কর্মক্ষেত্র ও ব্যবসায় নারী-পুরুষ সমতায় গত দুই বছরে বিশ্বে যে ৪০টি দেশ আইনি সুরক্ষা বাড়িয়েছে বা সংস্কার করেছে, তার তালিকায় নেই বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের ‘ওমেন, বিজনেস অ্যান্ড দ্য ল ২০২০’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় অর্ধেক আইনি সুরক্ষা পান এ দেশের নারীরা। গত দুই বছরে দক্ষিণ এশিয়ার চারটি দেশ নারী-পুরুষ সমতার জন্য আইনি সুরক্ষা বাড়িয়েছে। নেপাল একটি নতুন শ্রম আইন চালু করেছে, যা চাকরিতে বৈষম্য কমানোসহ নারীদের পেনশনে সুবিধা বাড়িয়েছে। ভারতের মহারাষ্ট্রে নারীদের কর্মসংস্থানে বাধা তুলে নিয়েছে। তাছাড়া শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান নারী-পুরুষের ব্যবধান কমাতে আইনি সুরক্ষা বাড়িয়েছে। ফলে বিশ্বব্যাংকের সূচকে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে শ্রীলঙ্কা, ভারত, নেপাল। বিশ্বের ১৯০টি দেশের নারীর কর্মক্ষেত্র ও ব্যবসা-বাণিজ্যে আইনি সুরক্ষার চিত্র তুলে ধরা হয় বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে। এসব দেশের মধ্যে বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে আফগানিস্তানসহ মাত্র ১৮টি দেশ। দুই বছর পর তথ্য হালনাগাদ করে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সর্বমোট আটটি তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বিশ্বব্যাংক প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। এগুলো হলো কাজের জন্য অবাধ সুবিধা, কর্মপরিবেশ, বেতন ও মজুরি, বিবাহ, অবিভাবকত্ব, উদ্যোক্তা, পেনশন বা সরকারি ভাতা। এই আট সূচকের মধ্যে কাজ খোঁজার সূচকে বাংলাদেশে নারী ও পুরুষের আইনি সমতা আছে। অর্থাত্, কাজ খুঁজতে নারীদের কোনো বাধা নেই। এক্ষেত্রে পুরুষের সমান সুবিধা পাচ্ছে বাংলাদেশে। তবে বাকি সূচকগুলোর কোনোটিতে পুরুষের সমান সুবিধা পাচ্ছে না বাংলাদেশের নারীরা। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা বেতন-মজুরি এবং পেনশন বা সরকারি সুবিধাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে। প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বেতন-মজুরি এবং কর্মকালীন ও অবসরকালীন ভাতা পাওয়ার ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের তুলনায় এক-চতুর্থাংশ সুরক্ষা পান বাংলাদেশে। এই দুর্বলতার কারণে সার্বিক সূচকে পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। সার্বিকভাবে বাংলাদেশ নারী-পুরুষের আইনি সুরক্ষায় ৪৯ দশমিক ৪ পয়েন্ট পেয়েছে। অর্থাত্, সমান অধিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের তুলনায় অর্ধেক সুরক্ষা পান।
প্রতিবেদন অনুযায়ী গত দুই বছরে বিশ্বের ৪০টি দেশে মোট ৬২টি সংস্কার করেছে। এর পরেও অসমতা রয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আটটি দেশে নারী-পুরুষের আইনি সুরক্ষা সমান। দেশগুলো হলো বেলজিয়াম, কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, আইসল্যান্ড, লাটভিয়া, লুক্সেমবার্গ ও সুইডেন। গত দুই বছরে সংস্কারে তুলনামূলক বেশি এগিয়ে যাওয়া দেশের তালিকায় আছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, দক্ষিণ সুদান, সাওতুমে, বাহরাইন, কঙ্গো, জিবুতি, জর্ডান ও তিউনিসিয়া। প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যালপাস বলেছেন, নারীরা যখন অবাধে চলাফেরা করতে পারে, বাড়ির বাইরে কাজ করার সুযোগ পায় এবং সম্পদ পরিচালনা করতে পারে, তখন তারা শ্রমশক্তিতে আরো বেশি অবদান রাখতে পারে। সেই সঙ্গে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালীকরণে সহায়তা করার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
১৯০টি দেশের ২০১৭ সালের জুন থেকে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তথ্য নিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সংস্কার করতে হবে অবিভাবকত্বের ক্ষেত্রে। নারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি কর্মক্ষেত্রে তাদের ধরে রাখতে সহায়তা করে। সেই সঙ্গে উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়। প্রতিবেদন প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ পেনোলোপ কজিয়ানো গোল্ডবার্গ উল্লেখ করেছেন, নারী-পুরুষ সমতা অর্জন সময়সাপেক্ষ। কিন্তু আশার বিষয় হলো, বিশ্বের সব অঞ্চলেই পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। এ ধরনের প্রতিবেদনের মাধ্যমে দেশগুলোর নীতিনির্ধারকেরা নারীদের জন্য সমান সুযোগ তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন।
