পাশ্চাত্য দেশগুলোতে আপনি যদি যোগ শব্দটি উচ্চারণ করেন, তাহলে মানুষের মনে আসে অসম্ভব সব শারীরিক অঙ্গভঙ্গির কথা। যোগ আসলে যা, এটা তার একটা অত্যন্ত বিকৃত ধারণা। আক্ষরিক অর্থে ‘যোগ’ শব্দটির মানে ‘মিলন’ বা ‘সংযোগ’। মিলন মানে কী বোঝায়? আজকে এ এক বৈজ্ঞানিক বাস্তব, পদার্থবিজ্ঞান সন্দেহাতীতভাবে এটাকে প্রমাণ করেছে, যে সমগ্র অস্তিত্বটা কেবল একটাই শক্তি যা নিজেকে বিভিন্ন রূপে প্রকাশ করে চলেছে। দীর্ঘকাল ধরে পৃথিবীর সব ধর্ম বলে আসছে, ‘ঈশ্বর সর্বব্যাপী’। আপনি ‘ঈশ্বর সর্বব্যাপী’ বলুন অথবা ‘সবকিছু একই শক্তি’, সে যাই বলুন না কেন, সেটা আলাদা কিছু নয়। আইনস্টাইন এটাকে শক্তি বলেছিলেন, আপনি একে বলেন ঈশ্বর। এটা একই জিনিস যা দুটো আলাদাভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে; কিন্তু এক বৈজ্ঞানিক শুধু গাণিতিকভাবে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। তিনি এটা উপলব্ধি করেননি। এক ব্যক্তি যিনি শুধুই এটা বিশ্বাস করেন, তিনিও এটাকে উপলব্ধি করেননি, কারণ অন্য কোনো একজন তাকে এটা বলেছেন শুধু।
একজন যোগী হলেন এমন কেউ যিনি সিদ্ধান্ত বা বিশ্বাস, কোনোটাই স্বীকার করতে ইচ্ছুক নন। তিনি সবটা জানার ইচ্ছা রাখেন। তিনি যদি এখানে চোখ বন্ধ করে বসেন, তাহলে তিনি এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ড আলাদা নন। তিনিই সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ড। এমনকি আপনি যদি এক মুহূর্তের জন্যও আপনার চারপাশের সমস্ত কিছুকে স্বয়ং আপনার নিজের রূপে উপলব্ধি করেন, তাহলে চারপাশের সমস্ত কিছুর যত্ন এবং সংরক্ষণ করার কথা কাউকে আর আপনাকে বলে দিতে হবে না। আপনি তা এমনিই করবেন, কারণ যা সব কিছু আপনি স্বয়ং আপনার নিজের রূপে জেনেছেন, সেগুলোর সঙ্গে কোনো দ্বন্দ্ব থাকবে না। সেখানে শুধু পূর্ণ ঐক্য আর সংলিপ্ততার এক গভীর অনুভব থেকে যায়। তাহলে যোগ শরীরকে বাঁকানো বা মোচড়ানোর কোনো বিষয় নয় বা শ্বাসরুদ্ধ করে থাকাও নয়। এ হলো আপনাকে উপলব্ধির সেই অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার একখানা কার্যকরী উপায় এবং এক গোটা প্রযুক্তি, যেখানে বাস্তবটি যেরকম, আপনি ঠিক সে রকম ভাবেই তাকে দেখবেন।
এরকম একটা ব্যাপার কি সম্ভব? আপনি স্বয়ং যা, সেই ব্যক্তিগত অনুভবের ভিত্তি রয়েছে আপনার সংবেদনার সীমারেখাগুলোতে। এই সীমারেখাগুলোর ভেতরে যা কিছু আছে, তা আপনি; যা কিছু এর বাইরে, তা আপনি নন—এটাই আপনার জীবনের অভিজ্ঞতা। দৃষ্টান্ত হিসেবে, এক গ্লাস জল পান করার পর আপনি সেটাকে স্বয়ং নিজের রূপে অনুভব করেন। ঠিক এই মুহূর্তে আপনার শরীর যা কিছু দিয়ে গঠিত, সে সবই খাদ্য বা জল হিসেবে বাইরে কোনো জায়গায় ছিল। একবার যখন আপনি এসব আপনার অনুভূতির সীমারেখার মধ্যে নিয়ে আসেন, তখন আপনি একে ‘স্বয়ং আমি’ হিসেবে উপলব্ধি করেন।
আপনার জীবনের কোনো এক মুহূর্তে, যখন আপনি আনন্দ বা পরমানন্দের এক চরম বোধ উপলব্ধি করে থাকেন, সে সময় যদি আপনার হাত দুইটিকে শরীরের ৮-৯ ইঞ্চি ওপরে রাখতেন, আপনি আপনার শরীরকে স্পর্শ করার অনুভূতি পেতেন। একই রকমভাবে, এটা একটা চিকিত্সাশাস্ত্র-বিষয়ক সত্য যে, শারীরিক পা কেটে বাদ দেওয়া হলেও ইন্দ্রিয় অনুভূত পা কিন্তু অক্ষত রয়ে যায়। তার মানে পার্থিব শরীর ছাড়িয়েও ঐন্দ্রিয়িক শরীরের নিজের অস্তিত্ব থাকে। আর এই ঐন্দ্রিয়িক শরীরের সম্প্রসারণের একটা উপায় আছে। আপনি যদি আপনার জীবনীশক্তিগুলোকে অত্যন্ত প্রাণোচ্ছল ও পরমানন্দিত করে রাখেন, তাহলে আপনার ঐন্দ্রিয়িক শরীর, আপনি যত বড়ো চাইবেন, তত বড়ো হতে পারে।
যোগ-এর অর্থ হলো আপনার অনুভূতির সীমানাকে এমনভাবে বাড়ানো যাতে আপনি গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে স্বয়ং আপনার অংশ হিসেবে উপলব্ধি করতে পারেন; সবকিছুই এক হয়ে যায়। সেই একাত্মতারই কথা বলছি আমরা।
n সৌজন্যে :ঈশা ফাউন্ডেশন
