড়ি ড্রাইভিংয়ের সময়। তবে সব ক্ষেত্রেই স্মার্টফোন ব্যবহারে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের সময় এসেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সরকার কর্তৃক পরিচালিত একটি সার্ভে রিপোর্টের ফলাফলে বলা হয়, স্মার্টফোন এবং অন্যান্য ওয়্যারলেস গেজেট ডিভাইস ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট মনোযোগ বিচ্যুতির কারণে গাড়িচালকরা মুখোমুখি সংঘর্ষ বা ঐ ধরনের অ্যাক্সিডেন্টে পতিত হচ্ছে। আমেরিকার এক অঙ্গরাজ্যে গাড়ি চালানোর সময় হ্যান্ড হেল্ড ফোন ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এজন্য অঙ্গরাজ্যটি আইনও পাশ করিয়েছে। আরো কিছু অঙ্গরাজ্য এ ধরনের আইন নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে। শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কিছু কিছু রাজ্য এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ড্রাইভারদের স্মার্টফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। তবুও দেখা যায় ড্রাইভিংয়ের সময় ৪০ শতাংশ স্মার্টফোন ব্যবহূত হচ্ছে এখনো।
সাম্প্রতিক কালে স্মার্টফোনের এমনতরো বহুমুখী অপব্যবহার ভাবিয়ে তুলেছে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রযন্ত্রকে। দেশে দেশে সরকারিভাবে স্থানভেদে নিষিদ্ধ করা হচ্ছে স্মার্টফোন। কোথাও সরকারি অফিসে স্মার্টফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। কোথাও আবার সড়ক দুর্ঘটনা রোধকল্পে ড্রাইভিং অবস্থায় স্মার্টফোনে কথা বলা বন্ধ করা হচ্ছে। কোনো কোনো দেশে স্মার্টফোনে কথা বলার ওপরে জরিমানাও করা হচ্ছে। মালয়েশিয়ার সরকারি অফিসে স্মার্টফোন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সরকারি অফিসের হাই-সিকিউরিটি এলাকায় স্মার্টফোন এবং যে কোনো ধরনের হ্যান্ডহেল্ড কম্পিউটারের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ব্রিটেনে ড্রাইভিং অবস্থায় ড্রাইভারদের জন্য স্মার্টফোনে কথা বলা নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিগিগরই এই আইন কার্যকর হচ্ছে। আইন ভঙ্গকারীর প্রাথমিক জরিমানা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ পাউন্ড। তবে কেস যদি কোর্টে ওঠে, সেক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। আর প্রতিবার এজাতীয় অপরাধের জন্য অপরাধী ড্রাইভারের ড্রাইভিং লাইসেন্সে তিনটি করে পেনাল্টি দেওয়া হবে। গবেষণায় দেখা যায়, ড্রাইভিং অবস্থায় স্মার্টফোনে কথা বললে প্রতি চারবারে একবার দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। ট্রান্সপোর্ট রিসার্চ ল্যাবরেটরি পরামর্শ দেয় ড্রাইভিং অবস্থায় স্মার্টফোনে কথা বলা কোনো কিছু পান করার চেয়ে বিপজ্জনক। ব্যবহারকারীদের সতর্ক করে দেওয়া হয় হ্যান্ডস ফ্রি ব্যবহার করে কথা না বলার জন্য। তবু হ্যান্ডস ফ্রি কথা বলার সময় এতে করে ড্রাইভিংয়ের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে না। রয়েল সোসাইটি ফর দ্য প্রিভেনশন অব অ্যাকসিডেন্টস সংক্ষেপে রোসপা নামের একটি খ্যাতনামা সংগঠন নতুন ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা সতর্ক করে বলেছে, ফোনে কথা বলার জন্য প্রতিদিন হাজারখানেক দুর্ঘটনা ঘটে। যার মধ্যে মৃত্যু হয় অন্তত ২০ জনের।
ওদিকে ইতালিতে সরকারিভাবে আইন করেই ক্লাসরুমে পাঠরত অবস্থায় স্মার্টফোনের ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এর পরও কেউ যদি ক্লাসরুম আইন অমান্য করে স্মার্টফোন নিয়ে আসে, সেক্ষেত্রে স্কুল কর্তৃপক্ষ স্মার্টফোন বাজেয়াপ্ত থেকে শুরু করে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অভিযুক্ত ছাত্র বা ছাত্রীকে বাদ দিতে পারবেন। এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ১৭টি অঙ্গরাজ্যে স্মার্টফোনের ব্যবহারের ওপর বিভিন্ন রকম নিষেধাজ্ঞা জারি করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে সেসব রাজ্যের রাজ্য সরকার। সম্প্রতি চারটি অঙ্গরাজ্যে ড্রাইভিং অবস্থায় স্মার্টফোনের সীমাবদ্ধ ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির ব্যাপারে আইন করা হয়েছে। এই চারটি অঙ্গরাজ্য হচ্ছে ক্যালিফোর্নিয়া, কানেক্টিকাট, নিউ জার্সি ও নিউ ইয়র্ক। সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার একটি বিলে স্বাক্ষর করেছেন। আইনে বলা হয়েছে, যদি কোনো ড্রাইভার হেডসেট, এয়ার বাড বা হ্যান্ডস-ফ্রি ব্যবহার না করে গাড়ি চালায়, তাহলে ড্রাইভারকে ২০ ডলার জরিমানা করা হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ড্রাইভিং চলাকালীন অবস্থায় স্মার্টফোনের ওপর নানারকম নিষেধাজ্ঞা আরোপ চলছে। উন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোও এ ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে। যেসব দেশ ড্রাইভিং অবস্থায় স্মার্টফোনের ব্যবহার কিংবা শর্তযুক্ত নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, সেসব দেশের মধ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, মিশর, ফ্রান্স, জার্মানি, পর্তুগাল, রোমানিয়া, রাশিয়া, সিঙ্গাপুর, সাউথ আফ্রিকা, স্পেন, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, তুরস্ক, তুর্কমেনিস্তান, জিম্বাবুয়ে, ইসরায়েল, জার্সি, জর্ডান, মেক্সিকো (আংশিকভাবে নিষিদ্ধ), ফিলিপিন্স, স্লোভাক রিপাবলিক, স্লোভেনিয়া, অস্ট্রিয়া, বাহরাইন, বেলজিয়াম, বতসোয়ানা (এখনো বিতর্কিত), চিলি, চেক রিপাবলিক, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, হাঙ্গেরি, আয়ারল্যান্ড ও ভারত (নয়াদিল্লি)। এই তালিকার সঙ্গে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ।
গাড়ি চালানোর সময় স্মার্টফোন ও শ্রবণযন্ত্র (ইয়ার ফোন) ব্যবহার করা যাবে না। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে প্রচারের অভাবে এখনো এর কোনো কার্যকারিতা চোখে পড়ছে না। রাজধানীসহ সারা দেশে গাড়ি চালানোর সময় স্মার্টফোন ব্যবহারের কারণে দুর্ঘটনা হার বাড়ছে। অনেকে ইয়ার ফোন লাগিয়ে গান শুনতে শুনতে গাড়ি চালায়, যা অনেক সময় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনার বেশির ভাগই হয়েছে গাড়ি চালানোর সময় স্মার্টফোনে বা ইয়ার ফোন ব্যবহারের কারণে। গাড়ি চালানোর সময় স্মার্টফোন ও ইয়ার ফোন নিষিদ্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্ত যেন অদরকারি সিদ্ধান্ত না হয়, শুধু নিজে বাঁচতে এবং অন্যকে রক্ষা করার দরকারে হলেও ড্রাইভিংয়ের সময় স্মার্টফোন ব্যবহারে এখন থেকেই সাবধান হোন।
n লেখক : বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
